সিসিনিউজ: নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষনা করেছে উপজেলা প্রশাসন। শনিবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ মাঠে অনুষ্ঠিত মানবতার সমাবেশে নামে এক অনুষ্ঠানের জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় হুইপ ও নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শওকত চৌধুরী এ উপজেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত ঘোষণা করেন ।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে নীলফামারী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রশিদুল ইসলাম, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বাবুলসহ বিভিন্ন ইউপি চেয়ারম্যানরা বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে জানানো হয়, যাচাই-বাছাই শেষে উপজেলা ৯১৬ জন ভিক্ষুকের মধ্যে ১৩৭ জনকে ক্ষুদ্র ব্যবসায় সম্পৃক্তকরণ, ২৩১ জনকে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে সদস্যভুক্তি এবং বাকী ৬৪৮ জন ভিক্ষুককে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচীর আওতাভূক্ত করা হয়।
মাগুড়া ইউনিয়ন থেকে আসা অমিছন (৬৫) নামের এক ভিক্ষুক জানান, ভিক্ষা করে খাই বলে গ্রামের অনেক সম্মানী মানুষ আমাদের ঘৃণার চোখে দেখে। এই পেশায় থাকতে আর ইচ্ছে হয় না। মানুষের বাড়িতে ভিক্ষা চাইতে গেলে ছোট-বড় সবাই খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু কি করবো পেটে খায়। তাই জীবনটা বাঁচানোর জন্যই ভিক্ষা করি।
কিশোরগঞ্জ সদর ইউনিয়নের কেশবা গ্রাম থেকে আসা জ্যোৎনা (৫৫) ও সাহেরা (৬০) নামের দু’জন ভিক্ষুক জানান, আমাদের যদি কাজ-কর্মের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে আমরা ভিক্ষা করবো না। ভিক্ষা করা ভালকাজ না, কিন্তু কি করবো কোন কাজ-কর্মতো কেউ দেয়না তাই এইটা আমার পেশা।
বাহাগীলি ইউনিয়নের বাহাগীলি গ্রাম থেকে আসা মরিতন (৫০) নামের এক ভিক্ষুক জানান, ভিক্ষা করা অসম্মানের কাজ। বয়স হয়ে গেছে আগের মতো আর চলাফেরা করতে পারি না। মনটাও চায় না ভিক্ষা করতে। কিন্তু তারপরও পেটের তাগিদে ভিক্ষা করতে হয়। না করলে খাবো কি।
সমাবেশে আসা হাসান আলী, অমিছন, জলিল নামের কয়েকজন ভিক্ষুক জানান, ভিক্ষা করা খুব কষ্টের কাজ। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়েও ভিক্ষা করতে হয়। ভিক্ষা করতে না পারলে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়।
উপজেলার বাহাগীলি গ্রামের ভিক্ষুক জাহারণ বেগম (৬৫) বলেন, ভিক্ষা করা অসম্মানের কাজ। ভিক্ষা করা ভালো লাগেনা। মানুষের কাছে ভিক্ষা চাইলে খারাপ ব্যবহার করে। কিন্তু তারপরও পেটের তাগিদে ভিক্ষা করতে হয়েছে। তিনি জানান, বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তিন মন ধান পেয়ে এখন পিঠার ব্যবসা করে ভালো আছেন।
একই গ্রামের অপর ভিক্ষুক মহিতন নেছা (৬০) বলেন, ভিক্ষা করা খুব কষ্টের কাজ। রোদ-বৃষ্টি-ঝড়েও ভিক্ষা করতে নয়। ভিক্ষা করতে না পারলে না খেয়ে থাকতে হয়। উপজেলা পশাসনের সহযোগীতায় ক্ষুদ্র ব্যবসা করে এখন ভালো আছেন বলে জানান তিনি।
৩৫ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তিতে জীবন চলছিল কিশোরগঞ্জ উপজেলা সদরের হাবিবুল্লা মিয়ার (৬৫)। উপজেলা প্রশাসনের এমন উদ্যোগে তার সেই অভিশপ্ত জীবনের অবসান ঘচেছে বলে জানান তিনি।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এনজিও আরডিআরএস, আনসার-ভিডিপি ও ইউনিয়ন পরিষদের সহায়তায় উপজেলায় ৯১৬ জন ভিক্ষুক চিহ্নত করা হয়। এরপর তাদের শ্রেণীবিনাশ অনুযায়ী বিভিন্ন কর্মসংস্থানমূলক কাজে সম্পৃক্ত ও সরকারী বিভিন্ন ভাতার আওতায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে তদারকির জন্য উপজেলা কমিটি ছাড়াও প্রত্যকটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এরপরও যদি কেউ নেশা বা পেশার কারণে ভিক্ষাবৃত্তি করেন তাহলে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ২৬৮ ধারায় গণ উপদ্রপ সৃষ্টির অপরাধে অপরাধী হবেন। এ অপরাধের জন্য ছয় মাস পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদন্ড বা এক হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন।
উল্লেখ্য, উপজেলাকে ভিক্ষুক মুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসন, স্থানীয় সংসদ সদস্য. ও জন প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে চলতি বছরের মার্চ মাসে ভিক্ষুক পূর্ণবাসন নামে একটি কমিটি গঠিত হয়। ওই কমিটির উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ, ভিক্ষুক চিহ্নত করণ ও সরকারী বিভিন্ন কর্মসূচীতে তাদেরকে সম্পৃক্ত করর পর উপজেলাকে ভিক্ষুক মুক্ত ঘোষণা করা হলো।