সিসি ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপর মামলার চাপ বাড়ছে। দিন যত যাচ্ছে তার বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম তত দ্রুত এগুচ্ছে। তার বিরুদ্ধে চলমান দুদকের মামলার কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য দুদকের বাদী ও দুদকের আইনজীবীরা নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। বসে নেই বিএনপি চেয়ারপারসন ও তার আইনজীবীরাও। তারা মামলার কার্যক্রম বিলম্বিত করার জন্য চেষ্টা করেছেন। নানা কৌশল করছেন। এক একটি মামলার কার্যক্রম যাতে না চলে ও কেন মামলা চলবে না সেই সব কারণ উল্লেখ করে সেই জন্য মামলার কার্যক্রম ও আদালতের উপর অনাস্থা এনেও কোন কোন বিচারকের প্রতি অনাস্থা এনে মামলার বিচারকাজ না চলার জন্য আবেদন করছেন। কোনো কোনো মামলাতে আদালত পরিবর্তন করার জন্য ও কোনো কোনো মামলায় বিচার পরিবর্তনের জন্য এতোদিন ধরে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুর্নীতির কোন মামলায় সেই সুযোগ পাননি। সেটা না পেয়ে এখন আবার দুই দুর্নীতির মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ মূলতবি করার চেষ্টা করছে। এই ব্যাপারে আগামী ২৩ জুলাই আদালত সিদ্ধান্ত নিবেন।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীদের একজন বলেন, তার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ, জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাষ্ট, গ্যাটকো ও নাইকো দুর্নীতির মোট চার দুর্নীতির মামলা ও ছয়টি হত্যা মামলার চাপ রয়েছে তার উপর।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, সরকার বিএনপির সঙ্গে কৌশলে পেরে উঠছে না। তাদের ভেতরে ভয় আছে বলে বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। বিএনপির চেয়ারপারসন সহ অন্যান্য নেতাদের মামলা দ্রুত শেষ করতে চায়। এই কারণে খালেদা জিয়ার মামলার কাজ দ্রুত করতে চাইছে। আমরা সরকারের এই উদ্দেশ্য বুঝে গেছি। ম্যাডামও জানেন। তবে তিনি এই বিষয়ে মোটেই বিচলিত নন। তার উপর মামলার চাপ বাড়ছে। কিন্তু বিচলিত হলে চলবে না। ম্যাডাম জানেন যে সরকার বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য তাকে গ্রেপ্তারও করতে পারেন। সেটা নিয়েও ম্যাডাম চিন্তিত নন। তিনি জেলে যেতেও প্রস্তুত। কারণ সরকার যদি তাকে গ্রেপ্তার করার সিদ্ধান্ত নেয় সেটা হবে সরকারের চরম ভুল। কারণ তাকে গ্রেপ্তার করলেই দেশের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নেমে যাবে। তখন সরকার তাদের পতন ঠেকাতে পারবে না। এরশাদ দেশের অনেক উন্নয়ন করেছিলেন কিন্তু এরপরও তিনি আন্দোলনের মুখে সরে দাঁড়িয়েছেন। তার পতন হয়েছে। এক ডা: মিলনের ঘটনায় তার শাসনের যবনিকাপাত ঘটে। তেমনি এক একটি ছোট ঘটনা ঘটবে যেই ঘটনায় সরকারের পতন হবে। এই জন্য আমাদের সরকার পতনের ডাক দিতে হবে না। জনগণই মাঠে নামবে।
সূত্র জানায়, খালেদার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। চার্জ গঠনের জন্য যাত্রাবাড়িতে পেট্রোল বোমা হামলায় মানুষ হত্যার ঘটনায় চার্জ গঠন হতে পারে এই মাসেই। এছাড়াও আরো একটি মামলায় আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার উপর মামলার চাপ বাড়ছে। সরকার ইচ্ছে করেই পুলিশকে দিয়ে এটা করাচ্ছে।
এদিকে, এতোদিন দুটি দুর্নীতির মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ চলছিল। এখন অন্যান্য মামলার কাজও দ্রুত এগুবে বলে মনে করছে দুদকের আইনজীবী। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, আমরা অনেক দিন অপেক্ষা করছি। তিনি আদালতে হাজিরা দেননি বেশির ভাগ দিন। মামলার কাজ বন্ধ করার জন্যও নানা চেষ্টা করছেন। তারপরও আমরা আইনীভাবে বিষয়গুলো মোকাবিলা করছি। এখন আমরা আশাবাদী যে তিনি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে মামলার কাজ দ্রুত শেষ করতে সহায়তা করবেন।
এদিকে নাইকো দুর্নীতির মামলা আর চলতে পারে না বলে খালেদার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে আদালত। সেই সঙ্গে এটাও বলেছে এই মামলার কার্যক্রম চলতে আইনী কোন বাঁধা নেই। ফলে ওই মামলার কাযক্রমও সহসাই শুরু করতে পারবে বলে মনে করছে দুদক। কিন্তু খালেদা জিয়া আদালতের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা ভাবছেন।
তার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের দাবি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রমাণ থাকার পরও নাইকো মামলা শেষ করা হয়েছে। যেখানে তার মামলা চলেনি সেখানে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধেও মামলা চলতে পারে না। কিন্তু বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরদ্ধে কোন প্রমাণ না থাকার পরও মামলা চালানো হচ্ছে। তার উপর মামলার চাপ বাড়িয়ে সরকার তাকে টেনশনে রাখতে চাইছে। তিনি যাতে কঠোর আন্দোলনে যেতে না পারেন সেই চেষ্টা চলছে। তিনি নতুন করে আন্দোলনে গেলে ও সরকার পতনের মতো কোন ডাক দিয়ে কর্মসূচি দিলেই সরকার তাকে কারাবন্দী করার সিদ্ধান্ত নিবে। সরকার তার প্রতি বৈরী আচরণ করছে। অন্য কোনভাবে তাকে দমাতে না পেরে মামলা দিয়ে দমাতে চাইছে। এটা আসলে সরকারে ভুল পথ। এদিকে সম্প্রতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে এই মুহূর্তে নির্বাচন অগ্রাধিকার নয়। অগ্রাধিকার হলো খালেদা জিয়ার মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করে তার সাজার ব্যবস্থা করা।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা ন্যায় বিচার পাচ্ছি না। ম্যাডামেরও এনিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এই কারণে তিনি এটাও বলেছেন।
খালেদা জিয়া তার আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, দেশের মানুষ আজ খুব খারাপ অবস্থায় আছে। দেশের কোথাও স্বস্তি নেই। খবরের কাগজ খুললেই আওয়ামী লীগের গু-া বাহিনীর নির্যাতনে মানুষ আজ অতিষ্ট। আওয়ামী লীগ কখনও দেশের উন্নয়ন করে না, তারা করে নিজেদের উন্নয়ন। ক্ষমতায় এসে তারা নিজেরা লুটেপুটে খায়।
আরো বলেছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে সুশাসন নেই, বিচারালয়ে গিয়েও সুবিচার পাচ্ছেন না তারা। আদালতে গেলে আমরা (বিরোধী দল) জামিন পাই না। ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়ে পারোয়ানা জারি করেছে। সে বিপদের মধ্যে আছে। অ্যাডভোকেট পাপিয়া আদালতে হাজিরা দিতে গেছে, তাকে ভরে দিয়েছে। এখন যেই যায়, তাকে ভরে দেয়। ওরা (আওয়ামী লীগ) মনে করে, জেলে ভরে মিথ্যা মামলা দিয়ে বিএনপিকে শেষ করবে, বিএনপিকে ধবংস করবে। এতে কোনো লাভ হবে না। প্রধান বিচারপতি বলেছেন, উচ্চ আদালত সব সময় স্বাধীন ছিল। তিনি বলেছেন, ছিল। তার মানে এখন নেই। আরও বলেছেন, নিম্ন আদালত নির্বাহী বিভাগের হাতে। আমি প্রধান বিচারপতির এই কথার পর বলছি, মানুষ আজ কোথাও ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। ন্যায় বিচার যে পাচ্ছেন না এর পাশাপাশি তিনি বিচারপতি নিয়োগে দলীয় করণ হচ্ছে সেই প্রসঙ্গেও কথা বলেন।
এদিকে বৃহস্পতিবার তার নাইকো মামলা চলতে বাঁধা নেই বলে আদালত তার আবেদন খারিজ করে দেন। সেই দিনই তিনি জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাষ্ট ও জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাষ্ট দুর্নীতি মামলায় হাজিরা দেন। বিশেষ আদালতে তিনি ওই দুই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ মূলতবি রাখার আবেদন জানান। আদালত ওই দেন আদেশ দেননি। ২৩ জুলাই পরবর্তী দিন ধার্য করেন।
খালেদার উপর মামলার চাপ বাড়ছে, হত্যা মামলা গুলোর চার্জশিটও দ্রুত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, তিনি অন্যায় ও অপরাধ করেছেন। এই জন্য মামলা চলছে। এখানে আমাদের কোন হাত নেই। অপরাধ করলে শাস্তিতো পেতেই হবে। যে সব হত্যা মামলায় তিনি আসামি আছেন ওই সব মামলার কাজ দ্রুত যাতে শেষ হয় সেই চেষ্টা আমাদের আছে। আমরা আশা করি সেটা পারবো।
তিনি বলেন, আমরা তার মামলার কাজ দ্রুত করে তার শাস্তি নিশ্চিত করতে চাইছি এটা সত্য। কিন্তু তাদের আন্দোলন থামানোর জন্য আমরা তার বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা শেষ করতে চাই। তাকে গ্রেপ্তার করতে চাই এটা ঠিক না। বিএনপি এই ধরনের অভিযোগ করলেও এর সত্যতা নেই। তবে এটা আমি বলতে পারি তার বিরুদ্ধে মামলার বিচারকাজ ও বিচারকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ হবে। রাজনৈতিকভাবে তার বিষয়টি দেখা হচ্ছে না। তিনি তার আন্দোলন কেমন করে করবেন সেটা তার ব্যাপার। তবে আমরা বিএনপির অসাংবিধানিক আন্দোলন সফল হতে দেব না। আস