• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪১ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

আজিজ ভাই এর স্মরণে

Hafizঅধ্যক্ষ হাফিজুর রহমান হাফিজ: ২০০৬ সালের কথা। রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদের সভা চলছে। পাবলিক লাইব্রেরীতে। সভার এক কোনায় হালকা পাতলা গড়ণের একজন ভদ্রলোক গুটিশুটি মেরে বসে আছেন। চুপচাপ। মন দিয়ে শুনছেন সবার কথা। অনেকটা শেক্সপিয়ারের কৌশলী কথা, “Give ear to everybody but few thy voice” অনুসরণ করে। চোখাচোখি হতেই ইশারা করলেন কাছে যেতে। আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভদ্রলোকের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে বসতেই বললেন, আপনি নীলফামারীর হাফিজ ভাই না? আরে বসেন। আপনার কথা সুফি স্যারের (রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) কাছে অনেক শুনেছি। আপনি এসেছেন, ভালো করেছেন। আপনার মতো লোক রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদে খুব দরকার, বুঝলেন?
আমি কিছুটা লজ্জাই পেলাম তাঁর কথার সরাসরি জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাস করলাম, নাম কি ভাই আপনার?
ও, আমার নাম? আমার নাম মোঃ আব্দুল আজিজ। টিএন্ডটি তে ছোটমটো চাকুরী করি, এরই আর কি? বলেই আমার হাতখানা কোলে টেনে নিলেন পরম যত্নে।
তাই? আমার ছোট ভাই এর নামও কিন্তু আব্দুল আজিক, আমি হেসে বললাম।
আরে, দেখেন দেখি, আমি আবার আপনার বড় হলাম কখন? তার কথায় রসিকতার মাদকতা।
আজিজ মানে প্রিয় আর প্রিয় মানে সবার ছোট, বলেই আর একচোট হাসলেন। আমিও হাসলাম। সে হাসিতে খুশির ঝলক টলমল করে। অন্তরঙ্গতার ছাপ চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ে।
সেই থেকে আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার কাছাকাছি আসা, কাছাকাছি বসবাস। অবশ্য বসবাসটা কিন্তু আক্ষরিক অর্থে নয়, মনের দিক থেকে। কেননা, আজিজ ভাই থাকেন রংপুরে, টিএন্ডটি অফিসের বাসায় আর আমি থাকি সৈয়দপুরে। প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ কিলো দূরত্বে। তারপরেও বলবো মনের দিক থেকে আমরা সেই থেকে বেশ কাছাকাছি থেকেছি। এমন কোন সপ্তাহ কিংবা মাস নেই যে, আজিজ ভাই আমাকে ফোনে কথা বলেননি কিংবা আমিও বলিনি। লেখালেখি থেকে শুরু করে কেমন আছি, কি খাচ্ছি, মায় হাড়ির খবর চালাচালি হয় আমাদের মধ্যে। এই কিছু দিন আগেও জিজ্ঞাসা করলেন, হাফিজ ভাই, শুটকি, শিদল খান?
খাই তো। কেন? খাবেন নাকি?
না মানে, রংপুরে শুটটিক-শিদল পাই না তো, তাই। আপনার ওই শুটকির আড়ৎ তো প্রচুর শুটকি বাজারজাত করে।
আমি বলি, চলে আসেন। এবার নীলফামারীর মসলা দেয়া শিদল খাওয়াবো আপনাকে। আমি হাসতে হাসতে বলি।
সে সময় আর কই? কাজের যে চাপ? ও হ্যাঁ, হাফিজ ভাই, কুন্দুপুকুরের মসজিদটা কোন শতাব্দীর যেন?
আমি আকাশ থেকে পড়ি। কুন্দুপুকুরের মসজিদ এর নাম শুনেছি। কিন্তু সেটা কোন শতাব্দির, কেমন করে বলবো? আমি বিনয়ের সঙ্গে বলি, আজিজ ভাই জানিনে তো?
তা আর জানবেন কেন? বাড়ীর পাশে (মানে আমার নিজের উপজেলায়) অত পুরোনো মসজিদ আর আপনি জানেন না এটা কোন শতাব্দির? তাঁর কথায় শ্লেষের অভিক্ষেপ। আমি আর কথা বাড়াই না। মসজিদের তথ্য সংগ্রহে নেমে পড়ি।
আসলে আজিজ ভাই এর চোখ মাছির মত। উনি দেখেন দশ চোখ দিয়ে। বৃহত্তর রংপুর কিংবা দিনাজপুর জেলার কোথায় কি আছে তা ওনার ঠোটস্থ, কন্ঠস্থ। তাঁর নবাবগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কিংবা ঘোড়ঘাটের ইতিহাস নাম গ্রন্থটির কথাই ধরুন না কেন? ভৌগলিক বিবরণ থেকে শুরু করে নদ-নদী, গাছপালা, শিল্প-সাহিত্য, ধর্ম, ঐতিহাসিক স্থান, মেলা, হাট-বাজার, লোকগীতি, ইউনিয়নের হালনাগাদ তথ্য বিবরণী কি নাই সেখানে? অত্যন্ত আগ্রহ সহকারে তিনি উপজেলার প্রতিটি অঞ্চল ঘুরে আদি অন্ত তুলে ধরেছেন সেই গ্রন্থটিতে। এমন অনুসন্ধানী চোখ ক’জনের আছে? আর অমন সুপাঠ্য বই বা ক’জনই লিখতে পারে?
অত্যন্ত নম্র, ভদ্র স্বভাবের মানুষ ছিলেন আজিজ ভাই। পারবো না, করবো না এমন ধরণের শব্দ তাঁর অভিধানে ছিল না কখনও। সংগঠনের কাজ ছিল তাঁর কাছে একমাত্র ধ্যান, জ্ঞান। শুধু কি তাই? রঙ্গপুরের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব কিংবা মুক্তিযুদ্ধে রঙ্গপুর গ্রন্থ নিয়ে দিনের পর দিন সংকলন, সম্পাদনা, প্র“ফ সংশোধনের মত কঠিন কাজ করে গেছেন নিরলসভাবে। তাঁর শ্রম ছাড়া কি অত সহজে আমরা বই দুটো প্রকাশ করতে পরতাম?
ভীষণ প্রচার বিমুখ ছিলেন আজিজ ভাই। কেউ তার প্রশংসা করলে সোজা সাফটা বলে দিতেন, আমি এসবের কি আর উপযুক্ত, বলেন? কি বিনয়! আর কি উদারতা কথা প্রকাশ পেত তাঁর চোখে মুখে। আর একটা দিকের কথা বলবো। অসম্ভব জ্ঞান পিপাসু ব্যক্তি ছিলেন আজিজ ভাই। তাঁর হাতে সবসময় বই দেখেছি। অনেক সময় আমাকে আক্ষেপ করে বলতেন, কাজের চাপে ঠিকমত পড়তে পারিনে। এটাই দুঃখ, হাফিজ ভাই। আমি সমবেদনার সুরে বলি, কি যে বলেন, আজিজ ভাই, আপনার অর্ধেকও যদি আমি পড়তে পারতাম?
তাঁর ঠোটে হাসির ঝলক খেলা করে। মৃদু টোকা মেরে বলেন, আরে চাপাবাজি বাদ দেন। আপনি হলেন গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র। তাও আবার ইংরেজীর। আপনার সঙ্গে আমার কি তুলনা চলে, বলেন? আমি তর্ক করি না। তাঁর কোমল হাত খানা নিয়ে নাড়াচাড়া করি। আস্তে আস্তে বলি, চা খাবেন? আজিজ ভাই হাসেন, কথা বলেন না।
এই হলেন আমাদের আজিজ ভাই। মাত্র ৫৫ বছর বয়সে চলে গেলেন তিনি। ভাবতে পারিনে। বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় সুসাহিত্যিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি যখন মধ্য আকাশের গনগনে সূর্যের মতই উজ্জ্বল, দ্বেদীপ্যমান ঠিক তখনই তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ঝড়ের বেগে। নিয়তি আর কাকে বলে?
আমরা যারা কাজ নয় শুধু কথায় বিশ্বাসী তাদের জন্য আজিজ ভাই এক মহান আদর্শ। তাঁর কাছে কথা নয়, কাজই ছিল বড়। তাই বলতে দ্বিধা নেই যে, রঙ্গপুর গবেষণা পরিষদে আজিজ ভাইয়ের মত দক্ষ, সংবেদনশীল, নিবেদিত প্রাণ মানুষের অভাব সহজে পূরণ হবার নয়। আমরা তাঁর অভাব অনুভব করব আমাদের প্রতিটি কাজে-কর্মে, চিন্তা-চেতনায়, প্রতিটি মূহুর্তে।
পরিশেষে, আজিজ ভাই এর আত্মা শান্তি পাক। তাঁর পরকালীন অনন্ত জীবন কল্যাণময় ও মঙ্গলময় হোক এ কামনা করছি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ