সিসি ডেস্ক: সিলেটের আহাদের সঙ্গে নার্স নাইমার প্রেম কারও অজানা ছিল না। হাসপাতালে যাওয়া-আসার সূত্রে নাইমার প্রেমে হাবুডুবু খায় সে। এরপর নাইমাকে ছলনায় ফেলে প্রেমের ষোলকলা পূর্ণ করে। মাওলানা ডেকে করে বিয়েও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আহাদই নাইমাকে স্ত্রী হিসেবে অস্বীকার করে। টাকা-পয়সা লুটে তাড়িয়ে দেয় ঘর থেকে। এসব ঘটনার আবর্তের ঘুরপাক খাওয়া নাইমা যখন বিতর্ক কুড়াতে লাগলেন তখন হাসপাতাল থেকে চলে যায় তার চাকরিও। কোন উপায় না দেখে নাইমা অবশেষে প্রতারক আহাদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে সিলেটের শাহপরান থানায় মামলা করেছেন। মঙ্গলবার রাতে থানায় মামলার পর এখন মামলা তুলে নিতে নাইমাকে ক্রমাগত হুমকি দেয়া হচ্ছে। গতকাল নাইমা জানান, ‘এত ভাল বাসলাম তাকে। এর পরও সে আমার সবকিছু কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেলে দিলো!’ সিলেটের মেজরটিলার বিআইডিসি এলাকার বাসিন্দা নাইমা আক্তার (২২) ছিলেন সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্স। আবদুল আহাদের বাড়ি সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার পশ্চিম তালবাড়ী গ্রামে। বর্তমানে আহাদ সিলেট শহরতলীর টিলাগড় বটেশ্বর এলাকার বাসিন্দা। মামলায় আহাদ ছাড়াও তার স্বজন একই এলাকার শাহির আহমদ তাপাদার, হালিমা বেগম, আবদুল হালিম, আবদুল মুমিন মামুন, মোহাম্মদ আলী, মারুফা বেগমকে আসামি করেছেন নাইমা। এরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। শাহপরান থানায় দায়ের করা মামলায় নাইমা জানান, সিলেটের উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নার্স থাকা অবস্থায় ২০০৯ সালের শেষের দিকে আবদুল আহাদ, হালিমা বেগম ও মারুফা বেগমের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে এলে তাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর সম্পর্ক বেশ গভীর হয়ে ওঠে। আহাদের বোন মারুফা নার্স নাইমাকে ধর্মের বোনও বানিয়ে ফেলে। এরই মধ্যে আহাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার। এই প্রেমের সূত্র ধরে ওই বছর ডিসেম্বরে নাইমা তার প্রেমিক আহাদের বটেরতলের বাসায় চলে যায়। এরপর থেকে নাইমা হাসপাতালের নার্স কোয়ার্টারে বসবাস করলেও প্রায়ই আহাদের বাড়ি বেড়াতে যেতো। আর অবসরকালে আহাদকে নিয়ে পাড়ি জমাতো অজানার উদ্দেশ্যে। শুধু এখানেই থেমে থাকেনি আহাদ ও নাইমার প্রেম কাহিনী। ডাক পড়ে সংসারী হওয়ার। কিন্তু তার আগে আহাদের মা হালিমা বেগম তার হবু পুত্রবধূ নাইমাকে বুঝিয়ে ১৫ শতক ভূমি কেনার প্রস্তাব দেন। সে প্রস্তাবে রাজি হয়ে নাইমা তার জমানো ১ লাখ টাকা তুলে দেয় হালিমার হাতে। পরে ২০১১ সালে আরও দুই লাখ টাকা দেন জমি কিনতে। জমি নাইমার নামেই হবে বলে আশ্বস্ত করে আহাদের পরিবার। এজাহারে নাইমা আরও উল্লেখ করেন, টাকা দেয়ার পর ২০১২ সালের ১৭ই জানুয়ারি মামুন, মোহম্মদ আলী ও মারুফা আক্তারের সহযোগিতায় নগরীর টিলাগড় এলাকার ২নং রোডের ৮ নম্বর বাসায় বসে একজন মৌলভী এনে আহাদ ও নাইমা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়েতে কাবিন ধরা হয় তিন লাখ টাকা। নাইমা জানান, বিয়ের পর তিনি বেশির ভাগ সময় স্বামী আহাদের সঙ্গে সংসার করেন। কাজের চাপে মাঝেমধ্যে হাসপাতালে নার্স কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। তবে, বিয়ের সময় কাবিন রেজিস্ট্রির নামে বেশ কিছু কাগজপত্রে নাইমার দস্তখত নেয়া হয়। একই সময় তার ভোটার আইডির মূল কপিও নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে, বিয়ের প্রায় দুই মাস পর নাইমার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। নাইমা চাপ দিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে যান। আর এ বিষয়টি নগরীর চৌহাট্টাস্থ একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যায়। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পরপরই আহাদ তার মাসহ আসামিরা নাইমাকে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেয়। নাইমা জানান, সন্তান নষ্টের পর আহাদ ও তার পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে তিনি জমি রেজিস্ট্রি ও কাবিন রেজিস্ট্রির কাগজপত্র দেখতে চান। এ ব্যাপারে নাইমা স্বামী আহাদ ও তার পরিবারের ওপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করলে ২০১৩ সালের ১৫ই ডিসেম্বর আহাদ ও তার লোকজন নাইমাকে মারধর করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। নাইমা বলেন, ‘আহাদ ও তার পরিবারের সদস্যরা আমার প্রায় চার লাখ নিলো, বিয়ে করে আমার জীবন নষ্ট করলো। এরপর আমাকে তাড়িয়ে দিয়ে খারাপ মেয়ে বলে অপবাদ রটায়।’ এ ঘটনার পর নাইমা নগরীর শাহপরান বিআইডিসি এলাকায় তার খালার বাসায় ওঠেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। এর পরও আহাদ ও তার পরিবার নাইমার পিছু ছাড়েনি। তারা নাইমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে অভিযোগ দায়ের করে হয়রানি করতে থাকে। আর বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে নাইমাকে হাসপাতাল থেকেও চাকরিচ্যুত করা হয়। এদিকে, ঘটনার পর নাইমা তার পরিচিত মাহবুবুল ইসলাম, দেলোয়ার হোসেন দুলনকে নিয়ে চলতি বছরের ৩রা ফেব্রুয়ারি আহাদের পরিবারের কাছে পাওনা ৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা চাইতে যান। এ সময় আহাদ ও তার পরিবার পাওনা টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং হুমকি দিয়ে বলে, ‘যদি স্বামী দাবি করি তাহলে সে খুন করে ফেলবে।’ আহাদ নার্স নাইমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবেও অস্বীকার করে। নাইমা জানান, বিয়ের পর আহাদের গোটা পরিবারের সঙ্গে তাদের একত্রে ছবি রয়েছে। এছাড়া প্রেগনেন্সির ডাক্তারি রিপোর্টসহ সকল আনুষঙ্গিক প্রমাণাদি রয়েছে। এরপর তাকে চাকরিচ্যুত করার পরও নাজেহাল করে। এখন তাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এদিকে, এ ব্যাপারে সিলেটের শাহপরান থানার ওসি মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল বিকালে জানিয়েছেন, নাইমার এজাহার পাওয়ার পর তারা প্রাথমিকভাবে বিষয়টি তদন্ত করেছেন। তদন্তের পর মঙ্গলবার রাতে মামলা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। এদিকে, গতকাল নাইমা জানান, আসামিরা এখন তাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। তিনি যেখানেই যাচ্ছেন সেখানে পিছু পিছু ছুটে যাচ্ছে আহাদ ও তার পরিবারের লেলিয়ে দেওয়া গুণ্ডারা। তাদের কারণে তিনি তটস্থ রয়েছেন। উৎসঃ manabzamin