সিসি ডেস্ক: ‘আগে আসলে আগে ক্রয় করা হবে’ ভিত্তিতে ধান ক্রয় করতে হবে, সরকারিভাবে ধান ক্রয়ের নীতিমালায় এমন বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত ৫৮ দিনে জয়পুরহাটে ধান সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ২০৬ মেট্রিক টন। আর এই ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কেনার বদলে কেনা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে। অথচ কৌশলে বিক্রয় তালিকাটি করা হয়েছে কৃষকদের নামে। যাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সেই কৃষকরাই অভিযোগ করেছেন নেতারা প্রভাব খাটিয়ে অনুমতি ছাড়াই তাদের নাম ব্যবহার করছে।
তবে কৃষকরা এমন অভিযোগ করলেও এ ঘটনায় জড়িত ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতারাসহ জয়পুরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে এক হাজার ৫১৫ মেট্রিক টন ধান এবং জেলার লাইসেন্সভুক্ত চালকল মালিকদের কাছ থেকে ২৩ হাজার ৬৪৩ মেট্রিক টন চাল ক্রয় করার বরাদ্দ মেলে। চাল সরবরাহের জন্য এরই মধ্যে জেলার ৫১১টি লাইসেন্সভুক্ত চাল কল মালিক সরকারের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনও করেছেন। সে মোতাবেক জেলার সাতটি খাদ্য গুদামে চাল কেনা শুরুও হয়েছে। গত ২৬ জুন পর্যন্ত জেলায় ৭ হাজার ৫৩৮.৮০০ মেট্রিক টন চাল কেনা হলেও ধান কেনা শুরু হয়েছে শুধুমাত্র জয়পুরহাট সদর উপজেলার সরকারি গুদামে। জেলার মোট বরাদ্দ অনুযায়ী ৩৩৪ মেট্রিক টন ধান এ উপজেলার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কেনার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত ২০৬ মেট্রিক টন ধান কেনা হয়েছে পৌর আওয়ামীলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক ও চাতাল ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম জুয়েলের মাধ্যমে। আর ভুয়া কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের মাধ্যমে সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে ওই ধান ক্রয় দেখানো হয়েছে।
ধান বিক্রির তালিকায় নাম থাকা জয়পুরহাট সদরের ইছুয়া খারতা গ্রামের কৃষকদের সঙ্গে সরেজমিনে কথা বলে ধান বিক্রি নিয়ে প্রতারণার এ চিত্র পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত কৃষকরা জানেই না যে আগের বাতিল করা কৃষি সহায়তা কার্ড দেখিয়ে সরকারি গুদামে তাদের নামে ধান বিক্রি করা হয়েছে। যেসব কৃষকের নাম ব্যবহার করে ধান বিক্রি করা হয়েছে তাদের অধিকাংশই গরিব কৃষক। যারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে কোনও রকমে দিন যাপন করেন। ধান বিক্রি তো দূরের কথা চাষ করে সারা বছরের খোরাকও জোটে না তাদের। আর তাদের প্রতিজন কৃষকের নামে ধান বিক্রি দেখানো হয়েছে ৩ মেট্রিক টন করে।
খাদ্যগুদামে বিক্রির তালিকার নাম থাকা ইছুয়া খারতা গ্রামের জিয়ারুল ইসলাম জানান,তার নিজের কোনও জমি নেই। দুই বিঘা জমি বর্গা নিয়ে এবার বোরো চাষ করে ৫০ মণ ধান পেয়েছেন। যার মধ্যে ২০-২৫ মণ ধানের চাল করেছেন। আর বাকিটা ৪৫০-৫০০ টাকায় স্থানীয় বাজারে বিক্রি করেছেন। সরকারি গুদামে তিনি কোনও ধান বিক্রি করেননি।
ওই গ্রামের কৃষক মামুন ইসলাম জানান, মাত্র ৬৫ শতক জমি তার নিজস্ব। যা এবার চাষ না করে ইজারা দিয়েছেন। এ সময় তিনি কৃষি উপকরণ সহায়তার মূল কার্ড দেখিয়ে বলেন, বাতিল করা কার্ড স্থানীয় গ্রামপুলিশ নিয়ে নতুন এই কার্ডটি তাকে দিয়েছে। বাতিল কার্ডটি কোথা থেকে কিভাবে সংগ্রহ করে কে তার নামে ধান বিক্রি করেছে তা তিনি জানেন না।
শুধু মামুন নয় তালিকাভুক্ত ওই গ্রামের ১৪ জন কৃষকের মধ্যে ১১ জনের সঙ্গে কথা বলে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। একই অবস্থা পার্শবর্তী ইশ্বরপুর গ্রামের কৃষকদেরও। তারা জানেনই না তাদের নামে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির কথা।
জয়পুরহাট পৌর আওয়ামীলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক জহুরুল ইসলাম জুয়েল জানান, জয়পুরহাট সদর উপজেলায় ধান কেনার বরাদ্দ ৩৩৪ মেট্রিক টন। এই ধান সদরের ৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভায় ভাগ করলে সামান্য কয়েকজন কৃষক ধান বিক্রির সুযোগ পাবে। আওয়ামীলীগ বড় দল। এই সামান্য ধান কাকে বিক্রির সুযোগ দিবে আর কে ক্ষুব্ধ হবে! এই কথা বিবেচনা করে নেতাদের মধ্যে ভাগ করে ধান সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়। আর সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গুদামে তিনিই ধান সরবরাহ করছেন। সরবরাহ করা কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের বিষয়ে তিনি আরও জানান,ওই কার্ডগুলি সঠিক। বাতিল নয়। কার্ডগুলো তিনি কৃষকের কাছ থেকেই নিয়েছেন।
ধান বিক্রির তালিকাভুক্ত কৃষকদের কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের সংগৃহীত ফটোকপি দেখে জয়পুরহাট সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মতিয়র রহমান জানান,এই কার্ড ২০১৪ সালের জুন মাসের পূর্বেই বাতিল করা হয়েছে। ওই কার্ডে কৃষক সরকারি কোনও সহায়তা পাবে না। বাতিল হওয়ার পর কৃষকদের সরবরাহ করা যে কার্ডটিতে মুদ্রণ জুন: ২০১৪ লেখা আছে সেটিই বর্তমানে বৈধ কার্ড।
এদিকে জেলার ৫১১ জন চালকল মালিক চাল সরবরাহের জন্য সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। সাতটি গুদামে চালকল মালিকরা ৭ হাজার ৫৩৮.৮০০ মেট্রিক টন চাল সরবরাহ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন চালকল মালিক অভিযোগ করেন, এবারে ধানের দাম কম থাকায় আর সরকারি গুদামে চাল সরবরাহে লাভের অঙ্ক বেশি হওয়ায় তাতে অন্যায়ভাবে ভাগ বসাচ্ছেন জেলা খাদ্য অফিস। চুক্তি করতে চাল কলের প্রকারভেদে তাদের গুণতে হয়েছে এক থেকে দুই হাজার টাকা। আর গুদামে চাল সরবরাহ করতে গিয়ে দিতে হচ্ছে টন প্রতি সর্বনিম্ন ৫০ টাকারও অধিক। আপত্তি করলে চাল নিয়ে পড়তে হচ্ছে নানা হয়রানিতে।
জয়পুরহাট জেলা সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষকফ্রন্ট এর সংগঠক কৃষিবিদ ওবায়দুল্লাহ মুসা এবং জেলা কৃষক সমিতির নেতা দেওয়ান মো. বদিউজ্জামান অভিযোগ করে বলেন,‘জেলায় কৃষকের পরিবর্তে সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।’ আর কাগজে কলমে থাকছে কৃষকদের নাম। খাদ্য বিভাগের যোগসাজসে ক্ষমতাসীনরা এ ফায়দা লুটছেন দাবি করে তাঁরা প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহের আহবান জানান।
জয়পুরহাট সদর খাদ্য গুদামের সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় না করার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড দেখে প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকেই ধান ক্রয় কেনা হচ্ছে। বাতিল কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নীতিমালা মেনে তিনি ধান ক্রয় করছেন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ইকবাল বাহার চৌধুরী সব অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, সরকারি ক্রয় নীতি অনুযায়ী চাল এবং ধান জেলায় কেনা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে চালকল মালিকদের কাছ থেকে যথানিয়মে ৭ হাজার ৫৩৮.৮০০ মেট্রিক টন চাল কেনা হয়েছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় শুধুমাত্র জয়পুরহাট সদর উপজেলায় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ক্রয় করা হচ্ছে। কৃষকের কাছ থেকে ধান নেওয়া হচ্ছে না এমন অভিযোগ এখনও পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগের নেতারা ধান বিক্রি করছেন এমন অভিযোগ অস্বীকার করে জয়পুরহাট সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও দোগাছি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম বলেন, দলের কোনও নেতা নয় সরাসরি কৃষকরাই ধান বিক্রি করছেন। দলের নাম ব্যবহার করে কেউ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে দলই তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।