আগামীতে সংসদ নির্বাচনে আবারও ‘না’ ভোট চালু ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তারা। সেই সঙ্গে সমসংখ্যক ভোট পেলে লটারি প্রথা বাদ দিয়ে পুনঃভোট বিধান ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনের তালিকা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) এ ধরনের সংশোধনী আনতে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন সাংবিধানিক সংস্থাটির কাছে।
এর আগে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচনে ‘না’ ভোট ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিল। নবম সংসদ নির্বাচনের পর তা বাদ পড়ে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের সব নির্বাচনে সমসংখ্যক ভোট প্রাপ্তদের পুনঃভোটের বিধান থাকলেও সংসদে এখনো লটারি প্রথা রয়েছে। ইসি গত ১০ জুন আরপিও সংশোধনের বিষয়ে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে ইসির ইন্টারনাল সাইট ও ডাকযোগে মতামত পাঠাতে কর্মকর্তাদের চিঠি দেন উপ-সচিব আবদুল অদুদ। আরপিও সংশোধনে ইসি সচিবালয়, বিভাগীয় আঞ্চলিক কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তার কাছে প্রস্তাব পাঠাতে এ সময় বেঁধে দেয় ইসি। প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন নিজস্ব কর্মকর্তাদের প্রস্তাব সংগ্রহ করলেও নির্ধারিত সময়ে উল্লেখযোগ্য সাড়া পড়েনি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা এ সংক্রান্ত প্রস্তাব পাঠান। ইসি কর্মকর্তারা জানান, নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর আরও অন্তত ১০ জন কর্মকর্তা আরপিওর বিভিন্ন ধারায় সংশোধনে নানা ধরনের প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। এদিকে খুলনার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মজিবুর রহমান তার প্রস্তাবে ‘না’ ভোট চালু করতে বলেছেন। কোনো নির্বাচনী আসনে ৫০ শতাংশ ভোট না পড়লে পুনরায় ভোটের আয়োজন করারও সুপারিশ রাখা হয়েছে।
দুই বা ততোধিক প্রার্থী সমভোট পেলে বিদ্যমান লটারি প্রথা বাদ দিয়ে পুনঃভোটের প্রস্তাব দেন রাজশাহীর নির্বাচন কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সংজ্ঞায় অন্য বাহিনীর সঙ্গে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কেও অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করেন তিনি।
ভোলার নির্বাচন কর্মকর্তা প্রার্থী হতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বিদ্যমান এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনের বিধান বাদ দেওয়ার মতামত দেন। ভোটগ্রহণের সময় সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৩টা, সরকারি চাকুরেদের অবসর-পরবর্তী পাঁচ বছর পর ভোটে অংশ নেওয়ার বিধান করার প্রস্তাব রাখেন এই কর্মকর্তা। সিলেটের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এজহারুল হক ‘না’ ভোট চালুর প্রস্তাব রাখেন। নির্বাচনী ব্যয়ের রিটার্ন প্রার্থীরা যথাসময়ে না দিলেও তা কার্যকরে কঠোর উদ্যোগ নেওয়া, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া নিশ্চিতের সুপারিশও রাখেন তিনি। অনলাইনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা নেওয়ার বিধান চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব মইনুদ্দিন খান। এ কর্মকর্তার প্রস্তাবে বলা হয়, দেশের ভিতরে যে কোনো প্রার্থী যাতে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন ও তা গ্রহণ করার সুযোগ আরপিওতে রাখা যেতে পারে। তবে দেশের বাইরে থেকে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের অনলাইনে মনোনয়ন জমা নেওয়ার সুযোগ থাকবে কিনা তা বিবেচনার বিষয়।
খাগড়াছড়ি জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তার প্রস্তাবে বলেছেন, জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি সংশোধনীতে আনা যেতে পারে। বর্তমানে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আসছে কমিশন। মৌলভী বাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কোনো ধরনের প্রস্তাব না দিয়ে সংশোধনী প্রস্তাবের নির্ধারিত ফরম পাঠিয়ে দিয়েছেন। ১৯৭২ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ প্রণয়নের পর এ পর্যন্ত ১১বার সংশোধনী এসেছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনুচ্ছেদে অন্তত ২০৯টি বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে।
২০০৭ সালে ড. এ টি এম শামসুল হুদার ইসি সংলাপ করে আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। নবম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত তারা কয়েকবার সংলাপও করে। তবে দশম সংসদের সময়ে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন আর সংলাপ করতে পারেনি। বর্তমানে ইসির নিবন্ধিত ৪০টি দল রয়েছে। এর আগে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের মতামত না নিয়ে বর্তমান ইসি একদফা আরপিও সংশোধন আনে।