রফিকুল ইসলাম, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম): কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় সনাতন ধর্মাবলীদের ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতির মেলা প্রতি বছরের ন্যায় ৩দিন ব্যাপী শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার থেকে। মেলাকে ঘিরে এক সপ্তাহ ধরে মেলা প্রাঙ্গণে সার্কাসের নামে অশ্লীল নৃত্যের অর্ধশতাধিক প্যান্ডেল তৈরী করা হয়েছে এবং কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার নামী-দামী কু-খ্যাত জুয়াড়ীরা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে গতকাল সোমবার থেকে মেলা প্রাঙ্গণের আশ-পাশে শত শত জুয়ার আসর বসানোর কাজ সম্পন্ন করেছে বলে সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে। এ মেলাকে ঘিরে প্রতি বছরের মতো এবারেও কোটি টাকার জুয়ার খেলার টার্গেট নিয়েছে আগত জুয়াড়ীরা। কথিত আছে, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পূর্ণ, নান্দনিকতায় স্নাত, কিংবদন্তির কল্পলোকে ঘেরা, উল্লেখযোগ্য প্রাচীন তীর্থ কীর্তি ‘সিন্দুরমতি দীঘি’। পৌরাণিক আলোচনা ও জনশ্র“তি অনুযায়ী, রাজা রাজনারায়ণ রতœগর্ভা রাণী মেনেকা দেবী অনেক সাধনা করে মহামায়াকে সন্তুষ্ট করলে, তাদের ঘর আলো করে দু’টি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দেব অংশ প্রাপ্ত হওয়ায়, সূচনালগ্ন থেকেই এদের রূপ, গুণ ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্যে অসাধারণত্ব এবং অসামঞ্জস্যতার বিস্তার ঘটে। এক সময় রাজা, প্রজাদের জলকষ্ট দূর করবার জন্য পুকুর খনন করবার সিদ্ধান্ত নেন। অজস্র শ্রমিক দিনরাত খেটে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, দীর্ঘ দিন যাবৎ অকান্ত পরিশ্রম করলেও শেষ মুহুর্তে জোয়ার আসেনি, মেলেনি জলের কোন সন্ধান। সবাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমনি বিপদের সময় রাজা স্বপ্নযোগে দৈব নির্দেশ প্রাপ্ত হন। এর সারবত্তা হলো, রাজাকে, তাঁর দুই মেয়ে, সিন্দুর ও মতিকে দিয়ে খনন করা পুকুরের মাঝখানে ‘গঙ্গা দেবীর পূজো দিতে হবে। প্রজাদের মঙ্গল ও কল্যাণার্থে রাজা বিভিন্ন বাঁধা বিপত্তি উপো করে স্বপ্নাদেশ মেনে নিয়ে, মেয়েদের সহ পূজায় অংশ গ্রহণ করলেন। অর্চনা শেষের পথে। অঞ্জলী সমাপ্ত। পূরোহিতের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে দেবীর বিসর্জনের অশ্র“সজল বিদায়ী বেদমন্ত্র। হঠাৎ করে বিকট আওয়াজ। শোঁ-শোঁ শব্দ। চারকোণ থেকে পাতালপুরীর অন্ধকার ভেদ করে এক যোগে, কাউকে কোন কিছু ভাববার সুযোগ না দিয়ে নিমিষে, এক যোগে আবির্ভূত হলো বৃহৎ জলরাশি। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, পড়ি-মরি করে যে যেভাবে পারে, সেভাবে কোন রকমে, আহত, অর্ধমৃত, অচেতন অবস্থায় উপরে অবস্থান নিলেন। অনেক পরে সিন্দুরমতির জন্য যখন সাড়ম্বরে খোঁজ-খবর করা হলো, তখন বিরাট জলাধারটি কানায়, কানায় পূর্ণ। হারিয়ে গেল অল্প দিনের জন্য রাণী মেনেকার কোল আলো করে আসা সিন্দুর ও মতি। সাত দিন পর মহামায়ার আদেশে রাজা-রাণী কন্যাদ্বয়ের কনীষ্ঠাঙ্গুলী দেখতে পেলেন। সেদিন ছিলো রামনবমী তিথি। মানব কল্যাণার্থে নিবেদিত এ কন্যাদের মহতী ত্যাগের মহিমায় প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই দু’জনের নামানুসারেই পুকুরটি পরিচিতি লাভ করে। ল ল সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পাপ মোচন করে পূণ্য সঞ্চয়ের আশায় প্রতি বছর এ দিনে সূর্যোদয়ের আগে স্নান করে। ১১ একর জমিতে এ পুকুরের বিস্তার অংশ। ১৯৭৫-৭৬ সালে এর বেশীর ভাগ সংস্কারের সময় প্রাচীন আমলের স্বর্ণ ও রৌপ্যমূদ্রা, রাম লণের মূর্তিসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া যায় বলে জনশ্র“তি রয়েছে। এটি বছরের বার মাসই জলে ভরা থাকে। অলৌকিকত্ববাদীরা মনে করেন, সিন্দুরমতি দীঘি ও ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যে ভূগর্ভস্থ প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার একটি সুড়ঙ্গ পথ আছে। প্রাকৃতিক লীলাভূমির অপরূপ দৃষ্টিনন্দন স্থানটি খুব সহজেই অতিথিদের কাছে টানে। সরকারী উদ্যোগে ভ্রমণ পিপাসুদের উপযোগী উদ্যানের ব্যবস্থা করা হয়েছে এখানে। তীর্থস্থান হলেও সকলের পদচারণায় মুখর এ ‘ব্যতিক্রম মুক্তাঞ্চল’ অসাম্প্রদায়িক মিলন মেলার মহামানবীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি বৎসর এখানে বসে সিন্দুরমতি মেলা। এ স্থানে, এ দিনে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। সকলের সমবেত উল্লাস, হর্ষধ্বনি, হাস্যকলতান মুখর অনাবিল আন্তরিক পরিবেশ প্রথম প্রহরের মিষ্টিক পূতধারার অবগাহণে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা। বছরের একটি দিনে চেনা-অচেনা অনেকের সঙ্গেই অনেকে কুশলাদি বিনিময় করে। ব্যস্ততার মাঝে দুদন্ড পরিচিত জনের সাাৎ-অতীতের বিস্তৃত বেদনা দূর করে দেয়। সহজ-সরল-প্রাণ প্রাচুর্যময় মানুষ খুঁজে পায় হৃদ্যিক-অমৃত-কানন। বাস্তবতা ভিন্ন। মেলাকে ঘিরে মদ, জুয়া, অশ্লিল নৃত্য, তাস খেলায় লগ্নিকারী লোকের অভাব নেই আমাদের সমাজে। এই সমস্ত অশুভ, উন্নাসিক, অসভ্য, ব্যাভিচারীদের খপ্পড়ে পড়ে সহজ সরল-সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়। মেলার অনাবিল আনন্দ সাধ্য অনুযায়ী সকলের সাথে ভাগ্ করে নেবার জন্য সঞ্চিত টাকা-পয়সা চোখের পলকে উধাও হয়ে যায়। চোখের জল ফেল্তে, ফেল্তে সামান্য ভুলের কারণে কপর্দকহীন অবস্থায়, খালি হাতে বাড়ি ফেরা ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। এ দিকে মেলায় পূণ্য স্নান করতে দেশের বিভিন্ন স্থান ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে আগত পুণ্যার্থী বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়–য়া শিার্থীসহ বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের মিলন মেলা ঘটে এবং প্রশাসনের প থেকে এ বিষয়ে কঠোর পদপে না নেওয়া হলে চিরায়ত, পুষ্পিত সুগন্ধী কুঞ্জের পুঞ্জটি বিনষ্ট হয়ে যাবে। শূন্য খাঁ, খাঁ করবে এ অঙ্গন। ঐতিহ্য কাগজে কলমেই থাকবে সীমাবদ্ধ । সাধারণ, ভদ্র জনতা মেলায় আসা থেকে বিরত রাখবে নিজেদেরকে। এ জন্য প্রশাসনের কাছে অশ্লীল নৃত্য ও জুয়ার আসরগুলো কঠোর হস্তে দমন করার আহ্বান জানিয়েছেন সনাতন ধর্মালম্বীরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস পালিত
কুড়িগ্রামের রাজারহাটে আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলে সূর্যের হাসি কিনিকের আয়োজনে ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে র্যালী ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় উপজেলা স্বাস্থ্য পঃ পঃ কর্মকর্তা ডাঃ কে, কে পালের নেতৃত্বে হাসপাতাল চত্বর থেকে একটি র্যালী বের হয়ে প্রধান প্রধান সড়ক প্রদণি শেষে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হলরুমে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন- উপজেলা স্বাস্থ্য পঃ পঃ কর্মকর্তা ডাঃ কে, কে পাল, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আশুতোষ, ব্র্যাক স্বাস্থ্য ম্যানেজার ছামছুন্নাহার, সূর্যের হাসি কিনিকের ম্যানেজার মনিরুজ্জামান, আরডিআরএস রাজারহাট ম্যানেজার প্রমূখ।