• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৭ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

মনোযোগী হয়ে উঠেছে বিশ্বের সচেতন মানুষ: ফিরে আসছে পাটের সুদিন

sadullapur-11সিসিনিউজ: পাটের যত সম্ভাবনা সবকিছু নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্লাস্টিক ও সিনথেটিক পণ্যের পরিবেশ বিধ্বংসী আগ্রাসন ঠেকাতে পাটের প্রতি মনোযোগী হয়ে উঠেছে বিশ্বের সচেতন মানুষ। ফলে দেশের এক সময়ের প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের বিশ্বব্যাপী সুদিন ফিরে আসছে। পাটপণ্যের জাগরণ শুরু হয়েছে নতুন করে। মানুষ যত সচেতন হচ্ছে ততই ব্যবহার বাড়ছে পাটের। বাংলাদেশেও সেই হাওয়া লেগেছে। একসময় বাংলাদেশের পাটের বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল ভারত, চীন ও পাকিস্তান। বর্তমানে সেই বাজার বিস্তৃত হয়েছে আরও ২২টি দেশে। থাইল্যান্ড, সুদান, সিরিয়া, ভিয়েতনাম, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, নিউজিল্যান্ডসহ পশ্চিমের অনেক দেশেই এখন বাংলাদেশ থেকে পাটপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। নতুন নতুন বাজারের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এক সময়ের বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশি পাট আগের গৌরবের জায়গায় ফিরে আসছে ধীরে ধীরে।সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়লেই দেশের পাটকলগুলো সারা বছর কর্মচঞ্চল থাকতে পারে। পাটের বাজারমূল্য বেড়ে যেতে পারে এবং পাটচাষিরাও পেতে পারেন ন্যায্যমূল্য। এ জন্য সরকার ‘ম্যান্ডেটরি প্যাকেজিং অ্যাক্ট ২০১০’ করেছে। এটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে দেশের অভ্যন্তরেই পাটপণ্যের চাহিদা অনেক বাড়ানো যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই আইনের আওতায় খুব শীঘ্রই অবৈধ পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যাগের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে জানিয়ে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হুমায়ুন খালেদ (অব.) বলেন, বিশ্বব্যাপী পরিবেশ সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশি পাটের ভবিষ্যৎ অনেক উজ্জ্বল। এমনকি সরকারের নতুন আইনটি বাস্তবায়ন হলে দেশের ভিতরেই পাটপণ্যের অনেক চাহিদা বাড়বে। তখন বাড়তি চাহিদার জোগান দিতে আমাদের নতুন করে জনবল নিয়োগ দিতে হবে।পাট এবং পাটপণ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রতি মতিঝিলের বিজেএমসি ভবনে কথা হয় বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হুমায়ুন খালেদ (অব.)-এর সঙ্গে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যাওয়া মেজর জেনারেল হুমায়ুন খালেদের (অব.) আগে প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) কমান্ডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে লাইবেরিয়া ও সিয়েরালিওনে কন্টিনজেন্ট কমান্ডার হিসেবেও কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সালে সরকার তাকে দুই বছরের জন্য বিজেএমসি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। সম্প্রতি সে মেয়াদ শেষ হওয়ায় সরকার আবারও তার নেতৃত্বের ওপর আস্থা রেখেই তাকে বিজেএমসির চেয়ারম্যান হিসেবে পুনঃনিয়োগ দিয়েছে। তিনি বলেন, বিজেএমসি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান। প্রায় চার হাজার কর্মকর্তা, সাত হাজার স্টাফ এবং ৭৮ হাজার শ্রমিকের এই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের সর্বনিু বেতন ৭ হাজার ৪২৫ টাকা। সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩০৭ টাকা। ২০১২ সালে শ্রমিকদের ৭০ শতাংশ মজুরি বাড়ানো হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে আমাদের শ্রমিকদের ১৪ কোটি টাকা বেতন দিতে হয়। এর আগে দিতে হতো সপ্তাহে ৭ কোটি। আমরা বেসরকারি মিলগুলোর চেয়ে অনেক বেশি বেতন দিয়ে থাকি। তিনি বলেন, ২৭টি মিলের মধ্যে ১৮টি স্কুল ও চারটি মাদ্রাসা পরিচালনা করছে বিজেএমসি। ১৮টি দাতব্য চিকিৎসালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্রীড়াঙ্গনে সংস্থাটির বড় ভূমিকা রাখার কথা উল্লেখ করে বিজেএমসি চেয়ারম্যান বলেন, জাতীয় পর্যায়ে এই সংস্থার ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। কারণ, আমরা প্রত্যক্ষভাবে প্রায় লাখো মানুষের কর্মসংস্থান করেছি, যাদের ওপর প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ নির্ভরশীল।পাট ব্যবহারের ক্ষেত্র বাড়ছে : উল্লেখ্য, পাট পণ্যের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান প্রোডাক্ট পাটের বস্তা, অনেক দেশে ধান সংরক্ষণের জন্য প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এশিয়ান ক্লথ- যেগুলো কনস্ট্রাকশন কাজে নিরাপত্তা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ইরান, ইরাক, নিউজিল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ ইউরোপিয়ান বিভিন্ন দেশে এগুলোর চাহিদা রয়েছে। এ ছাড়া সিবিসি (কার্পেট বেকিং ক্লথ), কার্পেটের পেছনে পাটের আস্তরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কার্পেটের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে এর ব্যবহারও বাড়ছে। এদিকে আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ‘সয়েল-সেভার’ মাটির ক্ষয় রোধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটা নতুন সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। রাস্তার মাটি ক্ষয় রোধের কাজে এটি ব্যবহার করছে তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যবহার করছে নদীভাঙন রোধে। এ ছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠান সয়েল সেভার ব্যবহার করছে। হাতিরঝিল প্রকল্পে রাস্তা করার সময় রাস্তার পাড়ে সয়েল সেভার ব্যবহার করা হয়েছে। সম্পূর্ণ দেশে উদ্ভাবিত এই পণ্যটি বিদেশেও সমাদৃত হচ্ছে। কার্পেট, জুটম্যাট, মসজিদের মাদুর, জায়নামাজসহ সুন্দর সুন্দর পণ্য তৈরি হয় বাংলাদেশের উৎপাদিত পাট থেকে। দর্শনীয় ও গুণগত মানের কারণে আজ বিশ্ব বাজারে এ দেশের পাটপণ্যের কদর বেড়েছে। সব মিলিয়ে পাট এখন আর বস্তা, চট, দড়ি, কার্পেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।বিজেএমসি চেয়ারম্যান জানান, পাট পণ্যের ব্যবহার বাড়ার কারণে দেশের সরকারি পাটকলগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। গত কয়েক বছরে আওয়ামী লীগ সরকার ছয়টি বন্ধ পাটকল চালু করেছে। এতে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। জানা গেছে, অনেক দেশ প্লাস্টিক-সিনথেটিক পণ্য ব্যবহার কমিয়ে পাট পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশের পাটপণ্য বিভিন্নভাবে রপ্তানি হচ্ছে। শপিং ব্যাগ ছাড়া শোকেজ আইটেম হিসেবে পাটের সামগ্রী বিদেশে সমাদৃত হচ্ছে।গবেষণায় আসছে চমক : সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, পাটের জীবন নকশা উšে§াচনের ফলে বাংলাদেশ পাটের ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে লোনা পানিতেও ব্যাপকভাবে পাট উৎপাদন করা যাবে। এ ছাড়া পাটের আরও মিহি তন্তু উদ্ভাবনের মাধ্যমে সুতা তৈরির উদ্যোগও একসময় সফল হবে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, পাট থেকে স্বাধীনতা পূর্বকালে ৯৮ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। পরে সিনথেটিক পণ্যের বিস্তারের কারণে পাটের ব্যবহার কমে যায়। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রেরণার অনুষঙ্গ ছয় দফা দাবির ব্যাখ্যাতেও ছিল পাটের প্রসঙ্গ। এতে পাটের রপ্তানি মূল্য বর্তমান বাংলাদেশের এখতিয়ারে থাকার কথা উল্লেখ ছিল।বিজেএমসি চেয়ারম্যান হুমায়ুন খালেদ বলেন, আমাদের খাদ্য গুদামগুলোতে ধান, চাল সংরক্ষণের জন্য পাটের ব্যাগ/বস্তা ব্যবহার অনেক বেড়েছে। খাদ্য বিভাগ গত বছর আমাদের কাছ থেকে ৪০ লাখ বস্তা কিনেছে। এবার কিনেছে সোয়া তিন কোটি বস্তা। আমরা চেষ্টা করছি, বেসরকারি চাতালগুলোতে পাটের বস্তা ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে। এটা করা গেলেও ৫০ কোটি পিস বস্তার জোগান দিতে হবে প্রতি বছর। তিনি বলেন, বিশ্বে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়লে আমাদের মিলগুলোতে আরও নতুন জনবল নিয়োগ করা যাবে। বর্তমানে আমরা আমাদের মিলগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার ৮০ ভাগ ব্যবহার করছি। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ১০ শতাংশ বাড়লে আমাদের পক্ষে আর রপ্তানি করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, আমরা আমাদের উৎপাদনের মাত্র ১০ ভাগ দেশে ব্যবহার করছি। ১৬ কোটি মানুষের দেশে পাট পণ্যের চাহিদা বাড়লে আমাদের দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করা কঠিন হয়ে পড়বে। স্কুল পর্যায়ে পরিবেশ সচেতনতার বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হুমায়ুন খালেদ (অব.) বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। তাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে গণমাধ্যমকেও ভূমিকা রাখতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পাটের সঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে জড়িত। বর্তমানে ২৭টি মিলে প্রায় ৯০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। তিনি বলেন, দেশের বাজারে চাহিদা বাড়লে আমরা আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করতে গিয়ে দরকষাকষি করতে পারতাম। তখন রপ্তানি মূল্যও বেশি পাওয়া যেত। এ জন্য বাধ্যতামূলক প্যাকেজিং অ্যাক্ট বাস্তবায়ন করা খুব জরুরি। ভারতের পাট কমিশনার সুব্রত গুপ্ত সম্প্রতি বলেছেন, বিশ্বব্যাপী কাঁচা পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের শপিং ব্যাগ রপ্তানি দ্বিগুণ করতে হবে। আধুনিকায়ন ও বহুমুখিতার অভাবে পাট শিল্পের অগ্রগতি থেমে আছে। তিনি বলেন, এই শিল্পের আধুনিকায়ন ও টিকে থাকার জন্য আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সুব্রত গুপ্ত বলেন, বিশ্বের পাটের প্রায় ৯৫ শতাংশই উৎপাদিত হয় ভারত ও বাংলাদেশে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত তাদের পাটের ব্যাগ উৎপাদন দ্বিগুণ করা উচিত যাতে তা বিশ্বব্যাপী রপ্তানি হতে পারে। তিনি জুট জিও-টেক্সটাইলের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বলেন, জুট জিও-টেক্সটাইল সিনথেটিকের জায়গা দখল করে নেবে। কারণ এটা প্রকৃতি বান্ধব। ভারতের বস্ত্র মন্ত্রণালয় সারা দেশে জুট জিও-টেক্সটাইল ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক নির্মাণ, নদী ভাঙন রোধ, ঢাল ব্যবস্থাপনা এমনকি রেলওয়ে ট্র্যাক তৈরির ক্ষেত্রেও এর ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। বিজেএমসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হুমায়ুন খালেদ (অব.) বলেন, পাট নিয়ে এখন আমরা অনেকভাবে কাজ করছি। পাটপণ্যের সুদিন ফিরে আসছে। পৃথিবীর অনেক দেশে সিনথেটিক পণ্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তারা এখন ঝুঁকছে পাটের প্রতি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানের পাট হয়। ভারত আমাদের চেয়ে ৪-৫ গুণ বেশি পাট উৎপাদন করলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে তারা রপ্তানি করতে পারে না। সুতরাং বিশ্ববাজারের আগামীর চাহিদা আমাদেরকেই পূরণ করতে হবে। উৎসঃ   bd-protidin


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ