বিশেষ প্রতিবেদন, সিসি নিউজ।। জমিতে গরুর বদলে মই টানা সেই মারুফার প্রশংসায় ভাসছে গোটা বিশ্ব। কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপের নিজ দেশের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানকে উড়িয়ে দেওয়ার পর বাংলাদেশি এ পেসারের প্রশংসায় পঞ্চমুখ লাসিথ মালিঙ্গা-মিতালি রাজের মতো তারকা ক্রিকেটাররা।
মারুফা পাকিস্তানের দুটি উইকেট নিয়েছেন ইনিংসের প্রথম ওভারেই। প্রতিপক্ষের দুই ক্রিকেটার ওমাইমা সোহেল, সিদরা আমিনকে প্রথম ওভারের শেষ ২ বলে বোল্ড করেছেন বাংলার বাঘিনী মারুফা আক্তার। ওভারের শেষ বলে নেওয়া মারুফার উইকেট নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থা (আইসিসি) তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও পোস্ট করেছে। সেই ভিডিও বার্তায় মিতালি বলেছেন, সুইং অবশ্যই দরকার। কিন্তু লাইন-লেংথ ঠিক না থাকলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না।’
খেলা শেষে প্লেয়ার অব দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত মারুফা আক্তার বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে মা-বাবার কথা তুলে ধরেন। মারুফা বলেন, ‘বাবা বাটন ফোন ব্যবহার করেন বলে ভিডিও কল দিতে পারিনি। কারণ, বাটন ফোনে যে ভিডিও কল করা যায় না। মাকে ভিডিও কল করেছিলাম। মা ম্যাচ চলাকালীন সুরা পড়েন সব সময় এবং আমার জন্য দোয়া করেন।’
ওয়ানডে বিশ্বকাপে এবারই প্রথমবারের মতো খেলছেন মারুফা। তবে বাংলাদেশি এই নারী ক্রিকেটারের এটা তৃতীয় আইসিসি ইভেন্ট। এর আগে ২০২৩, ২০২৪ সালে দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে উঠে আসা মারুফার গল্পটা একটু ব্যাতিক্রম।
নীলফামারী জেলা সদরের সংগলশী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামের নাম ঢেলাপীর। যা ওই জেলার উপজেলা শহর সৈয়দপুর সীমানায় অবস্থিত। মারুফার বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে গেছে রেললাইন। দরিদ্র কৃষক আইমুল্লাহর ছোট মেয়ে মারুফা আক্তার। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ভালো লাগা তাঁর। বাড়ির পাশে রেললাইনের ধারে বড় ভাইয়ের সাথে চলতো ক্রিকেট খেলার অনুশীলন। এরপর সৈয়দপুর শহরে অনুশীলনের জন্য পা রাখে মারুফা। পরে বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। খেলেছেন বিভিন্ন ক্লাব ও দলে।
এরপর ২০২১ সালে করোনাকালে ক্রিকেট খেলা বন্ধ থাকায় বাবা আইমুল্লার সাথে বর্গা নেওয়া জমিতে মই টানার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসেন মারুফা।
অভাব-অনটনের সংসারে দুবেলা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য যেখানে সংগ্রাম করতে হয়, সেখানে ক্রিকেট খেলা বিলাসিতা মনে হয়েছিল সেই সময়ে মারুফার। তাই করোনার সময়ে পারিবারিক দুরবস্থায় ক্রিকেট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। তবে এগিয়ে আসে বিসিবি। মারুফা ফিরে যান আগের ঠিকানা বিকেএসপিতে। বছর না পেরোতেই ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিক নৈপুণ্য দেখিয়ে ১৯ বছর বয়সেই ডাক পান জাতীয় দলে।
দারিদ্র্যের সমুদ্রে হাবুডুবু খাওয়া বর্গা চাষি পিতা আইমুল্লাহর পরিবারে ও রক্ষণশীল একটি সমাজে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ের ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন আপাত দৃষ্টিতে অবাস্তবই মনে হয়। কিন্তু স্বপ্ন যখন দুর্বার তখন তাকে রুধে সাধ্য কার? মারুফার জীবনের বিজয়গাঁথাও যেন এখানে। হার না মানা, হাল না ছাড়া। অকপটে বলেছেন, পিতার সঙ্গে মাঠে কৃষিকাজ আমাকে শক্তি ও সাহস দিয়েছে।
রত্ন চিনতে ভুল করেনি বিসিবি। মেয়েদের ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগে হয়েছিলেন সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের মুকুটও উঠেছিল তার মাথায়। তখন সে কেবল দশম শ্রেণি পড়ুয়া একটি মেয়ে। পরে মেয়েদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের জন্য ঘোষিত ১৫ জনের দলেও ডাক পান মারুফা আক্তার।
ষাটের দশকেও পুরান ঢাকায় যে নারীরা ঘর থেকে বের হতে হলে রিকশার চারদিকে পর্দার ঘেরাটোপে বন্দী থাকতে হতো সেখানে আজকের বাংলাদেশে মারুফা অবরোধবাসিনীদের ঘেরাটোপ ভেঙে চিতার বেগে দৌড়ে মাঠে বল করছেন এই সাহসই মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশে নারীদের অর্জন।
মেয়ের সাফল্যে বেজায় খুশি মারুফার বাবা আলিমুল্লাও। তিনি বলেন, ‘নিজের কোনো জমি কিংবা বসতভিটা ছিল না। শ্বশুরের দেওয়া বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে বসবাস করতে হতো। অন্যের জমি বর্গা চাষ ও দিনমজুরি করে কোনো রকমে সংসার চলছিল। কিন্তু বর্তমানে মারুফার বদৌলতে সংসারে উন্নতি এসেছে।
তিনি বলেন, ‘ ক্রিকেট খেলার প্রতি মারুফার খুব আগ্রহ ও ভালোবাসা। শুরুতে ছেলেদের সাথে মাঠে ও রেললাইনের ধারে মেয়ে মারুফার খেলা সমাজের অনেকেই ভালোভাবে নেননি। কিন্তু সে অনেক বড় খেলোয়াড় হবে এটাই আমার স্বপ্ন ছিল।’ মারুফার জন্য দোয়া করতে সবার প্রতি অনুরোধ জানান এই বাবা।