সিসি নিউজ: ষড়ঋতুর বাংলাদেশে তাপবিনাশী ও প্রাণষ্পর্শী ঋতু বর্ষার আজ প্রথম দিন, তথা আষাঢ়ষ্যের প্রথম দিবস। বর্ষা বাঙালীর জীবন, পরিবেশ, কৃষ্টি, সামাজিকতা, আনন্দ-বেদনা, চলন-বলন, গান, উৎসব, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ঘিরে বিপুল-ভাবে আলোকবর্তিকা সৃষ্টি করে আছে। বাঙালীকে আবিষ্ট করে রেখেছে সার্বিক বোধন আর আরাধনায়।
আদিকাল থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় বর্ষা ঋতু নিয়ে রয়েছে উচ্ছ্বসিত বন্দনা, অনুরাগ। রহস্যময়ী এ বর্ষার রূপ, বৈচিত্র্য, চমক, বর্ণচ্ছটা এবং আকাশ- প্রকৃতির গভীর মিতালী শিল্প-সাহিত্যের সরস উপকরণ হিসাবে আবহমানকাল থেকেই অনুপ্রাণিত ও স্পন্দিত করে আসছে শিল্পী, কবি ও সাহিত্যিকদের।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা সম্ভারেও বর্ষা দখল করে আছে উল্লেখযোগ্য স্থান। বর্ষা ছিল কবির একটি প্রিয় ঋতু। তাই তাঁর বিভিন্ন গানে উঠে এসেছে মেঘ-মেদুর বর্ষার রূপ ঐশ্বর্যের শিল্পিত বর্ণনা। তিনি লিখেছেন- ‘বজ্র মানিক দিয়ে গাঁথা, আষাঢ় তোমার মালা/ তোমার শ্যামল শোভা বুকে বিদ্যুতেরই জ্বালা ॥/ তোমার মন্ত্রবলে পাষাণ গলে, ফসল ফলে/ মরু বহে আনে তোমার পায়ে ফলের ডালা ॥…’ অথবা ‘বাদলের ধারা ঝরে ঝরঝর,/ আউশের ক্ষেত জলে ভরভর,/ কালি-মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনিয়েছে দেখ্ চাহি রে।/ ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে…’। বিশ্বকবির এই শাশ্বত পঙতি যুগলের ছন্দের মত ঝরঝর বর্ষণ আজ হবে কিনা জানা নেই কারো। তবে কবির এমনই আহ্বানের মতো দেশবাসীরও আশা, বর্ষার আগমনে তাপিত গ্রীষ্মের দীর্ঘ অধ্যায়ের অবসান হবে। দাবদাহে হাঁসফাঁস হয়ে ওঠা মানুষগুলো স্বসি- পাবে। জলভরা মেঘের আষাঢ় এসে যবনিকা টেনে দেবে বহমান দীর্ঘ তাপদহনের জ্বালা- যন্ত্রনার অধ্যায়ের, অর্থাৎ গ্রীষ্মের।
বর্ষার আগমনে দাবদাহে কাহিল মানবকুলের সঙ্গে মুক্তি পাবে প্রকৃতি এবং উদ্ভিদরাজিও। শান্তি, স্বস্তি- ও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পেতে তাই মানুষ ও প্রকৃতি উভয়ের মধ্যেই চলছে একে বরণ করে নেয়ার নানা আয়োজন।
অসহনীয় দাবদাহের কারণে রোগ- বালাইসহ নানা ধরণের দুঃসহ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সবাইকে। বর্ষার আগমনে দুর্ভোগের সেই পালা ফুরিয়ে আসবে, এ আশায় মানুষ আনন্দে উদ্বেল ও উৎফুল্ল এবং মুক্তির আকুল প্রতিক্ষায় দেশবাসী।
চিরকালই বর্ষাঋতু’র আবাহন এই দেশের প্রকৃতিকে বদলে দেয় নানারূপে, নানা চিত্রধারায়। নদ-নদীতে বাড়তে থাকে জলের ধারা। খাল-বিলে ফিরে আসে চিরচেনা রূপের বহর। মৌসুমী বায়ুর বহতায় প্রকৃতির অন্তর জুড়িয়ে দেয় বৃষ্টিমাখা শীতল বাতাস। ফলে শান্তির পরশ ফিরে আসে সামাজিক জীবনে।
এছাড়া কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ, কদমফুলের চোখ জুড়ানো শোভা ও পেখম খোলা ময়ূরের উচ্ছ্বল নৃত্যের আবাহন থাকে এই আষাঢ়েই। তাই প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ আষাঢ়কে বলেছেন- ‘ধ্যানমগ্ন বাউল- সুখের বাঁশি’।
তবে বর্ষা নিয়ে নবযৌবন আর যৌব-নের কবিদের আদিখ্যেতা থাকলেও একে নিয়ে অনুযোগেরও কমতি নেই। কাব্যলক্ষ্মীর সাধনায় যাদের আগ্রহ কম, তাদের অনেকের কাছেই বর্ষা ভোগান্তিও বটে। কেননা আষাঢ় মানেই বৃষ্টির ঘনঘটা। বৃষ্টির তোড়ে যাওয়া যায় না ঘরের বাইরে। বিশেষ করে নগরের রাস্তায় বের হওয়া অনেক সময়ই নিয়ে আসে চরম দুর্ভোগ, কমে যায় দিন-মজুরের আয়-উপার্জন। গ্রামাঞ্চলেও অনেক সময়ে কাজের ব্যাঘাত ঘটে। বর্ষার ঢল অনেক সময়ে বন্যারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তারপরও বর্ষা নিয়ে যে যাই বলুক বা ঘটুক, বর্ষা যে বাঙালীর মনন জুড়ে এক ভিন্নমাত্রা যোগকারী ঋতু সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।