সিসি নিউজ ডেস্ক।। বাংলাদেশ সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে চলমান সংঘাতের জেরে সেখানে বসবাসরত রোহিঙ্গারা ও সশস্ত্রগোষ্ঠির কিছু সদস্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে। তারা সংঘাতে অতিষ্ঠ হয়ে প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে বাংলাদেশে। তারই ধারাবাহিকতায় ছোট ছোট দলে অর্ধশতাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে ঠেকিয়ে দিয়েছে ১১ বিজিবি ও ৩৪ বিজিবি।
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের ঠেকিয়ে দিচ্ছে বিজিবি। কিন্তু শুক্রবার রাতে ৫ আরকান আর্মি অনুপ্রবেশ করে আহত অবস্থায়।’
জানা গেছে, নতুন করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বাড়ছে। কেননা ২০১৭ সালে অনুপ্রবেশ করা ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে এখন প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়নি। সেখানে আরও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বাংলাদেশের জন্যে বড় বিষফোঁড়া হবে। এরই মধ্যে সেদেশে দুদলের সংঘর্ষে প্রথমে ৩৩০ জন বিজিপি পরে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ৫ জন বিদ্রোহী আরকান আর্মির নিরস্ত্র সদস্য আহত অবস্থায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। তারা বাংলাদেশের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে।
যাদের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে ১১ বিজিবিসহ কেউ এখনো কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ জাকারিয়া ও থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘৫ আরকান আর্মির আশ্রয় নেওয়ার বিষয় সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। আর কিছুই জানেন না।’
একাধিক সূত্র জানায়, রাখাইনে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সেনারা ও বিদ্রোহী আরকান আর্মির সৈনিকেরা ঘাঁটি দখল নিতে গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে তুমুল সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তারা প্রথমে সীমান্তে সংঘাতে লিপ্ত থাকলেও-এখন তারা আরও একটু ভেতরে যুদ্ধে করছে। দখলে মরিয়া হয়ে উঠেছে পরস্পরকে ঠেকাতে।
আরকান আর্মির দাবি তারা গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ছোট-বড় ২০টির অধিক ঘাঁটি দখলে নিয়েছে সরকার বাহিনীর কাছ থেকে।
আর জান্তাদের সোর্সদের দাবি তারা কৌশলগত কারণে বেদখল হওয়া ঘাঁটি পুনরুদ্ধারে বিমান হামলা করছে না। করলে বাংলাদেশও তাদের প্রতিপক্ষে দাঁড়াবে।
অভিজ্ঞ মহলের দাবি, মিয়ানমার জান্তা বাহিনী এই মুহূর্তে সীমান্তের ঘাঁটিতে হামলা চালালে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জনবসতিতে গোলা এসে পড়তে পারে, সেই আশঙ্কায় তারা ভিন্ন কৌশলে হারানো ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
সূত্র আরও দাবি করেন, এ পর্যন্ত নাইক্ষ্যংছড়ির ঢেকুবুনিয়া, রাইটক্যাম্প, নাচিসবুনিয়া ক্যাম্প, কক্কডঙ্গ্যা ক্যাম্প, মুরুইগ্যা খালের মাথা ক্যাম্প, নারায়ন সং ক্যাম্পসহ ছোট-বড় ২০টি ক্যাম্প জান্তার কাছ থেকে দখল করে নেয় আরকান আর্মি। আরকান আর্মি এ-ও মনে করেন সরকারি বাহিনী যে কোনো মুহূর্তে বিমান হামলা করতে পারে। এ কারণে অনেকে আতঙ্কে রয়েছে।
গত ৫ ফেব্রুয়ারির পর থেকে এ পর্যন্ত ৬১ জনের অধিক রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করে দিয়েছে। তন্মধ্যে ১১ বিজিবি ১১ জন ও ৩৪ বিজিবি ৫০ জন পুশব্যাক করে দিয়েছে। যাদেরকে ৩৬ পিলার সংলহ্ন বাইশফাঁড়ি, ৫০ পিলার সংলগ্ন বাইর মাঠ ও ৫২ পিলার সংলগ্ন পাইনছড়ি এলাকা দিয়ে পুশব্যাক করা হয়।
এ বিষয়ে ঘুমধুম নিবাসী উপজেলা মুক্তিযুদ্ধে কমান্ডার রাজা মিয়া বলেন, ‘রোহিঙ্গার অত্যাচার সহ্য করা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনুপ্রবেশ ঘটলে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে।’
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুল আবসার ইমন বলেন, ‘অনুপ্রবেশের চেষ্টায় আতঙ্কিত বাংলাদেশিরা। বর্তমানে রাখাইনে সংঘাত চলছে। তাই তারা প্রাণ বাঁচাতে এখানে আসার চেষ্টা করছে।’
নাইক্ষ্যংছড়ি থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, ‘সংঘাতে রোহিঙ্গাদের ঠেকিয়ে দিচ্ছেন বিজিবি সদস্যরা। কিন্তু শুক্রবার রাতে ৫ আরকান আর্মি অনুপ্রবেশ করে আহত অবস্থায়।’
তবে ১১ বিজিবি এবং ৩৪ বিজিবির অধিনায়কদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তারা কোনো বক্তব্য দেননি।
২০ দিন বন্ধ ৫ প্রাথমিক বিদ্যালয়:
সীমান্তে চলমান সংঘাতের জের ধরে ঘুমধুম সীমান্তবর্তী ৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২০ দিন ধরে বন্ধ কয়েছে। যে সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী রয়েছে ১১০০ জন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে এ সব স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কেননা এর আগের দিন গত ৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে সকাল থেকে প্রচণ্ড আওয়াজে গোলাগুলি ও মর্টারশেলের আওয়াজে সীমান্ত জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে স্কুলগুলো বন্ধ করা হয়। স্কুলগুলো হল দক্ষিণ ঘুমধুম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তুমব্রু পশ্চিমকূল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তুমব্রু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভাজাবুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাইশফাঁড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
নাইক্ষ্যংছড়ির উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাকারিয়া বলেন, ‘শিশুদের শিক্ষার বিষয়টি মাথায় এনে মাঠপর্যায়ে খোঁজখবর নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় উপজেলা পর্যায়ে স্কুলগুলো খোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যেটি বান্দবান জেলা প্রশাসকের দপ্তরে রয়েছে। যা নিয়ে আজ-কালের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা এই ৫টি স্কুল শিগগিরই খুলে দেওয়ার দাবি জানান। উৎস: আজকের পত্রিকা