নিউজ ডেস্ক: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আলমের অনিয়ম, দূর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারে অতিষ্ঠ দিনাজপুরের খানসামা উপজেলাবাসী ফুঁসে উঠেছে। তার অপসারণের দাবীতে বৃহস্পতিবার দুপুরে মানববন্ধন করেছে খানসামা উপজেলাবাসী। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে তার বিরুদ্ধে পোষ্টার লাগানো হয়েছে। তার অনিয়ম, দূর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের শ্বেতপত্রও কে বা কারা ছেড়েছে উপজেলায়।
খানসামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আলমের অপসারণের দাবীতে বৃহস্পতিবার দুপুরে জিয়া সেতু’র পূর্ব পাশ্বে এক মানববন্ধন কর্মসূচী ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে উপজেলাবাসী। কাঠফাটা রোদকে উপেক্ষা করে দুপুর ১২টা থেকে একটা পর্যন্ত ঘন্টাব্যাপী এ মানববন্ধনে অসংখ্য নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা ও শিশুরা অংশ নেয়। মানববন্ধন থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আলমের অপসারণের দাবী জানানো হয়। তা না হলে পর্বতীতে বৃহত্তর কর্মসূচী’র ডাক দেয়া হবে বলে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী আহেদা টিয়াপখি সহ অন্যরা জানায়। এছাড়াও বিভিন্ন স্থানে ইউএনও শাহীনুর আলমের তার বিরুদ্ধে পোষ্টার লাগানো হয়েছে। তার অনিয়ম, দূর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহারের শ্বেতপত্রও কে বা কারা ছেড়েছে উপজেলায়। শ্বেতপত্রে উল্লেখ রয়েছে, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ৬০টি আদিবাসীদের পরিবারের মাঝে ভ্যান প্রদানের জন্য ৮ হাজার ৫০০ টাকা দরে ৬০টি ভ্যান ক্রয় করে মন্ত্রী মহোদয়ের মাধ্যমে বিরতণ করা হয়। আর প্রতিটি ভ্যান ক্রয় বাবদ ১২ হাজার ৫০০ টাকা দরে ব্যয় দেখানো হয় ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে ভ্যান ক্রয়ের জন্য নাম মাত্র কমিটি করে তাদের কারো সাথে কোন প্রকার পরামর্শ না করে ইউএনও মহোদয় একক ভাবে চিরিরবন্দর উপজেলার রাণীরবন্দর হতে ক্রয় করেন। অপরদিকে ভ্যান প্রদানের পর অত্যন্ত সুকৌশলে আদিবাসীসহ কমিটির ৪/৫ জন সদস্যকে অফিসে ডেকে নিয়ে রেজুলেশনে স্বাক্ষর করান। আদিবাসীসহ অন্যান্য সদস্যগণকে বিজ্ঞাসাবাদ করা হলে এসব কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়।
২০১৩-১৪ অর্থ বছরে সুবর্ণখূলী (১), বাসুলী (২) আশ্রয়ন প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। প্রতিটি পিলার ৫ ইঞ্চি পর পর চুরি প্রদানের বিষয় স্টিমেটে উল্লেখ থাকলেও তা ১২/১৩ ইঞ্চি পর পর দিয়ে পিলার তৈরি করা হয় এবং ঘর তৈরির এ্যাঙ্গেল সিট ৫ মিটার করে দেওয়ার কথা থাকলেও ৪মিটার এ্যাঙ্গেল ও সিট দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়।
পরে রংপুর আশ্রয়ণ অফিসার এবং ইঞ্জিনিয়ার পরিদর্শনে এলে ধরা পরে। তারা ২/৩ টি পিলার ভেঙ্গে পরীক্ষা করে দেখেন ১২/১৩ ইঞ্চি পর পর চুড়ি/রিং দেয়া হয়েছে এবং এ্যাঙ্গেল সিটগুলি ৪টি ক্রয় করাতে আশ্রয়ণের ঘরে লাগানো নিষেধ করেন। অনুরূপ ভাবে নিম্নমানের পিলারগুলি ঘরে লাগাতে নিষেধ করেন।
কিন্তু উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভারতে প্রশিক্ষণ শেষ করে এসে নিষেধাজ্ঞাদানকারী অফিসারদেরকে ম্যানেজ করে ইউএনও মহোদয় তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার উলিপুর থেকে মিস্ত্রি এনে এসব পিলার ও এ্যাঙ্গেল সিট দিয়েই ঘর নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করেন। এছাড়াও প্রধান মন্ত্রীর প্রকল্পেও লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন।
২০১৫ খ্রি. সালে এপ্রিল মাসের শেষ দিকে এবং মে মাসের প্রথম দিকে কৃষকের কাছ থেকে সরকারি ভাবে ৮শ মেট্রিক টন গম সংগ্রহ করার লক্ষ্যে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মহোদয় দলীয় লোকদের সাথে চুক্তি করে ৪শ মেট্রিক টন গমের বরাদ্দ ভাগ করে নিজ খেয়াল খুশি মত ৫ হাজার টাকা ধরে স্লিপ বিক্রি করে মোটা অংকে অর্থ ইনকাম করেন।
খানসামা উপজেলার ১৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি কাম প্রহরী নিয়োগে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এক এক প্রার্থীর নিকট থেকে ৭ থেকে ১০ লাখ করে টাকা গ্রহণ করেন। অপরদিকে প্রতি প্রার্থীর নিকট থেকে উত্তোলনকৃত টাকা হতে পার্টি অফিসে ৫০ হাজার করে টাকা দেয়ার কথা থাকলেও ইউএনও মহোদয় ২৫ হাজার করে টাকা জমা দেন।
খানসামা উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোট পরিচালনার নামে সাধারণ জনগণের নিকট থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। যার মধ্যে তাস ও জুয়া খেলা মামলায় ৬ মাস ৯ মাস করে কারাদন্ড প্রদান করেন এবং উপজেলা এলাকায় আতংকের সৃষ্টি করান। পরবর্তীতে তাস ও জুয়া খেলাসহ মোবাইল কোর্টের অন্যান্যদের বেলায় ২০/৩০ হাজার করে টাকা আদায় করেন এবং জরিমানা স্বরূপ ২০০-৩০০টাকা করে সরকারি খাতে জমা করেন।
গত ২৮ ও ২৯ মে ২০১৫খ্রি. খানসামা উপজেলার ফায়ার সার্ভিস নির্মাণের জন্য নির্ধারিত স্থানের পার্শ্বের রাস্তার ধারের একটি গাছ নির্মাণ কাজে অসুবিধার সৃষ্টি হলে ঠিকাদারের লোকজন গাছটি কাটলে ইউএনও মহোদয় তাদেরকে অফিসে ধরে এনে গাছের ক্ষতিপুরণ বাবদ ২৫ হাজার টাকা গ্রহণ করেন এবং জরিমানা স্বরূপ মাত্র ২ হাজার টাকা সরকারি খাতে জমা করেন। এছাড়াও দালাল চক্রের সদস্য উপজেলা পাইলট স্কুলের শিক্ষক মনি মাস্টার ও উপজেলা চেয়ারম্যানের টাইপপিষ্ট তাসনীমের মাধ্যমে আবারও ৫ হাজার টাকা আদায় করেন।
নির্বাহী অফিসার এ্যাসিল্যান্ডের দায়িত্বে থাকায় সার্ভেয়ার খায়রুল ইসলামের মাধ্যমে প্রতি খারিজে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ১০/১২ হাজার করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। হাট চান্দিনার জায়গা সন করা লিজ দিয়ে পাকা করার সহায়তা দিয়ে আসছেন। খাস জমি ও কবর স্থানের জায়গা পত্তন দিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।
উপজেলার ১২টি হাট বাজারের হাট চান্দিনার জায়গা লাইসেন্স নাই মর্মে মাইকে প্রচার করেন এবং অবৈধ ঘর ভেঙ্গে দিবেন মর্মে হুমকি প্রদান করেন। এসব হাট বাজারের লাইসেন্স দেয়ার জন্য ইউএনও’র নির্ধারিত দালালকে দায়িত্ব দিলে তারা প্রতি হাট বাজারে গিয়ে লাইসেন্স বিহিন দোকানদারের নিকট থেকে ১৫/২০ হাজার করে টাকা আদায় করে।
২০১৪খ্রি. সালের জুন মাসে উপজেলা পরিষদের পানির পাম্পটি হঠাৎ বন্ধ রেখে বাসা বাড়িতে পানি না দিয়ে প্রচার করা হয় যে,পাম্পটি একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। পানির পাম্প, পাইপ ছকেট, বডিং সম্পূর্ণ নতুন ভাবে স্থাপন করতে হবে। মর্মে উপজেলা প্রকৌশলী হতে প্রাক্কলন প্রস্তুত করে নিয়ে মেশিন খারাপ হওয়ার ৫ দিনের মাথায় একটি সাব-মার্সেবল পাইপের ভেতর সেট করে ২/৩ ঘন্টার মধ্যে মেশিন চালু করান।
কিন্তু এই পাম্প মেশিনের পাইপ উত্তোলন করা হয়নি। কোন বডিংও করা হয় নি। কোন সকেট কিংবা পাইপ কিংবা উপজেলা বাসাবাড়ীতে কিংবা কোন পাইপ বাহিরেও সংযোগ প্রদান করা হয়নি। যে সাব-মটরটি সেট করা হয়েছে ৪ ইঞ্চি পাইপের ভিতর দিয়ে। যার মূল্য মাত্র ৬৫ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে উপজেলা রাজস্ব তহবিল হতে উক্ত খরচ বাবদ ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যয় দেখিয়ে মোটা অংকে টাকা আত্মসাৎ করেন।
২০১৩-১৪ অর্থ বছরে এডিপি এবং রাজস্ব তহবিলে প্রকল্প গ্রহণ করে বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রকৌশলী অফিস হতে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা হয়। ইতিপূর্বে অন্যান্য আর্থিক বছরে ১০/১২ হাজার টাকা পত্রিকার বিল বাবদ অফিসে আনুসাঙ্গিক বাবদ ব্যয় দেখানো হয়। কিন্তু ১৩-১৪ অর্থ বছরে উক্ত খাতে আনুঙ্গিক খরচ বাবদ ৯৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয় এবং পত্রিকার বিল ও বাইকে প্রচার বাবদ খরচ দেখানো হয় সর্বমোট ৯৮ হাজার টাকা। এ ভাবে ৩/৪ জন মিলে উপজেলা রাজস্ব তহবিলের অর্থ উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবার সাথে খারাপ আচরণ করে থাকেন। ইউএনও অফিসের স্টাফ, ভূমি অফিসের স্টাফ, পিআইও এবং অন্যান্য অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে দুর্ববহার করে থাকেন। এছাড়াও ব্যাটা এবং মিঞা বলে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন।
উল্লেখ্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আলমের আগের কর্মস্থল কুড়িগ্রামের উলিপুরে তার অপসারণের দাবীতে উপজেলায় ব্যাপক আন্দোলন হয়। তিনি সেখান থেকে বদলী হওয়ার পর এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করে ভূক্তভোগি এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীনুর আলমের যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,অবৈধ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করতে না দেয়ায় একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে নেমেছেন। উলিপুরে আমার অপসারণের দাবীতে আন্দোলনটি ছিলো ভিন্ন। আমি টিআর চাল পাচার ও আত্মসাতকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ায় তারা আমার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে আন্দোলনে নামে। আমি বদলি হওয়ার পর খুশীতে মিষ্টি বিতরণ করে।