।। জিয়া হাসান ।। মাসখানেক আগে, নিউ ইয়র্ক টাইমসের একটা লেখা দেখি, বার্মিংহামে, আল কোরআনের একটা কপি পাওয়া গেছে এবং কার্বন ডেটিং করে জানা গেছে আল কোরআনের এই কপিটা রাসূল মুহাম্মাদ (সা.)-এর ওফাতের ২০ থেকে ৩০ বছর পরে লিখিত। এবং যারা লিখেছেন, তারা খুব সম্ভবদ রাসূল (সা.)-এর আমলে জীবিত ছিলেন।
একটু অবাক হইছিলাম যে, ক্যামনে কি ?
আল কোরআনের কপি পাওয়া যাইতাছে বার্মিংহামে? কেন জানি মনে হইছিল, এখন এইটা মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরদেরকে নিলাম করা হবে।
কিন্তু, আজকে দেখা যাচ্ছে ঘটনা আরও জটিল।
আজকে,সেই একই আল কোরআনের কপি আবার নিউজে আসছে যে, কার্বন ডেটিং করে পাওয়া গেছে , এই কপিটা আসলে রাসূল (সা.)-এর জন্মের আগে লিখিত। এই নিউজটা নিয়ে প্রাশ্চাত্যের মিডিয়া আউটলেট গুলোতে ব্যাপক প্রোপাগান্ডা শুরু হয়ে গেছে যে, আল কোরআন রাসূলের (সা.) জন্মের আগেই কেউ লিখে রেখেছিল। পরবর্তীতে, লেখা গুলো কপি করা হয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধের পরে, পশ্চিমের ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিকে টিকায় রাখতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ দখলের জন্যে ওয়ার অন টেরর প্রথমে টার্গেট ছিল মুসলমানেরা, তারপরের টার্গেট ছিল ইসলামের রাসূল মুহাম্মাদ (সা.), এখন তাদের টার্গেট আল কোরআন।
যুদ্ধের সময়ে প্রোপাগান্ডা দিয়ে শত্রু পক্ষের আদর্শকে কিভাবে, ডিলিজিটিমাইজ করতে হয়, তার যেই থিওরি আছে, সেই থিওরির সূত্রমতে এখন শেষ ধাপের বাস্তবায়ন চলছে। এরপরে মুসলমানদের ডিহিউমানাইজ প্রসেস কমপ্লিট হয়ে যাওয়ার পরে, তাদেরকে এনিহিলেট করা হবে।
জাস্ট ওয়েট এন্ড সি।
এই কার্বন ডেটিং আরগুমেন্টের বিরুদ্ধে জাস্ট দুইটা আরগুমেন্ট দেব-
১. রাসূলের জীবনের অনেকগুলো ঘটনার রেফারেন্সে বিভিন্ন আয়াত নাজেল হয়েছে। সুরা আল আহযাবে, সাহাবি জায়েদ বিন হারেস (রা.)- এর রেফারেন্স আছে তেমনি সুরা লাহাবে, আছে রাসূলের চাচা আবু লাহাবের রেফারেন্স।
কার্বন ডেটিং মতে, প্রাপ্ত আল কোরআনটি যদি রাসূলের (সা.) জন্মের আগে লিখিত হয়ে থাকে তবে, কিভাবে রাসূলের জীবনের ঘটনা এবং সাহাঈদের নাম, এই আল কোরআনে আসবে ?
২. এইটা সকলেই জানেন, এখন আমরা যেই ফর্মে আল কোরআন পড়ি, সেই সিরিয়ালে আয়াত গুলো নাজেল হয় নাই। কারণ, আল কোরআনের অনেকগুলো আয়াত নাজিল হয়েছিল, রাসূলের জীবনে বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে। যেই ঘটনা, ঘটনাগুলোর রেফারেন্স, কেন কি অবস্থায় ওই আয়াত নাজিল হয়েছে, তার ডিটেলস বর্ণনা আছে, যেই গুলো নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। আল কোরআনের লিখিত যে ফর্মটা আমরা পড়ি, তার সিরিয়ালটা পরবর্তীতে নির্ধারণ করা হয়েছে।
তাইলে প্রশ্ন, রাসূলের জীবনের পূর্বে লিখিত একটা কপিতে কিভাবে এই সিরিয়াল আসবে ?
একটা জিনিশ আবার বলি। ইসলামকে নিয়ে একটা নোংরা পলিটিক্স শুরু হয়েছে। এই পলিটিক্স, মুসলমানদেকে মেরে তাদেরকেই সন্ত্রাসী বানায়। যেই শান্তির ধর্মে কারণে, ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে অনেক নির্যাতিত জনগোষ্ঠী, ইসলামের ছায়াতলে এসেছে সেই ইসলামকে এখন দায়েশের মাধ্যমে একটা রক্তপিপাসু জনগোষ্ঠীর ধর্ম হিসেবে দেখানো হচ্ছে। যেই পাল্মিরার পুরা কীর্তি, ১৫০০ বছর ইসলামিক জনগোষ্ঠীর সাথে ছিল সেইগুলোকে ধ্বংস করা, রেপ করা, জলন্ত পুড়িয়ে মারা হতে শুরু করে হেন কাজ নাই-আজকে ইসলামের নামে করা হচ্ছে না । যা শুধু মাত্র, এই প্রপাগান্ডাটাকে পুষ্ট করছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নাজেল হওয়া কিছু আয়াত দিয়ে, ইসলামকে দেখানো হচ্ছে অমানবিক রক্তপাত আর হত্যার ধর্ম হিসেবে।
পৃথিবীতে সকল ধরমের ইতিহাসে, সেই ধরমের অনুসারীদের ক্ষমতার জন্যে যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস আছে। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষেত্রে, সেই দায় চাপান হচ্ছে ইসলামের উপরে।
যেই রাসূল শান্তির বার্তা দিয়ে সাড়া বিশ্বে ১৩০ কোটি মানুষের মনে ঠাই নিয়েছেন তাকে ইচ্ছা মত চরিত্র হনন করা হচ্ছে শুধু মাত্র, মিডিয়ার উপরে দখলের কারণে।
এর সব কিছুই একটা পরিকল্পনার অংশ। স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে, প্রাশ্চাত্যের ডিফেনস ইন্ডাস্ট্রিকে পুষ্ট করার জন্যে একটা শত্রু দরকার ছিল, মুসলমানদের এবং ইসলামকে সেই শত্রু বানানো হয়েছে। ৭০ এর দশকে, ৮০ এর দশকে যাদেরকে আমেরিকা পেলে পুষে বড় করেছে, তাদেরকেই ৯০ এর পরে আমেরিকা ভিলেন বানিয়ে- বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
এমনকি এই একনায়কগুলো কেউই, ল্যাটিন আমেরিকার বা আফ্রিকার বা পূর্ব এশিয়ার এক নায়কদের থেকে কম বেশী ভিলেনিক ছিল না। কিন্তু, এই এক নায়কদের রেফারেন্সে ইসলামকে দেখানো হচ্ছে, অশান্তি আর রক্তপাতের ধর্ম হিসেবে।
ধর্ম নিয়ে আমি লিখি না। কিন্তু, আজকের এই নিউজটার একটা জিওপলিটিকাল স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব আছে, তাই বিষয়টা নিয়ে লিখলাম।
একটা পুরাতন কোরআন আবিষ্কার তাকে, প্রথমে তাকে মুহাম্মদ (সা.) এর ওফাতের ২০ থেকে ৩০ বছর পরের বই ঘোষণা দিয়ে, সেইটার গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করিয়ে, তার দুই সপ্তাহ পরে তাকে রাসূলের জন্মের পূর্বের বই ঘোষণা দেয়ার যে মোজেজা- তাকে ওয়ার অন টেররের প্রোপাগান্ডায় মুসলমানদেরকে ডিহিউমানাইজ করার প্রক্রিয়ার একটা নতুন ধাপ হিসেবেই দেখতে হবে।
ফেসবুক থেকে নেয়া