সিসি ডেস্ক: উত্তরাধিকার সূত্রে বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের জমিদারি পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সেই সূত্রে সেখানে প্রায়ই যাওয়া হতো তার। এখানেই প্রকৃতি ও মাটির সন্তানদের সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠতা হয়। কবি করতোয়ার জলে, তীরের কাশবনে, সবুজ ঘন জঙ্গলে আবিষ্ট হয়েছিলেন। এই প্রকৃতি ঘনিষ্ঠতা তার অনেক গল্প, কবিতার প্রেরণা জোগায়।
শাহজাদপুরের বাসিন্দা ডলি বেগম। বয়স এখন ৫৪ বছর। ব্রেনস্ট্রোক করে বাকশক্তি প্রায় হারিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের গল্প শুনেছেন দাদার কাছে। মা মনিজার বেগমের কাছেও কিছুটা।
কবি প্রথম প্রথম শুধু জমিদারি দেখাশোনা করতেই শাহজাদপুরে আসতেন। কিন্তু এক সময় এই বাংলার প্রেমে পড়ে যান। প্রায়ই আসতেন। কাছারিবাড়ির সামনের বাগান, জোড়া তালগাছ, খালপাড়, করতোয়ার তীরে কাশফুল, ঘন নীল আকাশ তাকে মুগ্ধ করতো। সেই অনুভূতি অনর্গল ঝরেছে তার কলমে। কাছারিবাড়ির সামনের খালটি অবশ্য এখন আর নেই। এটি মূল করতোয়ার সঙ্গে মিলেছিল।
ডলি বেগমের মা মনিজা বেগম আর খালা আলেয়া বেগমের বয়স তখন সাত বা আট বছর। নানা নূরুল হক তখন নুকোলির জমিদার। বাড়িতে বারবার ডাকাত পড়ায় জমিদারি ছেড়ে পাঠানপাড়া বাড়ি কিনে বসতি গড়েন। মানিজা বেগম তার ভাই-বোন আর আশেপাশের শিশুরা মিলে কাছারিবাড়িতে বেড়াতে যেত। সেখানে ফুল কুড়াতো, গাছের ফল পেড়ে খেতো, কেউ বাধা দিত না। আর রবীন্দ্রনাথ যখন থাকতেন তখন ধারে কাছে কোনো বাচ্চা দেখলে তাদের কাছে ডেকে কথা বলতেন। বাচ্চাদের খোকা-খুকি বলে ডেকে আদর করতেন। নাম কী, কোথায় থাকে, কার সাথে এসেছে এসব জানতে চাইতেন। অনেক ফর্সা, লম্বা, মুখভর্তি দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে লাল দুটো ঠোঁক, লম্বা সাদা ধবধবে চুল বিশিষ্ট সৌম্য শান্ত মানুষটাকে শিশুদের কাছে দরবেশের মতোই লাগতো। দীর্ঘ দিন পরেও মনিজার মনে ছিল, একদিন সেই দরবেশ লোকটা তাকে ডেকে পেয়ারা দিয়েছিলেন।
দাদা তছির উদ্দিনের বাড়ি রূপপুর। রূপপুরের পূর্বনাম ছিল থানারপাড়া। রবীন্দ্রনাথই রূপপুর নাম রাখেন। তছির উদ্দিন রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী ছিলেন। তার সঙ্গে কবির গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে তিনি শাহজাদপুরে এলেই তছির উদ্দিনকে কাছারিবাড়ি নিয়ে যেতেন। তাকে নিয়ে নদীরপাড়ে ঘন কাশবনে ঘুরে বেড়াতেন। নদীটা যে করোতোয়া সেটাও কবি প্রথম জেনে নেন এই তছির উদ্দিনের কাছেই।
রবীন্দ্রনাথ কোথাও গেলে পালকিতে করেই যেতেন। আর কাছারিবাড়ির সামনে যে খালটা ছিল সেখান থেকে শাহ মখদুমের মাজারের পাশ দিয়ে নৌকা করে যেতেন।
তিনি বেশিরভাগ সময় লিচু, বকুল, তাল, কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে বসে লিখতেন। সব বাচ্চার সাথে কথা বলতে চাইতেন। কেউ তাকে ভয় পেত আর কেউ কাছে বসে গল্প শুনতো।
মনিজা বেগম অবশ্য কয়েক বছর আগেই বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন।