• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৪৮ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

নূর হোসেনের চিঠিতে নারায়ণগঞ্জে তোলপাড়

nurসিসিনিউজ ডেস্ক: আলোচিত সাত হত্যা মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন সম্প্রতি ভারত থেকে একটি পাঠিয়েছেন বলে নারায়ণগঞ্জে খবর রটেছে। মঙ্গলবার চিঠিটি জেলা প্রেসক্লাবে এসে পৌঁছানোর পর এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। তবে চিঠিটি সত্যিই নূর হোসেনের কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

চিঠিতে নূর হোসেন জানিয়েছেন, ‘বড় ভাই’ তাকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নজরুল ইসলামকে পথ থেকে সড়িয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আমি সাতজন হত্যা হোক এটা কখনও চাইনি। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এ কাজটা তারা করেন। এ কারণে আমি বড় ভাইকে বলি, এত বড় কাজটি আমি করিনি। কী কারণে কার নির্দেশে র‌্যাব এত বড় কাজটি করলো তা আমার জানা নেই। এরপর আমি বড় ভাইয়ের নির্দেশে ভারতে চলে আসি।’

নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে আসা নূর হোসেনের ‘চিঠি’ পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো।

চিঠি
তারিখ: ৩১/০৫/২০১৪ ইং
প্রিয় নারায়ণগঞ্জ ও সিদ্ধিরগঞ্জবাসী। আমার সালাম নিবেন। আমি লেখাপড়া না-জানা একজন সাধারন মানুষ। আমার চাওয়ার চেয়ে পাওয়াটা ছিল অত্যন্ত বেশি। তাই অহমিকা ও মূর্খতার কারণে আজ এ পরিস্থিতি। সিদ্ধিরগঞ্জ হারিয়েছে সাতটি তাজা প্রাণ। আর আমি হয়েছি দেশছাড়া।

আপনারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন, নজরুল ইসলাম সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে শুরু করে বহুদিন যাবৎ আমার সকল কাজে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিরোধিতা করে আসছিল। তখন থেকেই সে আমার প্রকাশ্য শত্রুতে পরিণত হয়। সে আমাকে হত্যার জন্য একবার ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে গুলি করায়। আমি মাথায় গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে যাই। তদুপরি সে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র করতেই থাকে। সরকার ক্ষমতায় আসার পর বর্তমান সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে আমার সম্পর্ক তেমন ভালো না থাকার সুযোগে গত কিছুদিন যাবৎ আমার প্রতিবেশী নজরুল ও মনির নিহত নজরুলের সহযোগিতায় আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ঢাকার একটি কিলার গ্রুপের সঙ্গে এক কোটি টাকার চুক্তি করে। চুক্তি মোতাবেক আমাকে যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের ওপরে গুলি করে হত্যার পরিকল্পনা করে। আমি বিষয়টি টের পেয়ে প্রাণে রক্ষা পাই। পূর্বেও তারা আমাকে হত্যার জন্য অপহরণ করে। আমি সেখান থেকে টাকার বিনিময়ে রক্ষা পাই। নজরুল ইসলামের সঙ্গে তৎকালীন সাংসদ কায়সার হাসনাত, সিটি মেয়র আইভী, এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় সে চিটাগাং রোডে সড়ক ও জনপথের অফিসে, পাওয়ার হাইজ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, আদমজী ইপিজেড, চিটাগাং রোড ট্রাক টার্মিনাল এবং সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তা ছাড়াও আমার ব্যক্তিগত বিভিন্ন ব্যবসায় বিভিন্নভাবে বাধা ও হয়রানি করতে থাকে। এমনকি আমার প্রাণনাশেরও চেষ্টা করতে থাকায় আমি নিরুপায় হয়ে বিষয়টি বড় ভাইকে জানাই। তিনি আমাকে তাকে পথ থেকে সরিয়ে দেয়ার পরামর্শ দেন। আমি বিষয়টি নিয়ে মেজর আরিফের সঙ্গে কথা বললে তিনি আমার থেকে বড় ভাইয়ের সম্মতি আছে কি না জানতে চান। আমি হ্যাঁ বললে তিনি বড় ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে আমাকে জানাবেন বলে জানান। আমি মেজর আরিফকে নিয়ে একদিন রাতে বড় ভাইয়ের কাছে গেলে তিনি সম্মতি দেন এবং ইসমাইলের বিষয়েও কথা বলেন। ইসমাইলের বিষয়ে মতি আমার মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা দেন। ইসমাইলের কাজটি সমাধানের পর নজরুলের কাজটি নিয়ে মেজর আরিফ ও রানা, তারেক সাহেবের সঙ্গে কথা বলে ১ কোটি টাকা দাবি করলে আমরা সম্মত হই। ১৫/২০ দিন পর মেজর আরিফ আবার আমার কাছে ২ কোটি টাকা দাবি করে বলেন, তাকে একা পাওয়া যাবে না। দুজনকে কাজ (মানে হত্যা) করতে হবে। আরো ১ কোটি টাকা লাগবে। তাই মোট দুই কোটি টাকা লাগবে। আমি বড় ভাইকে বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে এক কোটি, মতিকে ৫০ লাখ আর ইয়াসিনকে ৫০ লাখ টাকা দিতে বলেন। বিনিময়ে আমাকে বালু ও ট্রাক স্ট্যান্ড, ইয়াসিনকে সড়ক জনপথ ও পাওয়ার হাউজ আর মতিকে ইপিজেড ও তেলের ডিপো এবং মজিবর রহমানসহ অন্যান্যদের জন্য ইজারাকৃত বিভিন্ন পার্কিং টোল ভাগাভাগি করে দেন। আমাদের সবকিছু সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য মজিবর ভাইকে দায়িত্ব দেন। কাজটি করতে নজরুলের গতিবিধি দেখাশুনার জন্য আমাকে ও মতিকে দায়িত্ব দেন মেজর আরিফ। একবার যাত্রাবাড়ি, একবার সাইনবোর্ড ও আরেকবার মিজমিজি এলাকায় কাজের (হত্যার) পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় আমরা নিরাশ হই। এরপর বড় ভাই আমাকে জানায় ২৭ এপ্রিল তারিখে সে কোর্টে আসবে এবং কোর্ট থেকে বের হলে যেন কাজটি করি। সেই মোতাবেক আমি আরিফ সাহেবকে বললে তিনি তার দলবল (১০ জন) নিয়ে ওই কাজে রওনা হন এবং কোর্ট এলাকায় দুজন সোর্স নিযুক্ত করেন। মতিও তার সোর্স পাঠিয়ে নজরুলের কোর্টে থাকা নিশ্চিত ও তাকে শনাক্ত করানোর কাজটা করান। আমি ও র‌্যাবের সঙ্গে থাকা আমার লোক শাহজাহানের মাধ্যমে র‌্যাবের কাজকর্ম তদারকি করি। বেলা ১টা ৪৫ মিনিটে র‌্যাবের সদস্যরা নজরুলকে উঠিয়ে নিয়ে আসে। পরে জানতে পারলাম মোট সাতজনকে র‌্যাব উঠিয়ে আনে। র‌্যাব পরিস্থিতি বুঝেশুনে কাজ করার জন্য তাদেরকে অজ্ঞান করে নিজেদের হেফাজতে রাখে। এরপর একইদিন রাত আড়াইটায় তাদের হত্যা করা হয় বলে আরিফ ও রানা আমাকে জানান। আমি সাতজন হত্যা হোক এটা কখনও চাইনি। আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই এ কাজটা তারা করেন। এ কারণে আমি বড় ভাইকে বলি এত বড় কাজটি আমি করিনি। কী কারণে কার নির্দেশে র‌্যাব এত বড় কাজটি করলো তা আমার জানা নেই। এরপর আমি বড় ভাইয়ের নির্দেশে ভারতে চলে আসি।

নারায়ণগঞ্জবাসীর জানা একান্ত প্রয়োজন মনে করে এই ঘটনাটি আমি জানালাম। কারণ আমাকে যেকোন সময় হত্যা করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে পুরো ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জবাসীর নিকট অজানা থেকে যাবে আর বিনা দোষে অনেকে শাস্তিভোগ করিবে। আমার এই কাজের কোন ক্ষমা নাই তবুও আমি নারায়ণগঞ্জবাসী তথা সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর নিকট ক্ষমা প্রার্থী।

চিঠিটি অভ্রতে লেখা
নূর হোসেন পড়ালেখা জানেন না। শুধু স্বাক্ষর করতে পারেন। চিঠির নিচে তার একটি স্বাক্ষর রয়েছে। চিঠিটি তার কি না এটি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে থাকা তার আগের স্বাক্ষরের সঙ্গে মেলালে বোঝা যাবে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এ চিঠিটি সাংবাদিকদের হাতে এসে পৌঁছায় তা যাচাই সম্ভব হয়নি। চিঠিতে কম্পিউটারের অভ্র ফ্রন্টে লেখা। ভারতে বাংলা সুটনি ফ্রন্ট পাওয়া খুবই কঠিন। তবে ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে অভ্র ফ্রন্টে লেখা সোজা। সেক্ষেত্রে বাংলা লেখার জন্য নূর হোসেন কারো সহায়তা নিয়ে কোন কম্পিউটার থেকে এটি লিখেছেন বলে মনে হয়। চিঠিতে প্রেরকের ঠিকানা হিসেবে ইংরেজিতে ‘সুব্রত পোদ্দার, লিলিপোট ফ্যাশন হাউজ, ১২/এ, মারকুইজ স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০১৬, ইনডিয়া’ লেখা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবে চিঠিটি পৌছে মঙ্গলবার দুপুরে। নারায়ণগঞ্জ ডাকঘর থেকে খামে বিলির সিল দেয়া হয় ৯ জুনের।

জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি কবি হালিম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ চিঠি পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘এটি সত্যিই নূর হোসেনের কি না এ নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। চিঠিটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা বিষয়টি জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জানিয়েছি এবং প্রয়োজন হলে চিঠি নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছি।’

চিঠি ও সাম্প্রতিক টেলিফোন রেকর্ড
চিঠির শেষ অংশের বর্ণনার সঙ্গে নূর হোসেনের ও শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক প্রকাশিত কথোপকথনের টেলিফোন রেকর্ডের মিল পাওয়া যায়, যে অডিও রেকর্ড শুনলে ধারণা হয় শামীম ওসমান নূর হোসেনকে ভারতে চলে যেতে সহায়তা করেছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে ‘এরপর আমি বড় ভাইয়ের নির্দেশে ভারতে চলে আসি।’

চিঠির ইসমাইল
‘আমি মেজর আরিফকে নিয়ে একদিন রাতে বড় ভাইয়ের কাছে গেলে তিনি সম্মতি দেন এবং ইসমাইলের বিষয়েও কথা বলেন। ইসমাইলের বিষয়ে মতি আমার মাধ্যমে ৫০ লাখ টাকা দেন। ইসমাইলের কাজটি সমাধানের পর নজরুলের কাজ নিয়ে মেজর আরিফ ও রানা, তারেক সাহেবের সঙ্গে কথা বলে ১ কোটি টাকা দাবি করলে আমরা সম্মত হই।’ এ ইসমাইল সিদ্ধিরগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইল হোসেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসমাইলের ভাই মান্নান জানান, এ বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ইসমাইলকে র‌্যাব অপহরণ করে। এরপর আর তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

মান্নান আরো জানান, নূর হোসেনের শ্যালক নূরে আলম, ভাই বিএনপি নেতা আজিজুরের সঙ্গে রাজনীতি ও এলাকার বিভিন্ন মিল কারখানার ঝুটের ব্যবসা নিয়ে ইসমাইলের দ্বন্দ্ব ছিল।

পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ ব্যাপারে কথা বলতে জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিনের মোবাইলে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

রাইজিংবিডি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ