জসিম উদ্দিন: সৈয়দপুর শহরের উঁচু দালানের উপরে উঁকি দিচ্ছে মঙ্গলবারের প্রথম প্রহরের সূর্যটা। শহীদ ডা. জিকরুল হক সড়কের উত্তরের অংশে জিআরপি ক্যান্টিন। ওই ক্যান্টিনের মুখোমুখি আইডিয়া নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
সেখান থেকে বনভোজনের উদ্দেশ্যে ‘ভিন্নজগত’-এ যাত্রা শুরু। তবে গাড়ীতে নয় পায়ে হেঁটে! স্থানীয় সংবাদ কর্মীর একটি অংশ জিআরপি ক্যান্টিনের ওই স্থান থেকে পায়ে হেঁটে তাজির হোটেলের সামনে গিয়ে মাইক্রোবাসে উঠে। তারপর ৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চললো সাংবাদিক ভর্তি মাইক্রোবাসটি। নানা কথা আর গল্পে জমিয়ে উঠছে এ যাত্রাপথ। হঠাৎ কে যেন স্মরণ করে দিলো ‘চাচা, কোথায়!’ তাই তো আমাদের নবী চাচা কই? নবী চাচা মানে আমাদের সিসি নিউজ’র নির্বাহী সম্পাদক নবীউল ভাই। তিনি আগের দিন ওই উপাধি পেয়েছেন একজন খ্যাতি সম্পর্ণ ভাতিজির কাছ থেকে। সে এক অভিনব ঘটনা। পাঠকদের কাছে তা বিস্তারিত জানাবো কোন একদিন। আজ ভিন্নজগতের ভ্রমনের কথায় ভিন্ন বিষয় টানতে যাবো না। যাহোক সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাচা না থাকার কারণ জানতে চেষ্টা করছে। অগত্যা আমি হেতুটা বলে দিলাম, তিনি আসছেন! আর এক ভাতিজাকে সাথে নিয়ে ওনার মটরসাইকেল করে। সহসা প্রশ্ন এলো কোন ভাতিজা? একজন রসিক করে বললেন মাসিক নিয়মিতকরণ ভাতিজাকে নিয়ে। দম ফাটা হাসির ঝড় বয়ে গেল ওই সময়। মাসিক নিয়মিতকরণ ভাতিজা মানে ‘এম আর’ মহসিনের কথা বলছে নিশ্চয়।
এমন সময় ফোন আসে দিল্লীর বাদশা স্মরি কিশোরগঞ্জ থেকে প্রকাশিত জনগনের বার্তা পত্রিকার সম্পাদক বাদশা আলমগীরের। তিনি বিশেষ একটা কাজে আটকা পড়েছেন, তাই তিনি দুইজন স্থল বাহিনী পাঠাচ্ছেন অথ্যাৎ আরিফ ও মিজান নামে দুই কলম সৈনিক ভিন্নজগতে পাঠিয়ে দিয়েছেন তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য। এদিকে হামিদা ভাবী, দুঃখিত হামিদার ভাইয়ের কথা উঠে এলো ওই সময়। তিনিও আসছেন দুপুরের মধ্যে ভিন্নজগতে। অবশ্য দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও হামিদার ভাই সঙ্গ দিতে পারেননি। তবে লটারীতে ভাবীর জন্য পাওয়া নেইল কার্টারটি ঠিকই পৌছে দিয়েছে পাম্পু মারা শাম্পু ওয়ালা রুহুল কুদ্দুস।
যাহোক অল্প সময়ের মধ্যে মাইক্রোবাসটি ভিন্নজগতে প্রবেশ করলো। বিনা টিকেটে মিললো একটা কটেজ। সবাই নামলো আর সাথে নামলো বনভোজনের জন্য আনা দ্রবাদি। চুলা তৈরিতে নেমে গেলো কুতুব উদ্দিন আলো। নামের সাথে মিল রয়েছে বৈকি। মানে চুলায় আলো জ্বালানোর কাজটি তিনিই করলেন। একটু একটু হেল্প করতে এগিয়ে গেল আলমগীর। তবে জবা (জনগনের বার্তা) আলমগীর না- ইনি নীচি (নীলফামারী চিত্র) আলমগীর। বউয়ের ধমক খাওয়ার আগেই একটু ট্রেনিং নেয়ার চেষ্টা করতে চাইছে বৈকি। আলো ভাই আর একবার আলো ছড়িয়ে দিলেন গোসল করার সময়। সে আলোয় চোখ জুড়িয়ে গেল আগন্তুক ক’জন মহিলা দর্শনার্থী। আলো ভাইয়ের নিতম্বের আলোর ছটায় সরিয়ে গেলেন সেখান থেকে দু’শ গজ দূরে।
চলচিত্র জগতের ড্যান্স মাস্টার জাভেদ-এর সমান উচ্চতার সৈয়দপুরের জাভেদ পরনের লুঙ্গি সামলাতে হিমশিম খেয়েছে বার কতেক। গোসল করতে করতে শরীরের রং আরও কালো করে ফেলেছে। এর চেয়ে মুখখানা কালো হয়েছিল লটারীতে ভাবীর জন্য ন্যাপকিন পাওয়াতে। এর জন্য বাসায় নাকি একটু ঝগড়ার সৃষ্টি হয়েছিল তাদের। অনুমান হয় যে, ভাবী কড়া ভাষায় বলেছিল জাভেদ ভাইকে ‘নিশ্চয় তুমি কোন মেয়ের নামে ওই লটারীর কুপণটি তুলেছিলে। তা নাহলে কেই পেলো সাবান, পারফিউম, পাউডার কত কি! আর তুমি পেলে — ছি: ছি ।
বাংলা সিনেমার অখ্যাত কিছু নায়িকার গোসলের দৃশ্য হয়তো অনেকে দেখেছেন। সাদা পোশাক পানিতে ভিজে এমন ভাবে ল্যাপ্টে থাকে যা পাঠক হয়তো বুঝতে পেরেছেন। তবে আমাদের সাব্বির ভাই এমন অবস্থায় পরলেও সামনের দিকে ক্রিকেটের বলারদের মতো একটা রুপাল আড়াল দিয়ে ইজ্জতটুকু রক্ষা করেছেন সুকৌশলে। নবী চাচা কিন্তু পোষাক পাল্টাতে গিয়ে বেআব্রু হয়ে ছিল। এসময় ক্যামেরা হাতে সাদেকুল আর হুল কুদ্দুস খটাস খটাস করে চাচার ইজ্জতের বারোটা বাজিয়ে ছাড়লো। এখন শুনছি ওই ছবি দিয়ে ব্লাকমেইল করার হুমকি দিচ্ছে চাচাকে। বলা হচ্ছে, ‘তাজিরে খাওয়ান নইলে ফেইসবুকে ছেড়ে দিমু ওই ছবি’। তবে ঘটনা শুনে ওসি সাহেব (সহিদার রহমান) চাচার ইজ্জত বাঁচাতে ছুটে গেলেন ভিন্নজগতে। ঘুস হিসেবে খাওয়ানো হলো পোলাও মাংস আর ডান্ডা না মারার জন্য খাওয়ানো হলো ঠান্ডা। শেষে গিন্নীর জন্য হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো পন্ডস ক্রীম। ঘুষের এ কারবার দেখে নিলো পুলিশ কনস্টেবল দুলাল ভাই। আয়োজক কমিটি ওনাকে ঠাসাঠাসি করে হাতে ধরিয়ে দিলো পারফিউমের ছোট্ট একটা শিশি।
মুখ ভার করে বসে আছে ছোট ভাই রুপম। ভাগ্যে মিলেছে এক প্যাকেট কনডম। অধিক টাকা দিয়ে তো দূরের কথা এমনিতেই কেই ওই প্যাকেট বহন করতে নারাজ। একই দশায় পড়েছে আমাদের সাথে থাকা বাবুর্চি হাবু মিয়া। তিনি পেয়েছেন লোমনাশক একটি তেলের বোতল। বেচারা লজ্জায় চেয়ার ছেড়ে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে দিন তারিখ মেলানোর চেষ্টা করছে। এদিকে সরিষার তেলের গুনাগুন নিয়ে গাল লাল হচ্ছে শ্যালক খ্যাত সাদেকুলের। তবে সান্তনা তার একটাই- ওই তেলের জাতি ভাই নারিকেল তেল পেয়েছে আরও একজন। তিনি হলেন রেলের পাশে বসবাসকারী তেল বিশেষজ্ঞ রইজ উদ্দিন রকি। কার মাথায় ওই তেল যে তিনি ব্যবহার করেন তা তিনিই জানেন। কারণ ভাবীর মাথার চুল উঠে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন শাম্পু গবেষক রুহুল কুদ্দুস। তাহলে রকি ভাই নারিকেল তেলের ব্যবহার করেন কোথায়- তা পাঠকের কাছে এখন সিরম পরিষ্কার।
ইজ্জত বাঁচাতে সবসময় সচেতন ছিলো দুলাল আর হিরো ভাই। বিধি বাম! গোসলে নেমে তিন বার পানি খেয়ে দম বন্ধ হয়েছিল দুলাল ভাইয়ের। মাসিক নিয়মিতকরণ মহসিন ভাই রক্ষা করেছিল সে সময়। তবে হিরো ভাই বারান্দা ওয়ালা টুপি পরে ভিন্নজগতের কর্মরত মহিলা-পুরুষের সাথে কানাকানি করেছিল সর্বক্ষণ। মাথায় টুপি কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে জানা গেলো- হিরোর মাথায় বিশাল টাক। টাক ঢাকতে হিরো ভাই হিরো স্টাইলে টুপি পরেন- আর টর্চ লাইট দিয়ে খুঁজে এমন গোপন তথ্য আবিস্কার করলেন দাঁড়িয়ে মাথা দেখা যায় এমন লম্বা বাজ অথ্যাৎ দিনে চারবার পোষাক পাল্টানো সাহাবাজ।
এমনি নানা আনন্দ উল্লাসের মাঝে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। মাইক্রোবাসটি সৈয়দপুরের উদ্দেশ্যে ছুটে চলছে আর সেই সাথে মুখ দিয়ে বমি ছুটছে আলো ভাইয়ের। বমির ঠেলায় সৈয়দপুরে এসে খাট ভাঙ্গার জন্য স্যাভলন পাওয়া ভাই-ভাবীর হাতে উজালাটা দিতে ভুললেন না তিনি।
মাইক্রোবাসটি আবার ফিরে এলো জিআরপি ক্যান্টিনের সামনে। প্রতিদিনের মতো সবাই বসে পড়ি চেয়ার টেনে এনে টেবিলের চারপাশ। চলে লাল চায়ের সাথে আড্ডাবাজি। মিলিয়ে নিই রোজদিনের হিসেবপত্র। শেয়ার করি অন্যদের সাথে নিজেরদের সুখ-দুঃখের কথা। সহযোগিতার হাত বাড়াই যে যার সাধ্যমতো। গুছিয়ে নিই আগামীকালের সংবাদ সংগ্রহের কৌশল আর দায়িত্ব; তারপর আগামী দিনের জন্য বুকভরা শান্তির আশা নিয়ে ফিরে যাই আপন গৃহে।