• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৩৯ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

মন্ত্রী বললেন নাম তো বুকেই লেখা আছে!

Roniগোলাম মাওলা রনি: মিটিংয়ের মধ্যে প্রায়ই তিনি ঘুমাতেন, সেদিনও ঘুমোচ্ছিলেন। উপস্থিত কর্মকর্তারা ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করা উচিত! কারণ আলোচনা তখন শেষ পর্যায়ে। মন্ত্রী সিদ্ধান্ত দেবেন এবং মিটিংয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন। কিন্তু প্রধান কর্তাটির নিবিড় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানোর সাহস হলো না, তাই উপস্থিত সবাই বসে রইলেন বেশ খানিকটা সময়। ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা যিনি কিনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে নিয়োজিত ছিলেন তিনি একদিন মন্ত্রীর কাছে গেলেন। মন্ত্রী বললেন, তুমি কে? কর্মকর্তা চটপট করে নিজের নামটি বললেন। মন্ত্রীর উত্তর, নাম তো বুকেই লেখা আছে! তুমি আছ কোথায়? এবার কর্মকর্তাটি বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। কারণ তার কর্মের অধিক্ষেত্র, তার পদবি এবং সঙ্গত কারণে নামটি দেশের সচেতন মহল জেনে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। মনের দুঃখ মনের মধ্যে চেপে রেখে তিনি বিনয়ের সঙ্গে বললেন, স্যার আমি ওমুক। আমি কর্মরত আছি তমুক জায়গায়। আর আপনার বদান্যতায় আমি সেই পদে নিয়োগ পেয়েছি অত তারিখ থেকে। শুধু এখানেই শেষ নয়, কর্মকর্তাটি তার এক আপনজনকে কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, পরবর্তী ৬-৭ মাসে যতবার দেখা হয়েছে মন্ত্রী ততবারই নাকি তাকে চিনতে পারেননি এবং প্রত্যেকবারই একই প্রশ্ন করেছেন এবং একই জবাব পেয়েছেন।

নবম সংসদের মাধ্যমে গঠিত সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের একটি নমুনা উপরে বর্ণনা করা হলো। সহি সাহারা নামা লিখতে বসলে এমন হাজারো উপাখ্যান বর্ণনা করা যাবে যা শুনলে বা পড়লে আপনি কোনো অবস্থাতেই গোমরামুখু হয়ে থাকতে পারবেন না অর্থাৎ আপনাকে হাসতেই হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সরকার সমর্থক কর্মকর্তারা বলতে গেলে অনেকটা নিজ দায়িত্বেই নানামুখী কর্মকাণ্ড শুরু করলেন। সরকারের জন্য যেটা ভালো হবে কিংবা আইনশৃঙ্খলার জন্য যেটা শুভকর সেই ধরনের সিদ্ধান্ত কর্মকর্তারা নিজেরাই নিতে আরম্ভ করলেন। যদি কোনো ফাইলে বা সিদ্ধান্তে মন্ত্রীর অনুমোদন দরকার হতো সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আপন দায়িত্বে মন্ত্রীর দফতরে হাজির হয়ে অনুমোদন নিয়ে নিতেন। মন্ত্রী হয়তো ২-৪ দিন ঘুরাতেন কিন্তু কাউকে খালি হাতে ফেরাতেন না। এভাবে চলতে চলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনেকটা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মতোই চলতে আরম্ভ করে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কোস্টগার্ড, ফায়ার ব্রিগেড, র্যাব, নার্কোটিকস বিভাগসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বেশ ভালোই চলছিল। মন্ত্রী গুনে গুনে কথা বলতেন এবং প্রশ্ন যাই হোক না কেন তার উত্তর হতো প্রায়ই একই ধরনের। এ নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করতেন বটে কিন্তু ক্রোধান্বিত হতেন না।

সাহারা খাতুনের নেতৃত্বে চলতে গিয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগ বা অনুবিভাগকে নিজ দায়িত্বে কাজ করতে হতো। পুলিশের ক্ষেত্রে এটি ছিল আরও বেশি প্রযোজ্য। দেশের মেট্রোপলিটন শহরগুলোর কমিশনাররা একভাবে কাজ করতেন। আবার ডিআইজিরা অন্যভাবে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে খুব বেশি ভাব না থাকলেও দৃশ্যমান বিরোধ ছিল না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ফলে তারা দরকার মনে করলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে নিতেন। অন্যদিকে জুনিয়র কর্মকর্তাদের অনেকে গণভবন বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ছোটাছুটি করতেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা-সাক্ষাৎ হতো না। তবে সেখানকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং চা-বিস্কুট খাওয়ার পর তাদের মধ্যে এক ধরনের ভাব আসত। এ ভাবের সাগরে ডুব দিয়ে তারা ভবিষ্যতে আইজি হওয়ার স্বপ্ন দেখত এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে ঈর্ষার আগুন জ্বালিয়ে দিত। স্ত্রীর কাছে গল্প করে নিজের মানমর্যাদা বৃদ্ধি করে নিত এবং মনের আনন্দে কয়েক দিন একটু বেশি বেশি পোলাও-কোর্মা খেত।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সুখস্বপ্ন, ভাবসাব এবং স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলো যেদিন মন্ত্রী হিসেবে মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বসলেন। জনাব খান পেশাজীবনে অত্যন্ত সফল এবং মেধাবী আমলা ছিলেন। তার চরিত্র ও ব্যক্তিত্বে রয়েছে উপনিবেশিক ধাঁচের নেতৃত্বগুণ। আজীবন উঁচু পদে চাকরি করার কারণে সচিবালয়ের ফাইলপত্র যেমন মুখস্থ তেমনি রাজনীতির মাঠে জেল-জুলুম হুলিয়া ভোগ করার কারণে আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। এর বাইরে ব্যক্তিগত একগুঁয়েমি, জেদি মনোভাব এবং দক্ষতা-অভিজ্ঞতার গর্ব তো ছিলই। তিনি প্রথম দিন চেয়ারে বসেই বুঝে ফেললেন কী করতে হবে। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। কর্মকর্তারা সব ভয়ে তটস্থ হয়ে কাজকর্ম হিসাব করে করা শুরু করল। যেসব কর্মকর্তা একটু বেশি সিনিয়র এবং সরকার ঘেঁষা বলে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি তাদের নানামুখী চাপে রাখা শুরু করলেন। তিনি অত্যন্ত সুকৌশলে মন্ত্রণালয়, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারদের অফিসসমূহ, রেঞ্জ ডিআইজিদের অফিসসমূহ এবং র্যাব ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ পলিসিতে চালাতে লাগলেন।

জনাব মহীউদ্দীন খান আলমগীর অতি দ্রুত তার মন্ত্রণালয়ের বিভাগ-অনুবিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেললেন। এরপর তিনি পুলিশি ক্ষমতার কেন্দ্র এসপি অফিসে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণ করলেন ভিন্ন পদ্ধতি। প্রথা ভেঙে তিনি সরাসরি এসপিদের ফোন করতেন কারণে কিংবা অকারণে। ফলে সাহারা পূর্ববর্তী পুলিশ, সাহারা আমল এবং তৎপরবর্তী আমলের মধ্যে বিস্তর ফারাকে সংগঠনটির মধ্যে নানা রকম সমস্যা দেখা দেয়। এরই মধ্যে চলে আসে নির্বাচন প্রসঙ্গ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পূর্ব সহিংসতা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং সরকারি দলের লোকজনের সঙ্গে অতিরিক্ত খায়খাতিরের কারণে বেশির ভাগ পুলিশ সদস্যই তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলেন। নির্বাচনের আগে জনাব খান মন্ত্রিপরিষদ থেকে বাদ পড়ার কারণে সব কিছু ওলট-পালট হয়ে যায়।

নির্বাচন-পূর্ব সময়ে পুলিশের দুটি বৈশিষ্ট্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে। বেশির ভাগ জেলা পুলিশ হাল ছেড়ে দিয়েছিল। অন্যদিকে মেট্রোপলিটন পুলিশের কর্মকর্তাদের মধ্যে যাদের সঙ্গে সরকারের খায়খাতির খুব বেশি ছিল কেবল তারা মরণপণ শক্তি নিয়ে তাদের এলাকাসমূহ বিরোধী দলমুক্ত রাখার চেষ্টা করেছে। কারণ তারা জানত, সরকার পরিবর্তন হলে তারা মারাত্মক শোচনীয় অবস্থায় পড়বে। মেট্রোপলিটন শহরকেন্দ্রিক পুলিশের সঙ্গে বিজিবির শক্তি যোগ হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শহরগুলো বিশেষ করে রাজধানীতে বিরোধী দল দাঁড়াতে পারেনি। অন্যদিকে পুলিশের সদর দফতর শত আন্তরিকতা ও চেষ্টা তদ্বির সত্ত্বেও জেলা পুলিশকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ করাতে পারেনি। এভাবেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সংঘটিত হয় এবং আওয়ামী লীগ তার সহযোগীদের নিয়ে নতুন করে ক্ষমতার মসনদে বসে।

নতুন মেয়াদের ক্ষমতায় পুলিশের মধ্যে নতুন করে কতগুলো সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত, নির্বাচন-পূর্ব সময়ে যেসব কর্মকর্তা সরকারের স্বার্থে দক্ষতার সঙ্গে সংরক্ষণ করতে পেরেছেন এবং যেসব কর্তা পারেননি- তাদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় মনস্তাত্তি্বক লড়াই। অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দৌরাত্ম্য সীমাহীন পর্যায়ে বাড়তে থাকে। থানাভিত্তিক পুলিশের কর্মকর্তারা বিশেষ করে ওসি এবং এসআইরা অনেকটা নিজেদের মতো চলতে শুরু করেছে। বেশির ভাগ জেলার এসপিদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই ওসিদের ওপর। আগে যেমন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন মহলে দেনদরবার করে অভিযুক্তদের বদলি করতে পারতেন। কিন্তু এবারকার অটো এমপি কিংবা সেমি অটো এমপিরা ওসব ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে একদম নারাজ। পত্রিকায় দেখলাম এক ডিআইজির ছেলেকে এক এসআই ধরে নিয়ে গেছে থানায়। ডিআইজির স্ত্রী ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। পরে অবশ্য ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এসআইকে ক্লোজ করা হয়। অন্য এক ঘটনার কথা লিখেছে প্রথম আলোসহ আরও কয়েকটি পত্রিকা। এবারও এক এসআই। পরকীয়া করে বেড়ায় অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে। কুলটা স্ত্রীর হতভাগ্য স্বামী মৃদু আপত্তি করায় এসআইটি সেই স্বামী বেচারার পায়ে গুলি করে তাকে সন্ত্রাসী মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। সালাউদ্দিন নামের এক ওসির কুকর্ম দেখাচ্ছে কয়েকটি চ্যানেলে। বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে সে নাকি লোকজনকে থানায় ধরে আনে এবং মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে। আমি এক ওসিকে চিনি। সে তার থানা এলাকায় এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে ৩-৪ জন সন্ত্রাসীকে। এসব সন্ত্রাসী ১২-১৪টি হোন্ডা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ব্যবসায়ী, ধনাঢ্য লোকজন এবং প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে গণ্ডগোল শুরু করে। ওসি তার দলবল নিয়ে কাছাকাছি লুকিয়ে থাকে। তারপর ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে টার্গেট লোককে নিয়ে যায় থানায়। মোটা অংকের টাকা দিলে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর টাকা না পেলে ৩-৪ মামলা দিয়ে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

মাঠ পর্যায়ের পুলিশের বাড়াবাড়ি এবং দুর্বৃত্তপনার বিষয়ে প্রতিকার পাওয়া তো দূরের কথা অভিযোগ শোনার কোনো লোক নেই। কেউ যদি দয়া করে শোনেনও কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো ক্ষমতা রাখেন না। একজন সম্মানিত রাজনৈতিক নেতা তার এলাকার ওসির বিষয়ে অভিযোগ দেওয়ার জন্য এসপির কাছে ফোন করলেন। ২-৩ ঘণ্টা ধরে কয়েকশবার চেষ্টা করার পরও এসপি ফোন ধরলেন না। এরপর ভদ্রলোক ভয়ে ভয়ে ডিআইজির কাছে ফোন করলেন। ডিআইজি বেশ সম্মান ও তাজিমসহকারে নেতা ভদ্রলোকের ফোনটি রিসিভ করলেন এবং এ কথা শুনে খুবই আশ্চর্য হলেন যে, গত ২-৩ ঘণ্টা একনাগাড়ে ফোন করার পরও এসপি ফোন ধরেননি। তিনি ফোনকারী নেতার কাছে নিজের বীরত্ব জাহির করতে গিয়ে বললেন, স্যার! কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি এখনই এসপিকে বলছি। এত্তোবড় সাহস! ও আপনার ফোন ধরে না। দাঁড়ান দেখাচ্ছি মজা। ওই আপনাকে ফোন ব্যাক করবে। নেতা মনের আনন্দে সিগারেট ধরালেন। প্রায় ৩০ মিনিট চলে গেল এসপি ফোন করে না। এরপর নেতা নিজেই আবার বেহায়ার মতো ফোন দিলেন। এবারও এসপি সাহেব ধরলেন না। নেতা মনের দুঃখে ঠোঁট কামড়াতে কামড়াতে ডিআইজিকে আবার ফোন দিল। ডিআইজি বললেন, স্যার আমি তো চেষ্টা করলাম! ও যে কেন আপনার ফোন ধরছে না তার আগামাথা কিছুই বুঝছি না। আমি দুঃখিত! দ্যাখেন স্যার! আমি একজন ডিআইজি হয়ে আপনার ফোন ধরি অথচ …জাদা আপনার মতো সম্মানিত মানুষের ফোনই রিসিভ করে না। দেশটার হলো কি? মানসম্মান বোধ কি উঠে গেল নাকি…।

আমার পরিচিত নেতাটি বেশ প্রভাবশালী এবং সারা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত পরিচিত নাম। তিনি বিষয়টি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ে আলাপ করলেন। ঊর্ধ্কতন কর্তৃপক্ষের কথাবার্তা শুনে তিনি আরও হতাশ হলেন। সবারই একই কথা আর কয়টা দিন অপেক্ষা করুন। নতুন আইজি নিয়োগ হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি ভদ্রলোকের কথা শোনার পর আশ্চর্য হলাম না। কারণ পুলিশের বর্তমান সমস্যা নিয়ে কমবেশি আমারও কিছু জানাশোনা আছে। মাঠ পর্যায়ের সমস্যা দিনকে দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অন্যদিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রায় সব সদস্যই অপেক্ষা করছে নতুন আইজির মনোনয়নের জন্য। কিন্তু কে হতে যাচ্ছে নতুন আইজি!

সরকার আইজি নিয়োগ নিয়ে যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেয় কিংবা গড়িমসি করে অথবা বিলম্ব করে তবে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটির সর্বনাশ ঘটে যাবে। বর্তমান আইজির মেয়াদ আছে জানুয়ারি পর্যন্ত। তিনি আরও দুই বছরের জন্য এঙ্টেনশন চান। এই সরকার সব সময়ই তাদের প্রিয়ভাজন সরকারি কর্মকর্তাদের বারবার চাকরির মেয়াদ বৃদ্ধি করে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেছেন। সেই হিসাবে বর্তমান আইজি মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করতেই পারেন। গত প্রায় পাঁচটি বছর আইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আইজির উপাধি ইতিমধ্যে হাসিল করেছেন। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় সরকারের সঙ্গে কাজ করার দরুন সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা চোখের ইঙ্গিত তার নখদর্পণে। তিনি ভালোভাবে জানেন, কারা সরকারের পছন্দের লোক কিংবা কারা অপছন্দের লোক।

বর্তমান আইজির মেয়াদ কি সত্যিই বাড়ানো হচ্ছে? হতে পারে আবার নাও হতে পারে। দুই পক্ষেই যথেষ্ট মতামত রয়েছে। তবে এ কথা সর্বজনবিদিত যে, তিনি আপাদমস্তক ভদ্রলোক মানুষ। দীর্ঘদিন র্যাবে ছিলেন কিন্তু কোনো বদনামির শিকার হননি। প্রধানমন্ত্রী সাধারণত শান্তশিষ্ট এবং চুপচাপ স্বভাবের মানুষ পছন্দ করেন। অন্যদিকে গণভবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠজনরাও বর্তমান আইজিকে পছন্দ করেন বিভিন্ন কারণে। ফলে তার মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অন্যদিকে তাকে বাদ দিয়ে যদি নতুন কাউকে আইজি নিয়োগ দেওয়া হয় সে ক্ষেত্রে সরকারকে সত্যিকার অর্থেই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে। কারণ আইজি প্রার্থীরা সবাই সরকারের ঘনিষ্ঠ এবং যোগ্যতার বিচারেও প্রায় কাছাকাছি। সে ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থা হবে শ্যাম রাখি না কুল রাখির মতো। আর এ সমস্যাটাকেই এক নম্বর সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন বর্তমান আইজির লোকজন। কে কখন কবে আইজি হবেন, আজকের লেখার প্রতিপাদ্য কিন্তু সেটা নয়। আজকের বিষয়বস্তু ছিল পুলিশে অস্থিরতা এবং স্থবিরতার প্রসঙ্গ। সেই ২০০৯ সাল থেকে আজ অবধি বিভিন্ন পরিস্থিতি এবং প্রেক্ষাপটের কারণে পুলিশ বাহিনী নানাবিধ সমস্যার জালে আটকা পড়ে গেছে। এসব সমস্যা বাড়তে বাড়তে একদম আইজি পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। এ অবস্থায় একজন দক্ষ এবং যোগ্য আইজি নিয়োগ দিয়ে বুলেট আকারে বাহিনীটির সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের ব্যবস্থা না করলে সরকার এক মারাত্মক বিপদে পড়বে।

লেখক : রাজনীতিক

উৎসঃ   বাংলাদেশ প্রতিদিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ