।। স্টালিন সরকার ।। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছিলেন সুস্থ মানুষ। প্রতিদিন দু’তিনটি সভা-সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। ৬ জানুয়ারি একটি আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের জন্য এসেছিলেন জাতীয় প্রেসক্লাবে। সেখানে পুলিশ তাকে ঘিরে ফেলে গ্রেফতারের জন্য। পুলিশী গ্রেফতার এড়াতে তিনি ক্লাবের চেয়ারে বসে রাত পার করেন। কিন্তু আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আর ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী নিচ্ছিদ্র পাহারা বসায় প্রেসক্লাবের চারপাশে। সরকার সমর্থিত সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ মির্জা ফখরুলকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে তৎপর হয় উঠেন। তারা মিছিল করেন ক্লাব চত্বরে। যেন জঙ্গী নেতা বাংলাভাই, শায়খ আবদুর রহমানকে গ্রেফতারের প্রস্তুতি চলছে। একসময় আল্টিমেটাম দেয়া হয়। সাংবাদিকরা সবসময় রাজনীতিকদের ‘ছায়া দিয়ে’ এবং ‘ছায়া নিয়ে’ এসেছে। জাতির বিবেক সাংবাদিকরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কোনো নেতাকে জোর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে বিশ্বে এমন কোনো নজীর নেই। বাংলাদেশেও এমন ঘটনা অতীতে ঘটেনি। বরং জাতীয় প্রেসক্লাব ‘বিপন্ন রাজনীতিকদের আশ্রয়-ভরসাস্থল’ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু সরকারি দল সমর্থিত কিছু সাংবাদিক বীরদর্পে (যারা বৈধ অবৈধ পন্থায় রাজউকের প্লট-ফ্লাটসহ সরকারি নানাবিধ সুবিধা নিয়েছেন) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। প্রেসক্লাব চত্বরে মির্জা ফখরুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার দৃশ্য দেশের মানুষ দেখেছে। কয়েকটি টিভি সরাসরি সচিত্র সে খবর প্রচার করেছে। যেন যুদ্ধে পরাজিত কোনো সৈনিককে কাছে পেয়ে জিঘাংসা মেটানো হচ্ছে। যে ফখরুল ইসলাম সুস্থ-সবল গ্রেফতার হন তিনি সাড়ে ৬ মাস কারাভোগের পর জামিনে বের হয়ে এলেন হুইল চেয়ারে। জাতীয় প্রেসক্লাবে মির্জা ফখরুলকে গ্রেফতারের সময় যেমন সচিত্র খবর বেসরকারি টিভিগুলো প্রচার করছে; তেমনি হাসপাতালের প্রিজন সেল (কারাগার) থেকে তার বের হয়ে আসার দৃশ্যও প্রকাশ করেছে। জনগণের ভোট আর ভাতের অধিকার আদায়ের আন্দোলন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। সে আন্দোলন করে গ্রেফতর হয়ে কারাগারে গেলেই কী হুইল চেয়ারে বের হতে হবে? অসুস্থ মির্জা ফখরুলের চিকিৎসার জন্য হাইকোর্ট জামিন দিয়েছে। তারপরও সে জামিন ‘আটকে’ দেয়ার সরকারের পক্ষে যে নির্লজ্জ চেষ্টা হয়েছে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পর আন্দোলনরত দলগুলোর হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেয়া হয়েছে। লাখ লাখ নেতাকর্মী গ্রেফতার এড়াতে পলাতক জীবনযাপন করছেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার হয়ে ‘কালাপানি, আন্দামান’ অন্তরীণ হওয়ার ভয়ে নেতারা মাসের পর মাস বছরের পর বছর আত্মগোপনে ছিলেন। দেশে আবার কী সেই পুরনো দিন ফিরে এলো? ১/১১ রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে মানুষ দেখেছে সংস্কার আর দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের নামে বিএনপি-আওয়ামী লীগের নেতাদের গ্রেফতারের পর জুলুম নির্যাতন চালিয়ে কিভাবে হুইল চেয়ারের সঙ্গী করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলকে যেভাবে হুইল চেয়ারে বসিয়ে কারাগার, হাসাপাতাল আর আদালতে আনা নেয়া হয়েছে সে হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে দেশের কোটি কোটি মানুষ চোখের পানি ফেলেছে। শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সমর্থক নয়; অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এমনকি সাধারণ মানুষও জটিল রোগে আক্রান্ত আবদুল জলিলকে ধানমন্ডির ল্যাব এইড হাসপাতাল থেকে বিমানবন্দরে নেয়ার দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা আবদুল জলিলকে স্বাধীন দেশে এমন পরিণতিতে পড়তে হবে কেউ সেটা কল্পনা করেনি। শুধু আবদুল জলিল নয়, বিএনপির নেতা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন খান আলমগীর, ওবায়দুল কাদের, বিএনপি নেতা আমানউল্লাহ আমান, তার স্ত্রী সাবেরা আমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পুত্র বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মরহুম আরাফাত রহমান কোকোকে কারাগার থেকে আদালতে হুইল চেয়ারে করে আনা নেয়ার দৃশ্য দেশের মানুষ দেখেছে। হুইল চেয়ার সঙ্গী হয়ে ব্যাংক শ্রমিক নেতা বাকির হোসেইনতো কারাগারেই মারা গেছেন। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সময় আবদুল জলিল, ফজলুল করিম সেলিমদের দিয়ে জোর করে বক্তব্য লিখে নেয়া হতো। নানা শর্ত ও বক্তবের অডিও ভিডিও চিত্র প্রচারও করা হতো। এখনো নাকি বিএনপির নেতাদের তেমনি নানা শর্ত দেয়া হচ্ছে। এটা কী ধরণের গণতন্ত্র? বন্দীদের কাছে দাসখত লিখে নিয়ে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজেদের মুখ বন্ধ রাখার কৌশল বৃটিশ-পাকিস্তান আমলে হয়েছে। যারা এসব করেছেন ইতিহাস বলে তারা কোনো সুফল পাননি।রাজনীতিকদের জন্য কারাগার হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। যে নেতা কারাভোগ করেননি তিনি রাজনীতির অনেক কিছু শেখা থেকে রয়েছেন বঞ্চিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর, মিজানুর রহমান চৌধুরী, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেক নেতা তাদের রাজনৈতিক জীবনের কারাগারের দিনলিপি লিখেছেন। কারাগারে তাদের সঙ্গে দায়িত্বশীলদের আচরণের বিবরণ তুলে ধরেছেন। বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র পরতে পরতে কারাজীবনের কথা, এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরের কাহিনী লিখেছেন। রাজবন্দীদের সঙ্গে কারারক্ষী, আইন-শৃংখলা বাহিনী ও সরকারের আচরণের বিবরণ তুলে ধরেছেন। কিন্তু ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আবদুল জলিলদের এবং বর্তমান সরকারের সময় ফখরুল ইসলাম আলমগীরদের যে ‘কারা পরিণতি’ হয়েছে বৃটিশ-পাকিস্তান আমলে এমন কল্পনাও করা যেত না। যারা রাজবন্দী তারা নিজেদের দুর্নীতি এবং অপকর্মের জন্য নয়; জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন, ভোটের অধিকারের আন্দোলনের কারণেই গ্রেফতার হন। রাজার সঙ্গে রাজা যেমন আচরণ করেন তাদের সঙ্গে তেমন আচরণই প্রত্যাশা করে মানুষ। কিন্তু বন্দী হলেই হুইল চেয়ার সঙ্গী হবে এমন পরিণতি কেউ প্রত্যাশা করে না। বাস্তবতা সেটাই হয়ে গেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে মানুষ ভোট দেয়নি-দিতে পারেনি। পরবর্তীতে তিন সিটি নির্বাচনে ভোটের নামে কী ভেল্কিবাজি হয়েছে দেশের মানুষ সেটা মিডিয়ার বদৌলতে দেখেছে। তাহলে হুইল চেয়ারের ভয়ে মানুষ কী গণতন্ত্র এবং ভোটের অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করবে না? সরকারের স্তবক কিছু বুদ্ধিজীবী ‘কম গণতন্ত্র বেশি উন্নয়ন’ যে আজগুবি থিউরি দিচ্ছেন সেটাই কী দেশের মানুষকে মেনে নিতে হবে? আন্দোলনের কারণে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে গেলেই রাজনীতিকদের হুইল চেয়ারকে সঙ্গী করতে হবে কেন? কারা আইনেই রয়েছে বন্দীদের কেউ অসুস্থ হলে তার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। সীমাবদ্ধতার কারণে সেটা সম্ভব না হলে জামিন দিয়ে হলেও চিকিৎসা করার সুযোগ দিতে হবে। নানান জটিল রোগে আক্রান্ত রাজবন্দীকে মাসের পর মাস আটকে রেখে হুইল চেয়ার ধরিয়ে দেয়া হবে এটা কেমন গণতন্ত্র? তাহলে কী বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন হুইল চেয়ারে চলে গেছে?