সিসি ডেস্ক: দু’টি ঘটনা। ছবিই কথা বলে। এক. রাজধানীর শাহবাগে শিক্ষার্থীদের মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের বেধড়ক পিটুনি। এ থেকে বাঁচতে পালানোর সময় পুলিশ এক ছাত্রীকে পিছন থেকে চেপে ধরে পায়ের হাঁটু দিয়ে মারছে। পুলিশের এই অমানবিক নির্যাতনে আহত মেয়েটি রাস্তায় পড়ে যায়। দ্বিতীয়. বরিশালের ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির ছাত্রীদের মিছিলে পুলিশের লাঠিপেটা। পুলিশের পিটুনি থেকে বাঁচতে ছাত্রীরা দৌড়ে পালানোর সময় মাটিতে পড়ে গেলে সে অবস্থায় তাদের পেটানো হয়। মর্মস্পর্শী ঘটনা দু’টি দিনে দুপুরে ঘটেছে আইন শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীর হাতে। রাজপথের কন্যা-জায়া-জননীর রক্তাক্তের এ ঘটনা দেশের বিবেকবান মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। তারা প্রতিবাদ করছেন নিজ নিজ অবস্থান থেকে। শুধু প্রতিবাদ করছেন না দেশের নারী নেত্রীরা। বিজ্ঞ জনেরা বলছেন, ’৫২’র ভাষা আন্দোলনের পর দু’একটি বিচ্ছিন্ন (২০০০ সালে কাকরাইলে মনি বেগমের কাপড় ছেঁড়া ও পরবর্তীতে মতিয়া চৌধুরীর রাস্তায় শুয়ে পড়া) ঘটনা ছাড়া প্রকাশ্যে রাজপথে নারীদের ওপর এভাবে আইনশৃংখলা বাহিনীর আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।
‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে’ কবির এ পংক্তির সঙ্গে সুর মিলিয়ে নারী নেত্রীদের সম্পর্কে বলা যায় ‘ঘুমিয়ে আছেন নারী নেত্রীরা বিত্তবৈভবের অন্তরে’। নারী নেত্রীরা দেশের নারীর অধিকার আর নারী স্বাধীনতার দাবিতে দীর্ঘদিন থেকে আন্দোলন করছেন। কথায় কথায় নারীর ওপর সহিংসতার অজুহাত তুলে মিডিয়া গরম করছেন। তারা মন্ত্রী-এমপি হচ্ছেন; এনজিও’র রেজিষ্ট্রেশন নিয়ে বিশেষ বিশেষ সুবিধা নিচ্ছেন। এসব তারা নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থে করলেও দাবি করছেন, দেশের সমগ্র নারী সমাজের ভাগ্যের পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করেন। কিন্তু বাস্তবতা কী তাই? অবহেলিত বঞ্চিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দোহাই দিয়ে এনজিও এবং নারী সংগঠনের নেত্রীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে বড় বড় অফিস খুলেছেন। নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়ে ফ্লাট কিনেছেন, বড় বড় গাড়ি করে ঘুরছেন। বিদেশ সফর-ভ্রমণ করছেন। সভা-সেমিনারে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাচ্ছেন। পত্রিকায় লেখালেখি, সভা-সেমিনার এবং টিভির টকশোতে গলা ফাটাচ্ছেন। অথচ শাহবাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য দ্বিতীয়বার পরীক্ষার সুযোগের দাবিতে আন্দোলনের অপরাধে (!) নারী রক্তাক্ত হলেও তারা নীরব রয়েছেন। সরকার বিব্রত হবে এবং নিজেদের আয়-রোজগার কমে যাবে এ আশঙ্কায় তারা নীরবতা পালন করছেন? নাকি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত ঘরে জন্ম নেয়া মেয়েদের মানুষ হিসেবে নারী নেত্রীরা ‘তাদের হিসাবের খাতায়’ রাখেন না? শাহবাগের রাজপথের রক্তাক্ত মেয়েটি এবং বরিশালের আইএইচটি পড়তে আসা মেয়েগুলো গ্রামগঞ্জের গরীব ঘর থেকে এসেছিল বলেই তাদের মানুষ মনে করছেন না সুবিধাভোগী নারী নেত্রীরা?
ঢাবিতে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার দাবিতে আন্দোলনের সময় শাহবাগে দিনে দুপুরে এক ছাত্রীকে পুলিশের ভয়াবহ নির্যাতনের ছবি দেশের সব পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে। টিভিতেও সচিত্র খবর প্রকাশ হয়েছে। টকশো, ফেসবুক, টুইটার, ব্লগে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ছবিতে দেখা গেছে শাহবাগে পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের ছত্রভঙ্গ করতে বেধড়ক মারধর করছে। আন্দোলনরত এক ছাত্রের গলা টিপে ধরেছে পুলিশ (গতবছর শাহবাগের এই তরুণরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে উঠেছিল বলে প্রচার করা হয়; এখন তাদের গলা টিপে ধরা হয়)। একজন পুলিশ এক ছাত্রীকে পিছন থেকে ধরে পায়ের হাঁটু দিয়ে লাথি মারছেন। ছাত্রীটি দৌড়ে পালানোর সময় হুড়োহুড়ির জটলায় পড়ে পুলিশের নির্মম আঘাতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। আরো অন্য ছাত্রীদের ওপর একইভাবে আঘাত করা হয়। রাস্তায় লুটিয়ে পড়া ছাত্রীটিকে পাঁজাকোলে করে তুলে নিয়ে যাচ্ছে সহশিক্ষার্থীরা, এমন ছবিও পত্রিকায় এসেছে। গত সপ্তাহে বরিশালের ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির (আইএইচটি) শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশি এ্যাকশানের ছবি খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে বেধড়ক লাঠিচার্জে কয়েকজন ছাত্রী মাটিতে পড়ে যায়। মাটিতে পড়ে যাওয়া একজন ছাত্রীকে পুলিশ বুট জুতার চাপা দিচ্ছে। অসহায় ছাত্রীটির চোখে অসহায়ত্ব প্রকাশ পাচ্ছে।
এ ঘটনা দু’টি দেশের বিবেকবান মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু নারী নেত্রীরা ‘খামোশ’ রয়েছেন। তারা কী সরকারের আনুকূল্যে বিদেশী টাকার কাছে নিজেদের বিক্রী করে দিয়েছেন? গ্রামের মেয়েদের অধিকার নিয়ে তাদের আগ্রহ নেই? সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিষ্টার মইনুল হোসেন ও ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গতকাল বাংলাভিশনের টকশোতে ঘটনা দুটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ৫০ বছর আগেও এ ধরনের ভয়ঙ্কর ঘটনা কল্পনা করা যেত না। নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সমান তালে এগিয়ে চলছে। এ যুগে নারীকে রাজপথে নিদারুণ রক্তাক্ত হতে হয় আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে ভাবতে কষ্ট হয়। রাজপথে নারীদের এ রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনায় সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, সাংবাদিক সমাজ সবাই উদ্বিগ্ন। শুধু নীরবতা পালন করছেন দেশের সুবিধাভোগী নারী নেত্রীরা। যারা কথায় কথায় নারী স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে ক্যামেরার সামনে চোখের পানি ফেলেন। তাদের এ নীরবতা রহস্যজনক।
দেশের তথাকথিত প্রগতিশীল সংস্কৃতিসেবী ও নারী নেত্রীরা কথায় কথায় দু’জন নারী নেত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। একজন পাকিস্তানের আসমা জাহাঙ্গীর আর অন্যজন বৃটেনে বসবাসরত বাংলাদেশী আইরিন খান। দেশের নারী নেত্রীরা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এই দুই নারী নেত্রীকে ‘নারী নেত্রীত্বের মডেল’ মনে করেন। দেশের কিছু নারী নেত্রী, এনজিওকর্মীর অনেকেই এদের মতো নেত্রী হতে চান। অথচ সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের জন্য ইরাকে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র চরম মানবাধিকার লংঘন করে। মার্কিন আর্মির হাতে হাজার হাজার ইরাকী নারী শিশু প্রাণ হারায়। ইরাকে মানবাধিকারের চরম লংঘনে গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু আসমা জাহাঙ্গীর ও আইরিন খান সে সময় গর্তে লুকিয়ে ছিলেন। বিবৃতি দিয়েও ইরাকে মার্কিনীদের তা-বলীলা ও মানবাধিকার লংঘনের প্রতিবাদ করেননি। তখন ইরাকে আমেরিকান সৈন্যের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা তাদের বিবেককে কেন নাড়া দেয়নি? তাদের মতোই এনজিওর টাকায় হৃষ্টপুষ্ট হওয়া সাম্রাজ্যবাদীদের হাতের পুতুল আমাদের নেত্রীরাও এখন যেন সংসদে সরকারের হাতের পুতুলখ্যাত বিরোধীদল জাতীয় পার্টির ভূমিকায় অবতীর্ণ। রাজপথে নারী যতই রক্তাক্ত হোক সরকার বিব্রত হয় এমন কোনো কাজ নেত্রীরা করতে নারাজ। বরং নারীরা যাতে জুলুম নির্যাতন নীরবে সহ্য করেন, সেটাই তাদের প্রত্যাশা। দিনাজপুরের ফুলবাড়ির উন্মুক্ত কয়লা উত্তোলন ইস্যুতে তারা একই পথ অনুসরণ করেছেন। জানা যায়, ফুলবাড়ীর নারী, দরিদ্র মানুষের জন্য যে দু’একটি সংগঠন কাজ করত, তারা নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তারা এখন নিরাপদ দূরত্বে থাকার নীতি গ্রহণ করেছে। যাদের কাজে ফুলবাড়ীর দরিদ্র মানুষেরা সাহস পেতেন, তাদের জন্য কাজ করার মতো সময় এসব সংগঠনের নেত্রীদের এখন নেই। এতে করে এশিয়া এনার্জি, এবং তাদের দালাল সুবিধাভোগীদের তৎপরতা বেড়েছে। নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়ে এক অর্থে এশিয়া এনার্জিকে সহায়তা করছে নারী নেত্রীরা। ফুলবাড়ীর দরিদ্র মানুষরা তাদের মতো করে এখন প্রতিবাদ করছেন। নারী স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে অর্থবিত্তে ফুঁলেফেপে ওঠা নারী নেত্রীদের সরকারের তল্পিবাহকের মানসিকতা দেখে মনে হয়, সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন দেশের সুবিধাবঞ্চিত নারীরাই এই নেত্রীদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমে তাদের মুখোশ উন্মোচন করবে।