।। রিশিত খান ।। রাজন, পুরো নাম শেখ সামিউল আলম রাজন। গত ৮ জুলাই বুধবার সিলেট নগরীর কুমারগাঁওয়ে তথাকথিত চুরির অভিযোগে সামিউলকে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে মারা যায় সামিউল। তার লাশ গুম করার সময় পুলিশের হাতে আটক হয় মুহিত আলম।
শরীরের ৬৪ স্থানের আঘাত থেকে সৃষ্ট রক্তক্ষরণে সিলেট শহরতলির কুমারগাঁওয়ে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজনের (১৩) মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার প্রকাশিত ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এ কথা জানানো হয়েছে।
এতে তার দেহে ৬৪টি আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত হয়েছে। বুক, পেট, পা, মাথা, মুখমণ্ডল শরীরের এমন কোনো অংশ নেই, যেখানে আঘাত করা হয়নি। তার মাথায় আঁচড়ের চিহ্ন রয়েছে। এর মানে তার মাথায় ধারালো কিছু দিয়ে খোঁচানো হয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে শেষ মন্তব্য- মাথায় আঘাতে রক্তক্ষরণ হয়ে মারা গেছে সামিউল।
মামলার সদ্য নিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিলেট থানার পরিদর্শক আনোয়ার হোসেন জানান, দুপুরে শিশু রাজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পান তিনি। সেখানে রাজনের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ওই ৬৪টি আঘাতের কথা উল্লেখ আছে। সেই আঘাতের ফলে সৃষ্ট রক্তক্ষরণ থেকে রাজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।
নিহত সামিউল আলম রাজনের বাড়ি সিলেট নগরীর কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের পাশে কান্দিগাঁও ইউনিয়নের বাদেআলী গ্রামে। সামিউলের বাবা শেখ আজিজুর রহমান মাইক্রোবাস চালক। তার দুই ছেলের মধ্যে সামিউল বড়। অনন্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা সামিউল জীবিকার তাগিদে সবজি বিক্রি করত।
এদিকে নির্যাতনকারীরা শিশুটিকে নির্যাতনের চিত্র মোবাইল ফোনে ধারণ করে। ২৮ মিনিটের সেই ভিডিওচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চোর ‘অপবাদে’ শিশু রাজনকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর গত রোববার থেকে শুরু হয়েছে তোলপাড়। প্রায় ২৮ মিনিটের কিছু বেশি সময় ধরে চলা নির্যাতনের সেই দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে নির্যাতনকারীদেরই একজন, যা ওই ভিডিওর কথোপকথনে স্পষ্ট। গত ৮ জুলাই সকালে শিশুটিকে হত্যার পর লাশ গুম করার চেষ্টার সময় পুলিশ একজনকে গ্রেফতারও করে।
ইতিমধ্যে রাজন হত্যা মামলায় নির্যাতনকারী মুহিদ আলমের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার সকালে সিলেট মহানগর হাকিম আদালত-২-এর বিচারক ফারহানা ইয়াসমিন এই রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন।
সামিউল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জালালাবাদ থানার ওসি (তদন্ত) আলমগীর হোসেন জানান, রোববার মুহিদকে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছিল। তবে আদালত সোমবার রিমান্ড আবেদনের শুনানি নির্ধারণ করেন। শুনানি শেষে পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে নগরীর জালালাবাদ থানায় হত্যা মামলা করে। মামলায় আটক মুহিদ আলম (২২) ও তার ভাই কামরুল ইসলাম (২৪), তাদের সহযোগী আলী হায়দার ওরফে আলী (৩৪) ও চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়নাকে (৪৫) আসামি করা হয়েছে।
এদিকে রাজন হত্যার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। সোমবার সচিবালয়ে তিনি ওই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেছেন, সামিউল হত্যায় জড়িতরা ছাড় পাবে না।
সোমবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ দফতরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি হৃদয়বিদারক ও মর্মস্পর্শী। এ ঘটনায় একজনকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। আরো একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকিদেরও দ্রুত গ্রেফতার করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
ইতিমধ্যে রাজন হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তদন্তের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে মহানগর পুলিশ। কমিটিতে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ রহমত উল্লাহকে প্রধান করা হয়েছে।
কমিটির বাকি সদস্যরা হচ্ছেন ডিবি পুলিশের কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন, জালালাবাদ থানার এসি এস এম কামরুল ইসলাম, জালালাবাদ থানার ওসি আখতার হোসেন ও সেকেন্ড অফিসার মো. জাকির হোসেন।
সোমবার বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার রহমত উল্লাহ।
রাজনকে জনসমক্ষে নির্মমভাবে নির্যাতনের ভিডিওচিত্র প্রকাশ হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যতটা তোলপাড় দেখা গেছে, মাঠে তার বিন্দুমাত্র নজরে আসে না। স্থানীয় ও জাতীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের করণীয় নির্ধারণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করছেন খোদ মানবাধিকারকর্মীরাই।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, এ ঘটনা আমাদের তথাকথিত সুস্থ সমাজ ও উন্নত সভ্যতার মুখে কঠিন চপেটাঘাত, প্রহসন। মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেন চুপ, সেই জবাবদিহির জায়গা তৈরির সময় এসেছে।
ঘটনার দুই দিন পার হয়ে যাওয়ার পরও দেশের ছোট-বড় কোনো মানবাধিকার সংগঠনই এ নিয়ে কিছু বলেনি। এমনকি জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান খান আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্যও দেননি। একটি শিশুকে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা এবং সেই ভিডিও ইউটিউবসহ নানা যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়ে তারা চুপ করে আছে, এ নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরাও বিস্ময় প্রকাশ করছেন।
মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, এখানে কেবল মানবাধিকারের বিষয় না, শিশুদের নিয়ে যে এনজিওগুলো কাজ করে এ বিষয়টা দেখার কথা তাদেরও। তারা কেন এখনো শিশুটির পরিবারের নিরাপত্তার বিষয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন দিকগুলোতে নজর দেবে না? তিনি বলেন, একটি দরিদ্র কিশোরের মৃত্যু কোনোভাবে জাতীয় ইস্যু হয়ে যাবে, এটা হয়তো তারা ভাবেনি।
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে শিশুটির মামলায় সহায়তার কথা বলে সিলেটের বন্ধুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাজও শুরু করেন।
তিনি বলেন, মানবাধিকার সংস্থা বলে বাংলাদেশে কিছু আমার নজরে পড়েনি। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যে সংস্থা টুঁ শব্দ করে না, মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যানের দেখা মেলে না, তখন আসলেই মানবাধিকার নিয়ে কেউ কাজ করছে বলে মনে করি না।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রাজীব মীর বলেন, এ ঘটনা আমাদের তথাকথিত সুস্থ সমাজের মুখে কঠিন চপেটাঘাত। দেশে একটি শিশুকে আধাঘণ্টা ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো, জাকাতের নামে ২৭ জন খুন হলো, কেউ টুঁ শব্দ করে না।
নিপীড়ন ও হত্যার ধারণকৃত চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেবার এমন নিষ্ঠুরতার পেছনে সামাজিক কারণ কী? বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান বলেন, কলোনিয়াল লিগেসির প্রভাব ও মানুষের ভেতর ক্ষমতা দেখানোর মনোবৃত্তি থেকে এমন আচরণ প্রকাশ পায়।
জিয়াউর রহমান বলেন, এটা সামাজিকভাবে দীর্ঘদিন ধরেই আছে পোস্ট কলোনিয়াল সোসাইটিতে। আগ্রাসী বা ধ্বংস করার মনোবৃত্তি থেকে মানুষের মধ্যে এ আচরণ দেখা যায়। জনগণের ভেতর যে হতাশা বা উন্মাদনা থাকে, তার প্রভাবে এই আগ্রাসী আচরণ বেরিয়ে আসে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমনটা ঘটে। কিন্তু যে রাষ্ট্রে এসব আচরণ নিরুৎসাহিত করার কোনো প্রবণতা বা সিস্টেম থাকে না, সেখানে এসব আচরণ বেশি প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশের ঘটনাগুলো প্রসঙ্গে মি. রহমান বলেন, বাংলাদেশ এখন গ্লোবালাইজেশনের একটা ট্রানজিশনাল পিরিয়ড পার করছে। সুতরাং এখানকার অনেক মানুষ এইসব আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফেসবুক বা সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহারও ঠিকভাবে করতে জানে না বাংলাদেশের অনেক মানুষ। অনেকের আচরণে বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। তাই এমন একটি নিষ্ঠুর চিত্রও ফেইসবুকে তুলে দিতে অনেকের বাধে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারলে সামাজিক পরিবর্তনে সাহায্য করবে বলে মনে করেন জিয়াউর রহমান।
রাজন, তোমার মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে। আমাদের ক্ষমা করো, আমাদের ক্ষমা করে দাও রাজন।
লেখক : জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী