সিসি ডেস্ক: বাংলাদেশে গম আমদানির বিদ্যমান যে সংজ্ঞা বা স্পেসিফিকেশন রয়েছে তাতে নিম্নমানের গম আমদানির সুযোগ রয়েছে। সংজ্ঞার দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই সম্প্রতি ব্রাজিল থেকে নষ্ট গম আমদানি করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড়ের পর অবশেষে সরকার গম আমদানির নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালাটি প্রায় পাঁচ যুগ আগের। সেটি পরবর্তনে ইতিমধ্যে খাদ্য অধিদপ্তর নতুন নীতিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে। খসড়া প্রস্তাবটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তা চূড়ান্ত করতে আজ বুধবার সচিবালয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মুশফেকা ইকফাতের সভাপতিত্বে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কিছুটা কাটছাঁট করে অধিদপ্তরের প্রস্তুত করা খসড়া নীতিমালাটিই চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশ থেকে আর পচা গম আমদানির সুযোগ থাকবে না। খাদ্য মন্ত্রণালয় ছাড়াও খসড়া প্রস্তাবটি স্বরাষ্ট্র, বাণিজ্য, অর্থ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিল্প, কৃষি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং বিশেষজ্ঞদের কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে গম আমদানির যেসব শর্ত রয়েছে, তাতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্ট্যান্ডার্ড বা আদর্শমানের বিচারে চতুর্থ গ্রেডের গম আনা হয়।
ফলে আমদানিকারকরা কম দামে নিম্নমানের গমই আমদানি করে থাকেন। গম আমদানির দুর্বল সংজ্ঞার কারণে এত দিন নিম্নমানের গম আমদানির সুযোগ নিয়েছেন আমদানিকারকরা।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকার এই প্রথমবারের মতো গম আমদানিতে কঠিন শর্ত আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রস্তাবিত শর্ত অনুযায়ী এখন বিদেশ থেকে আমদানি করা গমের আপেক্ষিক ওজন (টেস্ট ওয়েট) থাকতে হবে কমপক্ষে ৭৫ কেজি। প্রোটিন মানও থাকতে হবে কমপক্ষে সাড়ে ১২ শতাংশ। ক্ষতিগ্রস্ত দানা থাকতে পারবে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ, আর অন্য জাতের গমের মিশেল থাকতে পারবে ৫ শতাংশ। এর ব্যতিক্রম হলে আমদানি করা কোনো গম গ্রহণ করা যাবে না। বিদেশ থেকে ভালো গম আমদানি করতেই এমন কঠিন শর্ত আরোপ করে বিদ্যমান সংজ্ঞা পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারা জানান, ব্রাজিল থেকে খাওয়ার অনুপযোগী গম আমদানি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে উন্নতমানের গম আমদানি নিশ্চিত করতেই নতুন নীতিমালার খসড়া তৈরি করেছে খাদ্য অধিদপ্তর। বিদ্যমান নীতিমালার ৯টি প্যারামিটারের ছয়টিতেই পরিবর্তন এনে খসড়ায় নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবটি আজ খাদ্যসচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদনের পর সেটি ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এর পরই প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। খাদ্য অধিদপ্তরের পাঠানো নতুন নীতিমালার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক কোটেশনের মাধ্যমে বিদ্যমান সংজ্ঞা মোতাবেক ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ প্রোটিন মাত্রার গম আমদানির জন্য কোটেশন আহ্বান করে থাকে। চলতি অর্থবছরের গম সরবরাহের জন্য চুক্তি সম্পাদনকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সরবরাহকৃত গমের আকৃতি ও বর্ণ নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে উন্নতমানের গম আমদানির লক্ষ্যে বিদ্যমান নীতিমালার প্যারামিটারগুলোতে যুক্তিসংগত মান আনা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) স্বীকৃত স্ট্যান্ডার্ড বা আদর্শমান অনুযায়ী গম আমদানির শর্ত ও স্পেসিফিকেশন পুর্ন নির্ধারণের সুপারিশ করা হলো।
জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মুশফেকা ইকফাৎ বলেন, বিদেশ থেকে ভালো জাতের আরো উন্নতমানের গম আমদানি নিশ্চিত করতে গমের স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করে কঠিন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে চলতি অর্থবছর থেকেই বিদেশ থেকে উন্নতমানের গম আমদানি করা সম্ভব হবে। নতুন স্পেসিফিকেশন কার্যকর হলে গমের মান নিয়ে আর প্রশ্নও উঠবে না।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আতাউর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত স্পেসিফিকেশন কার্যকর হলে উন্নতমানের ভালো গমই পাওয়া যাবে। উল্লিখিত শর্তগুলো প্রয়োগ করা গেলে উন্নতমানের গম কেনা সম্ভব। সে ক্ষেত্রে পচা বা নিম্নমানের গম আমদানির কোনো সুযোগ থাকবে না। আজ বুধবার এ বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে আলোচনা-পর্যালোচনা হবে। প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হবে। এর পরই নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে।
নতুন শর্তে যা বলা আছে : বর্তমান গম আমদানির শর্ত অনুযায়ী গমের আপেক্ষিক ওজন বা পুরুত্ব ৭৫ কেজি পার হেক্টো লিটার থাকার বিধান রয়েছে। অর্থাৎ ১০০ লিটার সিলিন্ডারে গম ভর্তি করা হলে সেই গমের ওজন হবে ৭৫ কেজি। কিন্তু এই টেস্ট ওয়েট ৭২ কেজি হলেও গ্রহণ করা হয়। নতুন স্পেসিফিকেশনে গমের আপেক্ষিক ওজন ৭৬ কেজি পার হেক্টো লিটার করার সুপারিশ করা হয়েছে। ৭৫ কেজির নিচে হলে সেই গম গ্রহণ না করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালায় আমদানি করা গমে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত দানা থাকলেও তা গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবিত স্পেসিফিকেশনে গমে ৩ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত দানা থাকতে পারবে বলে সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমান নীতিমালায় গমে ভাঙা দানা ৮ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়। নতুন আমদানি শর্তে ভাঙা দানার স্ট্যান্ডার্ড ৪ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ভাঙা দানার পরিমাণ ৫ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। ভালো গমের সঙ্গে অন্য জাতের গমের মিশেল ৫ শতাংশ পর্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড হলেও বাংলাদেশে তা গ্রহণ করা হয় ১০ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন স্পেসিফিকেশনে তা ৪ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। গমে প্রোটিনের আদর্শমান ১০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা সাড়ে ৯ শতাংশও গ্রহণ করা হয়। নতুন স্পেসিফিকেশনে সর্বনিম্ন প্রোটিনের মান সাড়ে ১২ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া আমদানি করা গমে পাথর, কঙ্কর বা অন্যান্য দ্রব্য সর্বোচ্চ ১.৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়। প্রস্তাবিত স্পেসিফিকেশনে গমে তা কমিয়ে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শুধু আমদানি নীতিমালার পরিবর্তন করলেই হবে না। আগে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সবাইকে দেশের জন্য নিবেদিত, দুনীর্তিমুক্ত সৎ হতে হবে।