সিসি ডেস্ক: আওয়ামী পরিবারের সন্তান, শিবির সংশ্লিষ্টতা আবার কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ দুর্নীতি। এসব তকমাওয়ালা কর্মীদের নেতৃত্বে বিএনপির ‘ভ্যানগার্ডখ্যাত’ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি হতে চলছে এমন খবরে ক্ষোভের শুরু। যা দিনে দিনে তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়ায় ফাইলবন্দী হয়ে গেছে কমিটি।
আর ঝুলে যাওয়া নতুন কমিটি কখন আলোর মুখ দেখবে তা-ও জানেন না কেউ। এ কারণে পদপ্রত্যাশী ও তাদের সমর্থকরা হতাশায় ডুবছেন। পাশাপাশি বাড়ছে গ্রুপিং-কোন্দল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে পরস্পরের প্রতি কাদা ছোঁড়াছুড়ি ও অপপ্রচার।
বেশ কিছুদিন ধরে শোনা যায় বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া ছাত্রদলের নতুন কমিটি চূড়ান্ত করেছেন। পরে কমিটি ঘোষণার দিনক্ষণ ঠিক হলেও ঘোষণা হয়নি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, কমিটি অনুমোদনের জন্য খালেদা জিয়া স্বাক্ষর করবেন এর আগে তার (খালেদা) কয়েকজন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা চূড়ান্ত তালিকায় থাকা শীর্ষপদের নেতাদের বিষয়ে নানামহলের অভিযোগের কথা তুলে ধরেন।
এছাড়া খালেদা জিয়ার সঙ্গে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন সদস্য কমিটিতে চূড়ান্ত তালিকায় থাকা নেতাদের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে টেলিফোনে কথা বলেন। একইসঙ্গে ‘বিতর্কিত’ হাওয়া ভবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ এসব নেতাদের পক্ষে লবিং করছেন এমন অভিযোগও করেন। এরপরই ঝুলে যায় ছাত্রদলের কমিটি। যা এখন কি পর্যায়ে আছে সে বিষয় কেউ কিছু বলতে পারছেন না।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যে, নতুন কমিটির সভাপতি হিসেবে বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব আহসানের কথা শোনা যায়। শরিয়তপুরের ছেলে রাজিব আওয়ামী পরিবারের সন্তান এমন অভিযোগ যায় দলের চেয়ারপারসনের কাছে। এছাড়া বিগত আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন আছে দলের বিভিন্ন স্তরে।
সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান ও সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে যুগ্ম-সম্পাদক মামনুর রশিদ মামুনের নাম। আকরামের বিরুদ্ধে কমিটি দেয়ার নামে আর্থিক লেনদেনসহ বেশ কিছু অভিযোগ করেছেন নেতাকর্মীরা। আর মামুনের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। যদিও এসব নেতারা আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
এদিকে পদবঞ্চিত হতে পারেন এই আশঙ্কায় নতুন কমিটি চূড়ান্ত হওয়ার পর কয়েক দফা বিক্ষোভ করেন ছাত্রদলের বেশ কিছু নেতা। বর্তমান কমিটির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরের নেতারা এই বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন। সবশেষ কিছুদিন আগে গুলশানের বাসা থেকে নিজ কার্যালয়ে আসার পথে বিক্ষোভের মুখে পড়েন খালেদা জিয়া। পরে তিনি গাড়ি থামিয়ে বিক্ষুব্ধ নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় কমিটি ঘোষণার আগেই ক্ষোভ প্রকাশের জন্য তিনি নেতাদের ধমকও দেন। এরপর থেকেই অনেকটা ফাইলবন্দী ছাত্রদলের কমিটি।
বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দলের চেয়ারপারসনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক, সম্ভাব্য নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় ব্যক্তিগত বৈঠক, সাক্ষাৎকার নেয়ার পর সবার ধারণা ছিল ছাত্রদলে যোগ্য নেতৃত্ব আসবে। কিন্তু আবারো আগের মতো লবিংয়ের জোরে পকেট কমিটি এবং খালেদা জিয়াকে ভুল বুঝিয়ে কমিটি দেয়া হচ্ছে এমন সংবাদে এই বিক্ষোভ।
বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের মাধ্যমে কমিটি না হলে বিক্ষোভকারীদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও আছে।
নেতাকর্মীরা জানান, খালেদা জিয়ার নির্দেশনা মেনে কমিটি গঠিত হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। তারা জানান, দফায় দফায় মতবিনিময় সভায় ছাত্রনেতাদের বক্তব্য, প্রস্তাবনা, পরামর্শ শুনলেও চেয়ারপারসন কমিটির বিষয় কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। দাদা-চাচা মার্কা কোনো কমিটি দিতে চান না এমন বক্তব্যে সবার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলেও দায়িত্বপ্রাপ্তরা কমিটি পুনর্গঠনে জড়িয়ে পড়েন অনৈক্যে। প্রথমে নানা যুক্তি দেখানো হয় বয়স্ক ছাত্রনেতাদের পক্ষে। সম্ভাব্য তরুণ নেতাদের বিরুদ্ধে চালানো হয় অপপ্রচার। দেশে-বিদেশে চলছে লবিং-তদবির। কিন্তু সংগঠনের ভেতরে-বাইরে নানামুখী চাপের কারণে পরে তরুণদের পক্ষে অবস্থান নেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।
এদিকে কমিটি ঝুলে যাওয়ায় হতাশায় পড়ছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি, যোগ্যদের দিয়ে যতদ্রুত সম্ভব কমিটি দেয়া হোক। অন্যথায় বিতর্ক বেশি হবে। নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রুপিং বাড়বে, দ্বন্দ্বও বাড়বে। এতে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ছাত্রদলের শীর্ষ পদে আসতে চান এমন এক নেতার সঙ্গে কমিটি নিয়ে নতুন বার্তা ডটকমের এই প্রতিনিধির কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, “কমিটি দিলে তাড়াতাড়ি দেয়া উচিত। যদি পদ না পাই মনে করব ভাগ্যে নেই। কমিটি দেব দেব বলে বিলম্ব করা হয়রানির শামিল।”
ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি নূরুল ইসলাম নয়ন নতুন বার্তা ডটকমকে নতুন কমিটির বিষয়ে নিজের প্রত্যশা তুলে ধরে বলেন, “আন্দোলনের ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে এমন নেতাদের দিয়ে কমিটি হবে এমনটা আশা করি। সেক্ষেত্রে বিগত সময়ে দলের জন্য ভূমিকা মূল্যায়ন করলে তা অবশ্যই কাজে দিবে।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের কারণে কমিটি নিয়ে নতুন করে ভাবছেন বিএনপি প্রধান। কমিটিতে তরুণ নেতৃত্ব আনার চিন্তা করলেও এখন সিনিয়র-জুনিয়র সমন্বয় করার চিন্তা চলছে।
ছাত্রদলের কমিটি গঠনের কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন নেতা চীন সফরে যাওয়ায় নতুন চিন্তায় মন দিতে পারেননি খালেদা জিয়া। শুক্রবার বিএনপির প্রতিনিধি দল ঢাকায় ফিরছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিটি ঘোষণায় কিছুটা সময় নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব, স্থায়ী কমিটি ও সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আলাপ করেই চূড়ান্ত করা হতে পারে কমিটি। সেক্ষেত্রে ঈদুল আযহার আগে ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনা কম।
নতুন বার্তা