এম আর মহসিন: পারটেক্স ও লোহার দাপুটে হারিয়ে যাওয়া নীলফামারীর সৈয়দপুরে র্ফানিচার শিল্পের আবারো জনপ্রিয়তা বেড়েছে। স্বল্প দর, উন্নত কাঠ ও রকমারি মডেলে নাম পাল্টিয়ে এবার রেডিমেড নামে বাজারজাত হচ্ছে ফার্নিচার শিল্পের আসবাবগুলি। আর তাই দরিদ্র জনগোষ্ঠি ছাড়াও স্বচ্ছল পরিবারেও এর কদর এখন দিনদিন বাড়ছে। এতে এ জনপদের তৈরী রেডিমেড ফার্নিচারের বাজার গোটা উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। আর এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় দেড় হাজার পরিবারের জীবিকা র্নিবাহ চলছে।
জানা যায়, রাজা-বাদশাদের শাসনামল থেকে শুরু করে আশির দশক পর্যন্ত কাঠের তৈরি আসবাব পত্রসহ অন্যন্য ব্যবহারিক সামগ্রীর ব্যবহার শুধু সম্পদশালীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। নব্বই দশকের পরে আধুনিকতা ও দীর্ঘ টেকসইয়ের নামে পারটেক্স ও লোহার তৈরি আসবাবের ব্যবহার ওই শ্রেণির মধ্যে শুরু হলে ধস নামে এ শহরের কাঠের তৈরি ফার্নিচার শিল্পের। এতে কাঠের কারিগরসহ এ পেশাজীবিরা কর্মহীন হয়ে পড়ে। জীবিকার তাগিদে অনেকে ভিন্ন পেশায় যোগ দেয। এতে সমাজেও একপ্রকার ভেদাভেদ গড়ে ওঠে। পারটেক্সের রেডিমেড আসবাবপত্রের চাহিদা দেখে এ শহরের কতিপয় ফার্নিচার ব্যবসায়ী নিজ কারখানায় তৈরি শুরু করেন রেডিমেড ফার্নিচার। গ্রামের বিভিন্ন হাটে নিজেরাই বিক্রি করতে নিয়ে যান। সামান্য দরে মেলায় স্বল্প আয়েদের মধ্যে রেডিমেড ফার্নিচার কিনতে সাড়া পরে যায়। দিনদিন চাহিদা বাড়তে দেখে অন্য কাঠ ব্যবসায়িরাও শুরু করেন এ ব্যবসা। এভাবে এ শহরে এখন বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টির মতো ছোট-বড় রেডিমেড ফার্নিচার কারখানা। আর এসব কারখানায় কাজ করছেন প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক। গত সোমবার শহরের র্টামিনাল রোড, ক্যন্টনমেন্ট রোড, কাজিহাট, হাতিখানা, গোলাহাট, সিনেমা রোড, মিস্ত্রি পাড়া, কুন্দল কলেজ রোডগুলোতে ছোট-বড় কারখানা ঘুরে দেখা যায়, রেডিমেড ফার্নিচার তৈরীর কারিগরদের ব্যস্ততার দৃশ্য। যেন দম ফেলার ফুরসত নেই তাদের হাতে।
মুরাদ নামে এক কারিগর জানান, আমরা পিস প্রতি চুক্তিতে কাজ করি। তাই যে ভাবেই হোক দিনে ৩ থেকে ৪ শত টাকার কাজ দার করি। রেডিমেড ফার্নিচার তৈরির কারখানার মালিকেরা জানান, প্লেন সোকেস ১৮শত, সাইট ড্রেসিং ২ হাজার, মিডিল ড্রেসিং সোকেস ২হাজার, চাইনিজ বোম্বাই খাট ২ হাজার, বক্স খাট ৫ হাজার, সোফাসেট ৮ হাজার, ওয়ারড্রোপ ৬ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করছি। রবিউল নামে এক পাইকার জানান, উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন হাট-বাজারে এসব রেডিমেড ফার্নিচার নিয়ে যাই। ফার্নিচারগুলো পিস প্রতি ৫শত থেকে ৫ হাজার লাভে বিক্রি করি। তবে এগুলো বেশি কিনছেন দরিদ্র মানুষেরা। ডিমলার ভোগডাবুড়ি ইউনিয়নের আবুল কাশেম জানান, কাঠের ও লোহা এবং পারটেক্স এর ফার্নিচারের দাম ছিল খুবই বেশি। সেগুলো কেনা ছিল সাধ্যের বাইরে। শুধু বিয়ে কিংবা কোন অনুষ্ঠানে দেয়ার জন্য জমি বিক্রি করে বাধ্য হয়ে এসব কেনা হত। কিন্তু এখন অল্প দরে সহজে কিনতে পারছি। সৈয়দপুর কলেজ মোড়ের রেডিমেড ব্যবসায়ি লিটন জানায়, আমরা এসব ফার্নিচার ১ থেকে ২ শত টাকা লাভ ধরে ছাড়ি। এতে পাইকারদের চাহিদা বেড়ে যায়। তিনি আরো জানান, নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে পাইকাররা এগুলো নিয়ে যাচ্ছে। তবে এ সকল ব্যবসায়িসহ সংশ্লিষ্টদের দাবি শুধু এ রেডিমেড ফার্নিচার নিয়ে গন্ডির মধ্যে না থাকার। স্বল্প দামের এ সামগ্রীর আরো টেকসইমুখি করে সারাদেশে বাজারজাত ব্যবস্থার। আর এর জন্য সরকার ও অর্থলগ্নিকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানান তারা। তাহলে প্রাচিন ঐতিহ্যের বাহক এ শিল্প এবার সকল শ্রেণির মধ্যে জনপ্রিয়তা পাবে। আর টিকে থাকবে শিল্পটি সকলের মাঝে।