সিসি ডেস্ক: হচ্ছে হবে করে দীর্ঘ দিনেও ঘোষণা করা হয়নি ছাত্রদলের নতুন কমিটি। ফলে বিএনপির ভ্যানগার্ড খ্যাত ছাত্রদলের ভেতর সঙ্কট ও গ্রুপিং আরো বেড়েই চলেছে। নতুন কমিটি না হওয়ায় পদ প্রত্যাশীদের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। এত কিছুর পরও সহসাই খুলছে না ছাত্রদলের ভাগ্য। নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ছাত্রদলের নতুন কমিটি এখন বয়সের ফ্রেমে বাঁধা। কত বয়স পর্যন্ত ছাত্রদল করতে পারবে সে নিয়েই চলছে ব্যাপক জল্পনাকল্পনা। নতুন কমিটির শীর্ষ নেতাদের বয়স কত হবে তা নিয়েই আলোচনা তুঙ্গে। বর্তমান কমিটির মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বরে শেষ হচ্ছে। এ কমিটি দায়িত্ব নেয়ার প্রায় দুই বছরে মাত্র ৮টি শাখার কমিটি গঠন করতে পেরেছে বলে সংগঠন সূত্র জানিয়েছে।
সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারপারসন ছাত্রদলকে ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়েছেন। বিএনপির হাইকমান্ড ছাত্রদলকে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছেন। কিন্তু শিগগিরই হচ্ছে না সংগঠনটির নতুন কমিটি। ছাত্রদলের বর্তমান কমিটি পুনর্গঠন করতে আরো সময় লাগবে বলে সূত্র জানিয়েছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন পর ২০১২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণ শাখার আংশিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এর প্রায় সাত মাস পর কেন্দ্রের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু প্রকৃত ছাত্র ও ত্যাগী নেতারা কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। এরপর থেকে শুরু হয় ছাত্রদলের অন্তর্কোন্দল, যা একপর্যায়ে সংঘর্ষেও রূপ নিয়েছিল। ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সভাপতি আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল এবং সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রদলের চেইন অব কমান্ড প্রায় ভেঙে পড়েছে। কমিটি হালনাগাদ না করায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সাথে বর্তমান কমিটির দূরত্ব বেড়েছে বহুগুণ। প্রকৃত ছাত্রদের দিয়ে নিয়মিত কমিটি গঠন না করায় তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে বিরাজ করছে হতাশা। সংগঠনটির অবস্থা একেবারে নাজুক পর্যায়ে চলে গেছে। আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। কেবল হাতেগোনা কয়েকটি মিছিল কর্মসূচি পালন করেছে মাত্র। তাও আবার সকাল ৮টার মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির বেশির ভাগ নেতা বিবাহিত। অনেকের একাধিক সন্তানও আছে। এরই মধ্যে কেউ কেউ দেশের মাটি এবং রাজনীতি ছেড়েছেন। কেউ বা জড়িয়ে পড়েছেন বিভিন্ন পেশায়। সুতরাং ছাত্রদলের মধ্যে এখন যোগ্য ও ত্যাগী নেতৃত্বের অভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে।
বর্তমান কমিটির অন্তত ১৫ জনসহ সভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক দাবি করেছেন, যাতে বিবাহিত, অছাত্র এবং ‘ভূঁইফোড়’ কাউকে নতুন কমিটিতে পদায়ন না করা হয়। বর্তমান কমিটির এক-তৃতীয়াংশ সহসভাপতি ও যুগ্ম সম্পাদক বর্তমান কমিটির ওপর অনাস্থা জ্ঞাপন করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শাখার শীর্ষ নেতাদের ভূমিকায় অসন্তুষ্ট বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আন্দোলনে ঠিকমতো ভূমিকা পালন না করা এবং ছাত্র-অধিকার ইস্যুতে জোরালো ভূমিকা না রাখায় ছাত্রদল নেতাদের ভর্ৎসনাও করেছেন তিনি।
জানা গেছে, অপোকৃত কম বয়স্ক এবং ‘প্রকৃত ছাত্র’ দিয়ে নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করার নীতি গ্রহণ করেছে বিএনপি। নতুন কমিটিতে নিয়মিত ছাত্রত্ব, সততা এবং সাংগঠনিক দতা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সংগঠনের নেতৃত্বে জুনিয়র বা অল্প বয়স্কদের আনার পরিকল্পনায় অস্বস্তিতে আছেন ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির একাধিক নেতা। তারা মনে করছেন, নেতৃত্বে বয়স কমিয়ে আনলে সংগঠন আরো দুর্বল হয়ে উঠতে পারে।
খালেদা জিয়ার বৈঠকে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী সংগঠনের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেেিত ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে ভেঙেও দেয়া হয়। নতুন কমিটি গঠন না করা পর্যন্ত বর্তমান কমিটি শুধু রুটিন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রশিদ হাবিব, সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদ দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকায় কমিটি গঠনের বিষয়টি থমকে যায়।
বর্তমান কমিটির মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বরে শেষ হচ্ছে। তবে সংগঠনের এক নম্বর শাখা হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা আগে পুনর্গঠন করতে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদৌ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন সহসভাপতি এবং যুগ্ম-সম্পাদক জানিয়েছেন, সংগঠনের কেন্দ্রীয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে একসাথে কাজ করতে হয়। কেন্দ্রের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যোগাযোগের ঘাটতি থাকলে সংগঠনও দুর্বল হয়ে পড়ে। বর্তমান কমিটির ব্যর্থতার পেছনেও এ দূরত্বই প্রধান কারণ। এ অবস্থায় আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা কমিটি গঠন এবং পরে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন নিয়ে ভিন্ন মত পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কার্যক্রম বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রায় তিন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেনি সংগঠনটি। সর্বশেষ ২০০৪ সালে হল কমিটি গঠন করা হয়। এ কারণে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব নির্বাচনে সংশ্লিষ্টরা হিমশিম খাচ্ছেন। গত ছয়-সাত বছর ধরে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃত্বে চল্লিশোর্ধ্ব বয়সের নেতারা ঘুরেফিরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন। এটি হতাশ করেছে নিয়মিত ছাত্রদের। তাই নেতৃত্বের তরুণ ধারা প্রতিষ্ঠা করতে কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনে বয়স কমিয়ে আনতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্ব গঠনে ছাত্রত্বকে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। মূলত এখন বয়সের ফাঁদে আটকা পড়েছে ছাত্রদলের নয়া কমিটি গঠন প্রক্রিয়া।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের একজন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি বলেন, সংগঠনটির বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি অনেকটা সঙ্কীর্ণ মানসিকতার। এলাকার ব্যক্তি দেখে এবং টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছে। গঠনতন্ত্রের কোনো তোয়াক্কা করেনি। অছাত্র আর ব্যবসায়ীদের ছাত্রদলের কমিটিতে পদ দেয়া হয়েছে। যে কারণে সংগঠনটি অতীত ঐতিহ্য হারাচ্ছে। আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে পারছে না।
তিনি বলেন, আমরা চাই মেধাবী ও প্রকৃত ছাত্রদের হাতে ছাত্রদল চলে আসুক। কোনো লবিং বা গ্রুপিং নয়, তারুণ্যের ভিত্তিতে এবং রাজপথে যারা শ্রম ও ঘাম দিয়েছে তাদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হোক। না হলে ছাত্রদলের করুণ দশা ঘুচবে না।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী বলেন, ছাত্রদলের পুনর্গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। অপো করতে হবে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ কমিটির নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, নতুন কমিটি গঠনে নিয়মিত ছাত্রত্বের বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেতাদেরকে অবশ্যই নিয়মিত ছাত্র হতে হবে।
উৎসঃ নয়া দিগন্ত