সিসি ডেস্ক: অর্থের প্রভাব আর রাজনৈতিক চাপে শিক্ষা বোর্ডগুলো একের পর এক নতুন কলেজ অনুমোদন দিচ্ছে। নামসর্বস্ব এসব কলেজের প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও থাকে গোপনীয়। উচ্চ মাধ্যমিকে উন্মুক্ত ভর্তি পদ্ধতি না থাকায় এ বছর বিপাকে পড়েছে এমন শত-শত কলেজ। সেগুলোয় ভর্তির কোনো আগ্রহ ছিল না শিক্ষার্থীদের। পছন্দের তালিকায় স্থান না হওয়ায় শিক্ষার্থী শূন্যতায় এসব কলেজের কার্যক্রম বন্ধের উপক্রম।
জানা গেছে, নিজেদের অনুমোদন দেওয়া কলেজ নিয়ে বিপাকে পড়েছে ঢাকা বোর্ড। অন্তত ৩০০টি কলেজ আছে, যেগুলোতে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ নেই। এমন কলেজও আছে যেগুলোকে এবার অনলাইন ও এসএমএস আবেদনে মাত্র চার-পাঁচ শিক্ষার্থী পছন্দের তালিকায় প্রথম স্থানে রেখেছে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, ঢাকা বোর্ডের ১ হাজার ২০৫টি কলেজে আসন রয়েছে প্রায় ৪ লাখ ৬০ হাজার। ঢাকা বোর্ডে অনলাইনে ও এসএমএসের মাধ্যমে আবেদন করেছে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৩৪ জন। এ হিসাবে শুধু ঢাকা বোর্ডেই শূন্য থাকবে ৮৭ হাজার ১৬৬টি আসন। শূন্য আসনের বেশিরভাগই নতুন অনুমোদন পাওয়া ২৫০-৩০০টি কলেজ। আর দেশের ১০টি শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১২ লাখ ৮৪ হাজার ৬১৮ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখ ৭৬ হাজার ১০৭ জন (চতুর্থ তালিকাসহ) ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া কারিগরিতে ৩০ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। দেখা যাচ্ছে, এসএসসিতে পাস করা ১ লাখ ৬ হাজার ৫১১ জন এখনো ভর্তির জন্য আবেদন করেনি। সারা দেশের ৩ হাজার ৭৫৭টি কলেজে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ আসন রয়েছে। সেই হিসাবে এবার একাদশ শ্রেণিতে প্রায় আড়াই লাখ আসন শূন্য থাকবে। তবে শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে সরকারি কলেজগুলো। এ ছাড়া শহরকেন্দ্রিক কিছু পুরনো বেসরকারি কলেজও ছিল পছন্দের তালিকায়।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, এ বছর একাদশ শ্রেণিতে ২ লক্ষাধিক আসন শূন্য থাকবে। অনেক কলেজ শিক্ষার্থী পাবে না। অনেক শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে পারে না অনলাইন ভর্তি পদ্ধতিতে। যার কারণে ভর্তির শেষ সময়ে এসে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কলেজে উন্মুক্ত ভর্তির নির্দেশনা দিয়েছে। তবে আসন খালি থাকা সাপেক্ষে যে কেউ যে কোনো কলেজেই ভর্তি হতে পারবে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ফাঁকা আসনের বিষয়ে জানতে শিক্ষার্থীরা বোর্ডগুলোতে যোগাযোগ করতে পারে। ঢাকা বোর্ডের ১৪টি কলেজ আছে, যেখানে একজন শিক্ষার্থীও ভর্তি হয়নি। তবে কলেজ অনুমোদন নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে, প্রতিটি কলেজে প্রতি শিক্ষাবর্ষে প্রতিটি বিভাগে কমপক্ষে ২৫ শিক্ষার্থী থাকতে হবে। নইলে বোর্ড কর্তৃপক্ষ ওই কলেজের অনুমোদন বা স্বীকৃতি বাতিল করতে পারে।
এ বিষয়ে এ বছরের ভর্তিশূন্য কিংবা ২৫ শিক্ষার্থীর কম ভর্তি করা কলেজের বিষয়ে ঢাকা বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবার ২৫০ থেকে ৩০০টি কলেজ অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তবে যেগুলোয় ডিগ্রি বা অনার্স কোর্স চালু রয়েছে, সেগুলো পার পেলেও এক-তৃতীয়াংশ কলেজের অনুমোদনও বাতিল হয়ে যেতে পারে।
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন শুরুর পর প্রায় প্রতিটি কলেজই নানা উপায়ে শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি কাড়ার চেষ্টা করছে। কেউ কেউ হেল্পলাইন ডেস্ক খুলে অনলাইনে আবেদন করতে সহায়তা দেয়। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে বাধ্য করতে না জানিয়ে অনলাইন আবেদনও পূরণ করে দিয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের আবেদন সরাসরি বোর্ডে জমা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যেসব কলেজ এভাবে শিক্ষার্থীদের না জানিয়ে নিজ কলেজের নামে আবেদন পূরণ করেছে, তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক ড. মো. আশফাকুস সালেহীন বলেন, এ বছর ভর্তি পদ্ধতির কারণে অনেক কলেজই আসন সংখ্যা পূর্ণ করতে পারছে না। তবে এবার যেহেতু প্রথমবারের মতো অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম চালু হয়েছে, তাই এসব কলেজে কীভাবে শিক্ষার্থী বাড়ানো যায়, সে ব্যবস্থা নিতে বলব। আর কারা কতজন শিক্ষার্থী পেল, ভর্তি শেষ হওয়ার পরই তা বের করা হবে। তিনি বলেন, এবার গ্রামের কলেজগুলোই কম শিক্ষার্থী পাচ্ছে বলে দেখা যাচ্ছে। যত্রতত্র আমাদের আর কলেজের খুব একটা প্রয়োজন নেই। তবে দুর্গম এলাকাগুলোয় শিক্ষার্থী সংখ্যা কম হলেও অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
কলেজ অনুমোদনে সংশ্লিষ্টরা জানান, বেশিরভাগ কলেজ অনুমোদনেই রাজনৈতিক সুপারিশ থাকে। একই এলাকায় একটি কলেজ থাকার পরও আরেকটি কলেজের অনুমোদন চাওয়া হয়। সংসদ সদস্যরা ডিও লেটার পাঠান। তাই প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আমাদের অনুমোদন দিতে হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, তিন ধরনের কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়। এগুলো হলো- স্কুলের সঙ্গে সংযুক্ত কলেজ, শুধু কলেজ এবং যারা ৩০০ টাকার বন্ডে লিখিত দিয়ে জানায় কখনোই তারা এমপিওভুক্তি নেবে না, এমন কলেজ। এমপিওভুক্তি নেবে না, এমন কলেজ পরিদর্শনের মাধ্যমে অনুমোদন দেয় ঢাকা বোর্ড। বাকি কলেজগুলোর ক্ষেত্রে অনুমোদনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর বোর্ড অনুমোদন দেয়।