মাহবুবুল হক খান, দিনাজপুর: দিনাজপুরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম। দীর্ঘদিন ধরে কাউন্সিল না হওয়ায় দলের অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে। নেতৃত্ব প্রত্যাশী বঞ্চিত ও নবীনরা ভূগছেন চরম হতাশায়। আর এই হতাশা ও বিভেদের কারণে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলায় বিএনপির প্রার্থীরা পরাজয় বরণ করেছেন।
দলীয় সুত্রে জানা গেছে, দিনাজপুর জেলা, কোতয়ালী ও পৌর বিএনপি’র সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে দেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে। জেলা, পৌর ও কোতয়ালী কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ বছর আগে। একই সঙ্গে থানা কমিটিগুলোরও মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে।
২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারী দিনাজপুর জেলা বিএনপি’র সর্বশেষ দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। ওই কাউন্সিলে আলহাজ্ব মোঃ লুৎফর রহমান মিন্টুকে সভাপতি, মুকুর চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক ও হাসানুজ্জামান উজ্জলকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট ২ বছর মেয়াদী জেলা কমিটি গঠন করা হয়। জেলা কাউন্সিলের ২ মাস পূর্বে আলহাজ্ব মোঃ সোলায়মান মোল্লাকে সভাপতি ও সৈয়দ জাকির হোসেন বাবুকে সাধারণ সম্পাদক ও আব্দুল মান্নান সরকারকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে ২ বছর মেয়াদী দিনাজপুর পৌর বিএনপি’র ৭১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারী জেলা বিএনপি’র কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও আর কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি।
এদিকে ২০১০ সালে জাহাঙ্গীর আলমকে আহবায়ক এবং আব্দুল মোন্নাফ মুকুল, মাসুদুল ইসলাম মাসুদ, সোহেল নিশাত ও রাশেদুজ্জামান রাশেদকে যুগ্ম আহবায়ক করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট জেলা যুবদলের আহবায়ক কমিটি করা হয়। তিন মাসের মধ্যে জেলা যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও গত সাড়ে ৪ বছরেও যুবদল কমিটি গঠন করতে পারেনি।
অপরদিকে একাধারে ১০ বছর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহবায়কের দায়িত্বে থেকে কাউন্সিল করতে ব্যর্থ হলেও ২০১০ সালে বর্তমান দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ৯০ দিনের মধ্যে কাউন্সিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৩ জন যুগ্ম আহবায়ককে সাথে নিয়ে পুনরায় আহবায়কের দায়িত্ব গ্রহন করেন। তারাও দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছরে পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বর্তমান আহবায়ক কমিটির অধিকাংশ যুগ্ম আহবায়কই দলের কার্যক্রমে নিষ্ক্রিয়।
দিনাজপুর কোতয়ালী বিএনপি’র একই অবস্থা। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে আলহাজ্ব মোঃ আবু বক্কর সিদ্দিককে সভাপতি, মুরাদ আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক ও মোঃ ফরিদুল ইসলামকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে কোতয়ালী বিএনপি’র ৭১ সদস্য বিশিষ্ট ২ বছর মেয়াদী কমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে কোতয়ালী বিএনপি’র মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই ঢিলেঢালে চলছে দিনাজপুর জেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি, জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কোতয়ালী বিএনপিসহ ১৩ উপজেলা বিএনপি’র কার্যক্রম।
এদিকে ৭ বছর আগে ২০০৬ সালের জুন মাসে মোস্তফা কামাল মিলনকে আহবায়ক ও মাহবুবুল হক হেলালকে সদস্য সচিব করে জেলা ছাত্রদলের আহবায়ক কমিটি গঠন করা হয় । এরই মধ্যে ২০১০ সালের ২৯ জানুয়ারী মাহবুবুল হক হেলাল ছাত্রদলের সদস্য সচিব হতে জেলা বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। পরে ছাত্র নেতা মকসেদুল হক টুটুলকে ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব দেয়া হয়। ছাত্রদলও ৭ বছরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে ব্যর্থ হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই চলছে জেলা ছাত্রদলের কার্যক্রম। এভাবে দীর্ঘ সাড়ে ৪ বছরের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলছে জেলা শ্রমিকদল, মহিলাদল, কৃষকদলসহ অন্যন্য অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনগুলো।
দীর্ঘদিন ধরে জেলা বিএনপিসহ অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের কাউন্সিল না হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। তাদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অনেক নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তারা দলের অনেক কর্মসূচীতে অংশগ্রহন করছেন না। দলীয় কর্মসূচীতে এসব নেতাকর্মীদের অংশগ্রহন না করায় অনেক কর্মসূচী বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হয় জেলার শীর্ষ নেতাদের। কেন্দ্র হতে কোন কর্মসূচী আসলে দলের নির্ধারিত কিছু নেতাকর্মী ছাড়া অনেককে অনুপস্থিত থাকতে দেখা যায়। আর এই হতাশা ও বিভেদের কারণে সদ্য সমাপ্ত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি চেয়ারম্যান পদে জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলায় পরাজয় বরণ করেছে।
অবিলম্বে কাউন্সিলের মাধ্যমে দিনাজপুর জেলা, পৌর, কোতয়ালী বিএনপিসহ ১৩ উপজেলা বিএনপি এবং সকল অঙ্গ-সহযোগি সংগঠনের কমিটি গঠন করা না হলে জাতীয় নির্বাচনে দলকে সমস্যায় পড়তে হবে বলে মনে করেন তৃণমূল বিএনপি’র নেতাকর্মীরা।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মুকুর চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কেন্দ্র হতে কোন নির্দেশনা না আসায় জেলায় কাউন্সিল করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া আগে ইউনিয়ন, পৌরসভা ও থানা কমিটির কাউন্সিল হবে, তার পর জেলা কমিটির কাউন্সিল। তবে তিনি বলেন, কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে দলের কার্যক্রম যথানিয়মে পরিচালিত হচ্ছে। কোন সমস্য হচ্ছে না।
জেলা বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক হাসানুজ্জামান উজ্জল বলেন, দিনাজপুরে বিএনপি’র মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। কাউন্সিলের জন্য আমরা প্রস্তুত। জাতীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং কেন্দ্র হতে নির্দেশনা না আসায় চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় কাউন্সিলসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কাউন্সিল অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। হাসানুজ্জামান উজ্জল আরো বলেন, সঠিক সময়ের মধ্যে কাউন্সিল করতে না পারলেও বিভিন্ন উপজেলা ও পৌর কমিটির বর্ধিত সভা এবং কর্মী সভার মাধ্যমে নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে, দলের কার্যক্রম বেগবান ও গতিশীল করার চেষ্টায় নেতৃবৃন্দ সদা সক্রিয় রয়েছেন।