আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়েছিল প্রায় পনেরো বছর আগে- ২০০০ সালের ডিসেম্বরে। মাঝের এতগুলো বছরে দফায়-দফায় বৈঠক, বিতর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা আর মানচিত্রে হাজারো আঁকিবুকির পর আবার সেই গ্রুপের বৈঠক হবে ঢাকায়, এ সপ্তাহেই।
আর ধরে নেওয়া যায়, ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবারের সেই বৈঠকের পরই এই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের কাজ ফুরোবে। কারণ, বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে নতুন আন্তর্জাতিক সীমান্ত চূড়ান্ত হয়ে যাবে সেদিনের ওই বৈঠকেই। বৈঠকে মিয়ানমারের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
আসলে দু’দেশের মধ্যে সম্প্রতি যে স্থল সীমান্ত চুক্তি চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে, শুধু ছিটমহল বিনিময়ই তার একমাত্র লক্ষ্য নয়, সীমান্তের সোয়া ছয় কিলোমিটারের মতো যে অংশটি অচিহ্নিত, (আনডিমার্কেটেড) সেটিকে চিহ্নিত করা এবং দুদেশের অপদখলীয় জমিগুলোর মীমাংসা করাও ছিল এই চুক্তিরই অংশ। সৌভাগ্যবশত, ছিটমহলে জরিপের পাশাপাশি এই প্রক্রিয়াগুলোর বাস্তবায়নও চলেছে পুরোদমে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেকার আন্তর্জাতিক সীমানা নতুন করে এঁকে ফেলায় এখন আর কোনও বাধা নেই এবং সবচেয়ে বড় কথা, এই সীমানা দুটো দেশই মেনে নিচ্ছে।
যেমন ধরা যাক, মুহুরির চর আর চন্দননগর গ্রামের কথা। মুহুরি নদীর বুকে জেগে ওঠা চরের দখল নিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বিবাদ বহুদিনের। আবার অন্যদিকে ত্রিপুরার ধলাই জেলায় কমলপুরের চন্দননগর গ্রাম নিয়েও বিতর্ক বেশ পুরনো, বাংলাদেশ বলে থাকে ভারত অন্যায়ভাবে সেটা দখল করে রেখেছে। স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস হওয়ার পর এই পুরনো বিবাদগুলোর মীমাংসা হচ্ছে, বাংলাদেশ-ত্রিপুরা সীমান্তেও আর কোনও অপদখলীয় জমির অস্তিত্ব থাকছে না।
কীভাবে হচ্ছে এই কাজটা? গত সপ্তাহান্তেই যখন প্রায় গোটা বাংলাদেশ ঈদের আনন্দে মাতোয়ারা, তখন কিন্তু জনাকয়েক সরকারি কর্মকর্তার ছুটি মেলেনি। তারা ত্রিপুরায় এসেছিলেন এই অপদখলীয় জমির সমস্যা মীমাংসার কাজটা সরেজমিনে দেখতে। ত্রিপুরা সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে তারা বিতর্কিত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন, আর তৈরি করেছেন ২৩ জুলাই জয়েন্ট বাউন্ডারি ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের গ্রাউন্ডওয়ার্ক।
ত্রিপুরা সরকারের রাজস্বমন্ত্রী বাদল চৌধুরী এদিন বলছিলেন, ”চুক্তিতে যেমনটা আছে সেই অনুযায়ী ধলাই জেলার বিতর্কিত চন্দননগর গ্রামটা ভারতের দিকে পড়বে। আর তার বিনিময়ে দক্ষিণ ত্রিপুরায় বিলোনিয়ার কাছে যে ‘মুহুরির চর’ আছে, সেটা বাংলাদেশের ভূখণ্ড বলে গণ্য হবে। এটা এখন চূড়ান্ত, আর এর মাধ্যমে বহুবহু বছরের একটা সীমান্ত সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে।”
চন্দননগর গ্রামেও গত কদিন ধরে চলছে লাগাতার উৎসব। সীমান্তের এই ছোট্ট গ্রামটিতে জনা পঞ্চাশেক পরিবারের বাস, বড়জোর শ’তিনেক মানুষ থাকেন, প্রায় সবারই পেশা চাষবাস। তবে এতদিন তাদের বিরাট অশান্তি ছিল, দিনের বেলায় কাঁটাতারের বেড়ার অন্যদিকে গিয়ে চাষ করতে পারলেও ওই ফসল ঘরে ওঠাতে বিস্তর ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হতো তাদের।
এতদিনে সেই দুর্ভোগ ঘুচবে, এই আশাতেই বুক বাঁধছে চন্দননগর, ঠিক যেমন মুহুরির চরবাসীরাও নিশ্চিন্ত বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বুক ফুলিয়ে এখন চরের বুকে ফসল ফলাতে পারবে!
বিলোনিয়ার এই মুহুরি নদীতেই শুধু নয়, আন্তর্জাতিক সীমান্ত এখন সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে দাইখাটা-৫৬ আর লাঠিটিলা-ডুমাবাড়ি এলাকায়ও। ফলে যে তিনটে জায়গার ‘আনডিমার্কেটেড’ বর্ডার নিয়ে যুগ-যুগ ধরে অশান্তি চলে আসছিল, তার নিরসন হচ্ছে পাকাপাকি।
সীমান্ত নিরূপণের ক্ষেত্রে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, এমনকী ধর্মীয় অনুভূতিকে পর্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে দুদেশের সরকার। যেমন, পশ্চিমবঙ্গ-ঘেঁষা যে দক্ষিণ বেরুবাড়ি গ্রামটি রয়েছে, সেখানেই রয়েছে হিন্দুদের একটি পবিত্র তীর্থস্থান, যা সতীর একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম বলে ধরা হয়। ওই গ্রামের প্রায় পনেরো হাজার হিন্দুর ভাবাবেগকে মর্যাদা দিয়ে সেখানে সীমান্ত সেভাবেই আঁকা হয়েছে, যেন দক্ষিণ বেরুবাড়ি ভারতের মধ্যে পড়ে।
তেমনি বৌসমারিতেও, ঠিক কতটাকে ‘অপদখল’ বলা হবে, তা স্থির করতে পুরনো দলিল দস্তাবেজ ঘাঁটা হয়েছে যেমন, তেমনি অভিমত নেওয়া হয়েছে স্থানীয়দেরও।
পৃথিবীতে শেষবার কোনও আন্তর্জাতিক মানচিত্র নতুন করে আঁকা হয়েছিল, যখন চার বছর আগে সুদান ভেঙে তৈরি হয়েছিল নতুন দেশ দক্ষিণ সুদান। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে ক্রিমিয়া-সংকটটাকে যদি হিসাবের বাইরে রাখি, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে এই নতুন সীমান্ত আঁকাটাই হবে এরপরের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ সপ্তাহে দুদেশের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বিশেষজ্ঞরা তাই রচনা করতে যাচ্ছেন একটা নতুন ইতিহাস, সিলমোহর দিচ্ছেন দুদেশের নতুন মানচিত্রে!
বাংলা ট্রিবিউন