এম আর মহসিন: ১৬ই ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। দিবসটি পালনে নানান কর্মসুচির মাধ্যমে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে। কর্মসুচির মধ্যে সৈয়দপুর ষ্টেডিয়ামে এ উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ স্কাউট ও ক্লাব দলের অংশগ্রহনে কুচকাওয়াজ, ডিস-প্লে এবং বিভিন্ন খেলাধুলা অনূষ্ঠিত হচ্ছে। চলছে এ ষ্টেডিয়ামে বিজয় উৎসব। তবে খবর রাখেন নি কেহ এ ষ্টেডিয়ামের অতিত ইতিহাস। অবাঙ্গালি অধ্যূষিত এ শহরের দ্বিতিয় বধ্যভুমিটি এখানেই যে অবস্থিত। তাই এখানে শহীদ হওয়া পরিবারেরা এ দিবস উদযাপনে এখনো যে কাঁদছে। স্বাধিন দেশের রঙ মাখানো উৎসব যে তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। তেমনি একজন বিধবা হচ্ছেন এ শহরের কুন্দল পূর্ব পাড়া এলাকার শহীদ আব্দুর রহিম (ভোলার) স্ত্রী আম্বিয়া বেগম(৭০)। এ মহান বিজয় দিবস এলেই যেন তার দু চোখের চাপা কান্নার পানি থামে না। অঝোরে ঝরে তার দু চোখের অশ্র“ধারা।
আম্বিয়া বেগম জানান, ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান সম্ভবা। তাই পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ি মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই যান কোলের দুই শিশু আবেদুল (৭) ও রবিউল (৩) কে নিয়ে নীলফামারীর সংগলশী এলাকার কাজিরহাটে পিতার বাড়িতে। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে স্বামির সাথে শেষ দেখা আর হয়নি। দেশ স্বাধিন হবে স্বামির কাছে ফিরবেন আবারো তাদের সংসার সুখে ভরে উঠবে- এমন প্রত্যাশাই ছিল তার।
তবে তার সে আশা পুরণ হয়ণি। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ পুরোপুরি শত্র“মুক্ত হয়ে বিজয় অর্জন করলেও পরের দিন রাতে প্রসুতি অবস্থায় খবর পান তার প্রানপ্রিয় স্বামি আর এ দুনিয়ায় নেই। এতটুকু খবরই যেন দেহের পাজর ভেঙ্গে দেয় এ শহীদ বিধবা পত্নী। তার কোল জুড়ে তৃতীয় সন্তান পৃথিবীতে এসেই এতিম হয়ে যান। পরে মৃত্যু সংবাদ পেলেও তাকে আর দেখতে দেয়া হয়নি স্বামির মুখ খানি। এ কথা গুলো বলতেই কেদেঁ ওঠেন আম্বিয়া বেগম। এরপর শ্বশুড় বাড়িতে থেকেই সন্তানদের বড় করেন বাড়ির গৃহস্থলি কাজ করে। কোন এলাকায় মজুরের কাজ করে বড় হয়েছেন। জীবন সংগ্রামে থেমে থাকেন নি এ শহীদ পত্নীর তিন সন্তান। তারা আজ স্বনির্ভর।
আম্বিয়া বেগমের বড় ছেলে আবেদুল (৫০) জানান, পিতা না থাকায় পড়ালেখা করতে পারিনি। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ ২০ বছর কুলির কাজ করে কাটিয়েছি চট্টগ্রামে। আজ কোন অভাব নেই আমাদের। তবে পিতা শহীদ হলেও স্থানিয় ভাবে কোন স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। একই কথা বলেন এ শহীদ বিধবার আরো দু সন্তান রবিউল(৪৬) এবং হামিদুল(৪৩)। তারা আরো বলেন, ১৯৮০ এর দশকে মাকে একটি সাদা শাড়ি ও পঞ্চাশটি টাকা দেয়া হয়েছিল সে সময়কার মুক্তিযোদ্ধা অফিস হতে। এরপর আর কেহ কোন খবর রাখেননি। অথচ এ ষ্টেডিয়ামেই মহান বিজয় দিবস উৎসাহ-উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে। এখান কার কোন কর্তপক্ষ এ বদ্ধভুমিটি সংরক্ষন ও এখানে শহীদদের নামের তালিকা প্রকাশ করেন নি। তাই এ বিজয় দিবসে এ বধ্যভুমিটিতে শহীদদের সৈয়দপুর ষ্টেডিয়ামের অনাড়ম্বর কর্মসুচি শ্রদ্ধার মাধ্যমে পালিত হওয়া উচিত বলে মনে করেন বর্তমান প্রজন্মসহ স্থাণীয় সচেতন মহল এবং শহীদ বিধবা পত্নী আম্বিয়া বেগম।