সিসি ডেস্ক: লতিফ সিদ্দিকীর পরিণতি সম্ভবত তসলিমা নাসরিনের মতোই হচ্ছে। আপতত তিনি ভারতেই থেকে যা্ওয়ার চিন্তা করছেন। বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, সরকার না চাইলে দেশে ফিরবেন না, ভারতেই থেকে যাবেন।
মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে যেতে চান, তবে এ ব্যাপারে দল এবং সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন।
হজ সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের পর বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর রোববার মন্ত্রিপরিষদ থেকে তাকে অপসারণ করা হয়।
লতিফ সিদ্দিকি বর্তমানে ভারতের কলকাতায় অবস্থান করছেন।
আজই বিবিসিকে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, দল এবং সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য তিনি অনুতপ্ত, কিন্তু যে বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশে তাকে নিয়ে এই বিতর্ক শুরু হয়, সেটা নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই।
লতিফ সিদ্দিকী মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘরোয়া আড্ডায় দেয়া তার বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, তিনি বাংলাদেশেই ফিরে যেতে চান, কিন্তু দেশে ফিরে গেলে দল এবং সরকারকে আরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা হবে কি না তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।
মিস্টার সিদ্দিকী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দেশে ফিরতে না পারলে তিনি আপাতত ভারতেই থাকতে চান।
এর আগে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ থেকেও বহিস্কার করা হয়েছে। রোববার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ্জ্ব নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর বাংলাদেশে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে ছাঁটাই এবং তাঁর বিচারের দাবিতে ইসলামপন্থী দলগুলো আন্দোলন শুরু করেছিল।
এ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন যে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভায় রাখা হবে না। রাষ্ট্রপতি হজ্জ্ব থেকে ফিরলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার বঙ্গভবনের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারপরই লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণ করে আদেশ জারি করা হয়।
সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো
প্রশ্ন: সরকার এবং দল থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কীভাবে নিচ্ছেন?
উত্তর: আমার প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। কারণ আমি একটা দল করি। দলের একটা নিয়ম শৃঙ্খলা আছে। সেই নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছি বলে আমার দলনেতা মনে করেছেন। সেইজন্য দলের নেতা ব্যবস্থা নিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ ফোরামে বসে। সো, এটা নিয়ে আমার তো বিরুপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা না। এই দলই আমাকে মন্ত্রী বানাইছে। এই দলের নেতাই আমাকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এখন তিনি বা তার সহকর্মী মিলে যদি আমাকে মনে করেন যে আমি সহকর্মী হওয়ার যোগ্যতা রাখি না; সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতন্ত্রে তো এটা কোনো অপরাধ না।
প্রশ্ন: তারা মনে করেছেন, কিন্তু আপনি কি সেই… তাদের যে মনে করা, আপনি তাদের সঙ্গে একমত?
উত্তর: আমি একমত, কারণ আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন: আপনার কাছে কি মনে হচ্ছে যে আপনার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে?
উত্তর: না, না। বরঞ্চ আমি অনুতপ্ত যে আমি আমার দল, আমার দলনেতাকে একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছি।
প্রশ্ন: এছাড়া অন্য কোনো অনুশোচনা হচ্ছে? পুরো অবস্থার জন্য কি কোনো অনুশোচনা হচ্ছে?
উত্তর: না আমার কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ নেই। আমার নেতাকে আমি বিব্রত করেছি। তিনি আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন, আমি তাকে খুব কষ্ট দিয়েছি।
প্রশ্ন: কিন্তু আপনি যেটা বলেছিলেন, সেটা নিয়ে কি কোনোভাবে কোনো ধরণের অনুশোচনা হচ্ছে?
উত্তর: আবার বলি, আপনারা কিন্তু আমাকে শোনাতে চেয়েছিলেন, আমি কিন্তু বলি নাই। আমার এই জায়গাটায় একটা আক্ষেপ আছে যে সারা পৃথিবীতে কি একজন সাংবাদিক বা একজন মানুষ নেই যে জিজ্ঞেস করল না উনি একটা আড্ডাতে কথা বলেছেন। কোনো সভায় নয়, কোনো সমিতিতে নয়, মাইকে নয়। তো, সেই আড্ডায় উনি পুরোটা কী কথা বললেন, সেইটা না জেনে একটা খন্ডিত অংশ, বিকৃতও হতে পারে, অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে। তো পুরোটা কেউ চাইলেন না আজ পর্যন্ত। এইটা আমার আক্ষেপ আছে। আমি পুরো কথাটার দায়িত্ব নিচ্ছি। দেড় ঘন্টা আমি কথা বলেছি। সেই দেড় ঘন্টার টেপটা আপনারা বাইর করান, সেটার পুরো দায়িত্ব আমার। এর জন্য আমার যদি ফাঁসি দেওয়া হয়, তাও আমি মেনে নেব।
প্রশ্ন: তো যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এখন আপনার পদক্ষেপ কী হবে? আপনি কী দেশে ফিরছেন?
উত্তর: আমি দেশে ফিরতে আগ্রহী। কারণ এই দেশটার স্বাধীনতার জন্য আমি কাজ করেছি। আমি এই দেশটার উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু প্রেক্ষাপটটা এমন হয়েছে, যে আমি কী করব আমি বুঝতে পারছি না। কারণ, আমি দেশে গেলে, ঢুকে গেলে, আমার নেতা যদি আরও বিব্রত হয়, সেইজন্যে আমি খুবই মানসিক সঙ্কটে আছি। আমি প্রথম সুযোগেই দেশে ঢুকে পড়ব। গিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করব।
প্রশ্ন: তার মানে আপনি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
উত্তর: বিষয়টা কিন্তু তা না। নেতা বা আমার দলের কোনো ক্ষতি হবে কি না আমি ঢুকলে। সেইটা নিয়ে আমি চিন্তিত। আমাকে নিয়ে আমি চিন্তিত নই।
প্রশ্ন: কিন্তু দেশে না ঢোকা পর্যন্ত তো সেটা আপনি বুঝতে পারছেন না।
উত্তর: না, না, বুঝতে পারার কথা না। আমাকে তো কিছুটা জানতে হবে। জানতে আমি পারব।
প্রশ্ন: আপনি দলের কাছ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় আছেন? যে দল আপনাকে বলবে, ‘না তুমি এসো না’ বা ‘তুমি থাকো’।
উত্তর: অবশ্যই, অবশ্যই, অবশ্যই।
প্রশ্ন: দলের নেতার সঙ্গে কি আপনি নিজে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন?
উত্তর: দলের নেতা মানে শেখ হাসিনার সাথে? না আমি চেষ্টা করি নাই।
প্রশ্ন: দলের কোনো পর্যায়ের সঙ্গে কি যোগাযোগের চেষ্টা করছেন যে আপনার কী করা উচিত? মানে আপনি আসবেন কি না?
উত্তর: না, না, না, না।
প্রশ্ন: তার মানে আপনি চাইছেন তারাই আপনাকে বলুক? আপনি সেটাই চাইছেন?
উত্তর: না, আমি চাইছি না। তারা কী করবেন তা তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।
প্রশ্ন: মিস্টার সিদ্দিকী, এর আগে আমরা যেটা দেখেছি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে ধরুণ দুজন লেখক, একজন মহিলা একজন পুরুষ। তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার-তারা…তাদের সম্পর্কে একই ধরণের অভিযোগ ওঠার পর তারা আর দেশেই ফিরতে পারছেন না। বছরের পর বছর। দশকের পর দশক। আপনার কি সেই ভয়টা হচ্ছে যে আপনারও সেই পরিস্থিতি হতে পারে?
উত্তর: না, না, তারা লেখনীর মাধ্যমে বলেছে। তারা এক কথা বলেছে। আর আমি তো এখনও বলছি যে আমার অবস্থান… আমার কথাগুলোকে বিকৃত করা হয়েছে, খন্ডিত করা হয়েছে। একত্রিত যোগ করলে দেখা যাবে আমি একটা অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ করেছি।
প্রশ্ন: কিন্তু মানুষ, মানুষের যে পারসেপশন। মানুষ যেটা মনে করছে যে আপনি তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন। আপনার ভিতরে কি ভয় জাগছে যে আপনারও … দেশে ফিরতে পারবেন কি না?
উত্তর: সেটা দেখা যাবে। সময়ই বলে দেবে। আমার জীবনে এরকম ঝড় বহুবার এসেছে। পচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলাম। তারপর বিতাড়িত হয়েছিলাম। কয়দিন যুদ্ধও করেছি। তারপর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার দ্বিমত হয়েছে বলে আমি সরে এসেছিলাম। এখনও কাদের সিদ্দিকী ক্ষমা চাচ্ছে। এই ব্যাটাকে কে ক্ষমা চাওয়ার আমার পক্ষ থেকে দিল? আমি তো তাকে দায়িত্ব দেই নাই যে আমার পক্ষে ক্ষমতা চাও। সে এক দল করে, আমি আরেক দল করি। সে আমার বিরুদ্ধে ২০০১-য়ে নির্বাচনে দাড়িয়ে আমাকে পরাজিত করেছিল।
প্রশ্ন: আপনার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন মিস্টার সিদ্দিকী-আপনি যদি অদূর ভবিষ্যতে দেশে ফিরতে না পারেন, আপনার দল যদি আপনাকে সে ধরণের কোনো ইঙ্গিত না দেয় যে আপনি ফিরুন, আপনি এখনও এমপি আছেন। আপনি কোথায় থাকবেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপাতত?
উত্তর: না, না।
প্রশ্ন: আপনি কি ভারতেই থাকবেন?
উত্তর: আমি ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে পারব না। আমি ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে পারব না বলেই আমি কোলকাতায় এসেছি। আমি একেবারেই মাটির সাথে থাকতে চাই। মাটির সোদা গন্ধে আমার… আমি খুব একটা সাধারণ মানুষ ভাই।
প্রশ্ন: ভারতে কি আপনি থাকতে পারবেন? কোনো ইঙ্গিত ভারত সরকারের কাছে…
উত্তর: ভারত সেটা না দিলে,… সেটা এখনই.. সে ব্যাপারে এখনই কিছু বলব না। সময় সামনে বলে দেবে। সময়ই সময়ের সিদ্ধান্ত নেবে। এখন কিছু বলব না।
হযরত মুহাম্মদ (স.) কে নিয়ে কটূক্তি করে কবি দাউদ হায়দারকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। ঘটনা ১৯৭৪ সালের। প্রথমে তিনি আশ্রয় নেন ভারতের কলকাতায়। ছিলেন সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্নেহছাঁয়ায়।পরে সেখান থেকে চলে যান জার্মানিতে। কাজ করেন ডয়চে ভেলেতে।এখনো জার্মানিতেই আছেন। তবে সেখানে বাংলাদেশীদের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সংসারও করেননি। দেশেও আসতে পারেননি। কোনো সরকারই তাকে দেশে আসার সুযোগ দেয়নি। শোনা যায় জার্মানিতে দাউদ হায়দার ভালো নেই।
কুরআন ও হাদিসের বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা মন্তব্য করে লাইমলাইটে আসেন তসলিমা নাসরিন। কিন্তু বিষয়টি যে এতো স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ তা বুঝতে পারেননি ওই সময়ের তরুণ ডাক্তার কবি। সারাদেশ তার বিরুদ্ধে উত্তাল হয়ে ওঠে। সিলেটের একজন বিখ্যাত আলেম তার মাথার দাম ঘোষণা করেন। একটার পর একটা মামলা হতে থাকে তার বিরুদ্ধে। পালিয়ে বেড়াতে থাকেন তাসলিমা।
ইউরোপের কয়েকটি দেশের সহযোগিতায় তিনি কোর্টে হাজির হয়ে জামিন নিয়ে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন। চলে যান ইউরোপে। ইউরোপ ও আমেরিকার মিডিয়া তাসলিমাকে লুফে নেয়। তাকে নিয়ে বিশাল বিশাল সংবাদ পরিবেশন করতে থাকে। নানান সভা-সেমিনারে তসলিমা পরিচিত হয়ে ওঠেন বিরাট বক্তা হিসেবে।
এদিকে ভারতের বিজেপি ও আনন্দবাজার গোষ্ঠী তসলিমাকে ব্যবহার করে তাদের সুবিধামতো। তার বিতর্কিত উপন্যাস ‘লজ্জা’ ভারতের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে সারাদেশে ছড়িয়ে দেয় বিজেপি। কলকাতার কবি-সাহিত্যিক ও মিডিয়ার সঙ্গে তসলিমার সখ্যতা গড়ে ওঠে।
‘ক’ উপন্যাসে কলকাতার খ্যাতনামা কয়েকজন সাহিত্যিকের চরিত্রহনন করেন তাসলিমা। ক্ষেপে যান তার এককালের ঘনিষ্ঠ কবি ও সাহিত্যিকরা। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরাও তার বিরুদ্ধে মাঠে নামেন। ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশের কারণে পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম ও তৃণমূলের কাছে ব্রাত্য হয়ে যান তসলিমা। কলকাতা ছেড়ে এখন থাকেন দিল্লির নির্জন এক বাসায়। মাঝে মধ্যেই আবাসিক ভিসার সংকটে পড়েন তিনি। দ্বারস্ত হতে হয় নয়া দিল্লির। প্রার্থনা করতে হয় অনুকম্পার। তসলিমার ঘনিষ্ঠ অনেকেই এখন তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন না। তার সঙ্গী এখন ‘মিনু’।মিনু তসলিমার বিড়ালের নাম।
তসলিমা যে ভালো নেই, মানসিক কষ্টে আছেন- প্রায়ই তিনি তার বিভিন্ন লেখায় তা প্রকাশ করেন। দেশের জন্য কাঁদেন, কিন্তু দেশে আসতে পারেন না। হাসিনা-খালেদা কেউ তাকে দেশে দেখতে চান না