সিসি ডেস্ক: ২৪ বছরের অপেক্ষার অবসান। সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা ফাইনালে। আর্জেন্টিনার ঘোর সমর্থক গোপাল চন্দ্র শীল খুশি ও আনন্দে আত্মহারা। আর্জেন্টিনা জিতবে। সেই বিশ্বাস ছিল। ভেবে রেখেছিলেন এ জয় উদযাপন করবেন তিনি। এমন কিছু করবেন, যাতে সবাই তাকে মনে রাখে। স্মরণীয় কিছু। যাতে মানুষের কল্যাণ হয়। ছোট সেলুন চালিয়ে গোপাল সংসার চালান। আর্থিক সামর্থ না থাকলেও এক ব্যতিক্রম উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। নিজ এলাকায় তিন দিন ধরে বিনা পয়সায় প্রায় তিনশ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চুল কেটেছেন
। এখনও কাটছেন। টাকা ছাড়া চুল কাটছেন প্রাপ্ত বয়ষ্কদেরও। তবে শিশুদের ভিড় থাকায় বড়রা সুযোগ পাচ্ছেন কম। গোপাল ঘোষণা দিয়েছেন ১৩ই জুলাই রবিবার রাতে জার্মানি বনাম আর্জেন্টিনার ফাইনালে তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা যদি চ্যাম্পিয়ন হয় তাহলে অন্তত আরও কয়েকদিন তার সেলুনে শিশুদের চুল কাটা হবে ফ্রি। আর্জেন্টিনার একজন একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে তার এই কর্মকা- আলোড়ন তুলেছে পুরো এলাকায়। সাধারণ মানুষ গোপালের এ উদ্যোগকে নিছক পাগলামি না ভেবে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। বাহবা দিচ্ছেন আর্জেন্টিনার এমন সমর্থক পেয়ে। ঘটনাটি রাজধানীর পশ্চিম আগারগাঁও এলাকার মমতাজ মসজিদসংলগ্ন এলাকায়। গতকাল সরজমিন এই এলাকার গোপাল হেয়ার কাটিং সেলুনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শিশুদের ভিড়। আন্না, সানজিদা, জিয়ান, শুভ, বাবু ও আরও কয়েকজন ছোট্ট শিশু চুল কাটার জন্য গোপালের দোকানে সকাল থেকে অপেক্ষা করছে। কারও গায়ে আর্জেন্টিনার আকাশি সাদা জার্সি। কারও গায়ে ব্রাজিলের হলুদ সবুজ পোশাক। শিশুদের কেউ কেউ চাইছে মেসি কাটিং, কেউবা নেইমার কাটিং, আবার কেউবা ক্লোসা ও রোবেন কাটিং। গোপালও চুল কাটার সময় চেষ্টা করছেন সেই অনুযায়ী ছাট দিতে। না হলেও ক্ষতি নেই। শিশুদের সবাই চুল কেটে পিতামাতার হাত ধরে মনের আনন্দে বাসায় ফিরছে। চুল কাটা হয়ে গেলেই পাশেই একজন সিরিয়াল লিখে যাচ্ছেন। শিশুদের হাতে কালি দিয়ে একটি চিহ্ন একে দিচ্ছেন। প্রতিটি শিশুর হাতে একটি করে চকলেট গুঁজে দিচ্ছেন। ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া থানার আনলবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা গোপাল চন্দ্র শীল (৩৮)। স্ত্রী অনিতা রানী শীল, দুই কন্যা সোনালি ও রূপালি এ নিয়ে তার সংসার। ভাগ্যন্বেষণে ঢাকায় এসেছিলেন ১৯৮৯ সালে। ১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার খেলা দেখে ভক্ত হয়েছিলেন তিনি। সেই থেকে শুরু। গোপাল জানান, ১৯৯০ সালের ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানি আজেন্টিনাকে হারিয়েছিল। সেদিন কেঁদেছিলাম। এরপর ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬ ও ২০১০ ফুটবল বিশ্বকাপ। প্রতিটিতেই আর্জেন্টিনাকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা। অপেক্ষার প্রহর যেন আর ফুরোয় না। কেটে গেছে দুই যুগ। পেরিয়ে গেছে পাঁচ পাঁচটি বিশ্বকাপ। কিন্তু আর্জেন্টিনার কাছে সেমিফাইনাল, ফাইনাল যেন অধরা। এবার অপেক্ষার পালা শেষ হয়েছে। আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠেছে। সেই খুশিতে আত্মহারা গোপাল নিয়েছেন ব্যতিক্রম এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, দীর্ঘ দিন পর আর্জেন্টিনা ফাইনালে ওঠেছে। ৯ই জুলাই খেলার দিন মনে মনে ভেবেছিলাম যদি আমার প্রিয় দল জেতে তাহলে একটা কিছু করবো। কিন্তু কি করবো তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। খেলায় আর্জেন্টিনা জিতল। আমার তেমন আর্থিক সামর্থ্য নেই। ক্ষৌর কাজই ভরসা। সামান্য আয়ে সংসার চলে। ভাল কিছু করতে গেলে প্রচুর অর্থের দরকার। শেষে এলাকাবাসী কয়েকজনের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলাম আমি যেহেতু ক্ষৌরকার তাই এই কাজ দিয়েই স্মরণীয় কিছু করা যাবে। সেই চিন্তা থেকে খেলা শেষে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চুল কাটা শুরু করলাম। এখনও চালিয়ে যাচ্ছি। গোপাল বলেন, গত দু’দিনে কয়েকশ শিশু ও সাধারণ মানুষের চুল বিনা পয়সায় কেটেছি। এতে আমার কোন ক্লান্তি নেই। ক্ষতিও নেই। হঠাৎ করেই এমন কিছু মাথায় আসলো কেন? এমন প্রশ্নে মুখে লাজুক হাসি নিয়ে গোপাল বলেন, লেখাপড়া করতে পারিনি অর্থের অভাবে। সবাই বলে শিক্ষিত মানুষ না হলে সমাজের জন্য কিছু করা যায়না। আমি লেখা পড়া জানিনা। কিভাবে মানুষের জন্য কাজ করবো। তাছাড়া উপলক্ষও পাচ্ছিলাম না। আর্জেন্টিনার জয় আমাকে সেই উপলক্ষ এনে দিয়েছে। এলাকার শিশুরা আমাকে খুব পছন্দ করে। সবাই গোপাল মামা বলে ডাকে। এজন্য আমার কাছে তারা আসে। এলাকাবাসী কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গোপাল চন্দ্র শীল আগারগাঁও এলাকায় খুবই জনপ্রিয়। প্রায় ২১ বছর ধরে পশ্চিম আগারগাঁও মমতাজ মসজিদের পাশে কাজ করছেন। শিশু থেকে বুড়ো সবাই তাকে পছন্দ করে। শিশুদের চুল কাটা কঠিন কাজ। সবাই তা পারে না। গোপাল এ কাজে বেশ দক্ষ। এজন্য বেশিরভাগ শিশুরা তার কাছে চুল কাটাতে আসে। শিশুদের অভিভাবকের কাছেও তার সমান জনপ্রিয়তা। ১০৫/খ পশ্চিম আগাওগাঁওয়ের বাসিন্দা ও একটি ডেভেলপার কোম্পানির ব্যবস্থাপক পুলক মুগ্দ নবী বলেন, শুধুমাত্র আর্জেন্টিনার জয়েই এ উদ্যোগ নয়। গোপালদা সবসময় মানুষের জন্য কিছু করতে ভালবাসে। তিনি বলেন, চুল কাটতে অন্তত ৫০ টাকা খরচ হয়। সেই হিসেবে গোপালদার এই উদ্যোগে এলাকার সুবিধা বঞ্চিত ও দরিদ্র শিশুদের জন্য কিছুটা হলেও কাজে লাগবে। একই এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান তোতা ও আবদুল গফ্ফার বাবু বলেন, প্রথম প্রথম গোপালের এ উদ্যোগকে আমার নিছক পাগালামি ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারি কোন একটা মহৎ উদ্দেশ্য এর মধ্যে আছে। তাই তার কর্মকা-ে আমরাও আনন্দ পাচ্ছি। পশ্চিম আগারগাঁওয়ের বাসিন্দা গৃহিণী জান্নাত বেগম বলেন, আমার ছেলে গতকাল সারাদিন অপেক্ষায় ছিল গোপালের হাতে চুল কাটবে বলে। কিন্তু সিরিয়াল মিলছিলনা। আজকে তার চুল কাটা হয়েছে। তার এই উদ্যোগে আমরা খুশি। গোপালের দোকানের পাশেই নাসির টি ষ্টোরের নাসিরউদ্দিন বলেন, গোপালদা কথা দিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা ফাইনালে গেলে তিনি স্মরণীয় কিছু করবেন। গত দু’দিন ধরে গোপালদার সেলুনে শিশুদের ভিড় লেগেই আছে। এ যেন চুল কাটার উৎসব। দেখতে ভাল লাগছে।