• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৬ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

সাকা-মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর

Mujahid-Sakaসিসি ডেস্ক: একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকর করা হয়েছে।

শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ৪৫ মিনিটে প্রথমে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং পরে মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আইজি প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন।

এরা দু’জনেই রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলেন বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছিলেন এবং সে আবেদন নাকচও করে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে প্রাণভিক্ষা চাননি- সর্বশেষ সাক্ষাতে পরিবারের কাছে এটাই বলেছেন তারা।

ফাঁসি কার্যকরের পর নিয়মিত আনুষ্ঠানিকতা সেরে তাদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হবে। পুলিশ ও র‍্যাবের বেশ কয়েকটি গাড়ি নিরাপত্তার জন্য মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স দুটির সঙ্গে পাঠানো হবে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে যথাক্রমে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মুজাহিদের রায় কার্যকর করা হলো।

এর আগে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটের দিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন ঢাকা জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া। তার আগে কারাগারে যান আইজি (প্রিজন) সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, অতিরিক্ত আইজি (প্রিজন) কবির হোসেন ও ডিআইজি (প্রিজন) গোলাম হায়দার। জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী আগে থেকেই কারাগারের ভেতরে ছিলেন বলে জানা যায়।

জল্লাদ
সাত জন জল্লাদ তাদের ফাঁসি কার্যকর করেছেন। এরা হলেন- ইকবাল, মাসুদ, আবুল, মোক্তার, রাজু, শাহজাহান ও হযরত। এসব জল্লাদ বিভিন্ন সময় ফাঁসি আসামিদের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করেন। এদের মধ্যে শাহজাহান ও রাজু যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা ও কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরে অংশ নিয়েছিলেন।

অ্যাম্বুলেন্স
রাত ১২টা ৩১ মিনিটে লাশ বহন করে এমন চারটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স কারাগারের সামনে এনে রাখা হয়। ১২টা ৩৮ মিনিটে  অ্যাম্বুলেন্সগুলো কারাগারে প্রবেশ করে।

স্বজনদের সাক্ষাৎ
সর্বশেষ শনিবার রাত সাড়ে ৯টায় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে শেষ দেখা করতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন তার স্বজনেরা। সোয়া এক ঘণ্টা পর তারা কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ ১৮ জন স্বজন তার সঙ্গে দেখা করেন।

রাত ১০টা ২৫ মিনিটে আলী আহসান মুজাহিদের সঙ্গে শেষ দেখা করতে কারাগারে প্রবেশ করেন স্বজনরা। তারা ঘণ্টা পর বের হন। স্ত্রী ও ছেলেসহ ৮ জন স্বজন তার সঙ্গে দেখা করেন।

মুজাহিদের বিরুদ্ধে ৭ অভিযোগ

২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মুজাহিদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়েছিলেন। ওই রায় চ্যালেঞ্জ করে মুজাহিদের আইনজীবীরা সর্বোচ্চ আদালতে গেলে সর্বোচ্চ আদালতও ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রাখেন। তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাতটির মধ্যে পাঁচটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ওই দণ্ড কার্যকর করার আদেশ দিয়েছিল বিচারিক আদালত।

একই রায় এসেছিল সপ্তম অভিযোগে, ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা-নিযার্তনের ঘটনায়। আপিল বিভাগের রায়ে প্রথম অভিযোগে আসামির আপিল মঞ্জুর করে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। সপ্তম অভিযোগে তার সাজা কমিয়ে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

আর ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত।

পঞ্চম অভিযোগে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা যাদ্ধা জহিরউদ্দিন জালাল ওরফে বিচ্ছু জালাল, শহীদজননী জাহানারা ইমামের ছেলে শাফি ইমাম রুমি, বদিউজ্জামান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল ও মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটকে রেখে নির্যাতন এবং জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার জন্য ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদকে দেয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আপিল বিভাগের রায়ে সেই সাজাই বহাল রাখা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের রায়ে তৃতীয় অভিযোগে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুরের রণজিৎ নাথকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয় মুজাহিদকে। ওই সাজা তার প্রাপ্য বলে আপিল বিভাগও মনে করেছে। এছাড়া দ্বিতীয় অভিযোগে ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে হিন্দু গ্রামে গণহত্যা এবং চতুর্থ অভিযোগে আলফাডাঙ্গার আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে আটকে রেখে নির্যাতনের ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলেও তাতে মুজাহিদের সংশ্লিষ্টতা প্রসিকিউশন প্রমাণ করতে না পারায় ট্রাইব্যুনাল মুজাহিদকে খালাস দিয়েছিল। এ কারণে এ দুটি অভিযোগ আপিল বিভাগের রায়ে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে করা একটি মামলায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী মুজাহিদকে ২০১০ সালের ২৯ জুন গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে।

সাকা চৌধুরী

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতেই ঝুলতে হলো বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে।

এক সময়ের প্রবল প্রতাপশালী এই সাংসদ যিনি নিজেকে সব সময়ই মনে করতেন আইনের ঊর্ধ্বে, ফাঁসির মধ্যদিয়ে তার সব দম্ভ চূর্ণ হলো। দেশের এই শীর্ষ মানবতাবিরোধীর ফাঁসি কার্যকর করার মধ্যদিয়ে কিছুটা দায়মুক্ত হলো বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে চার দশকের বেশি সময় আগে চট্টগ্রামে রাউজানে যেসব মুক্তিযোদ্ধা ও সংখ্যালঘু সাকা চৌধুরীর হত্যা, অত্যাচার, নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তাদের ক্ষোভ সামান্য হলেও প্রশমিত হলো।

গত বুধবার আপিল বিভাগ সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। আর ওই রায়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়ে যায় আইনি লড়াই।

রিভিউ খারিজ হওয়ার পর প্রাণভিক্ষাই ছিল সাকা চৌধুরীর একমাত্র পথ। কিন্তু প্রাণভিক্ষা নিয়ে সাকা চৌধুরী টালবাহানা করতে থাকেন। আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি ক্ষমা চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান। তবে সেই সুযোগ তিনি পাননি।

আজ দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট কারাগারে সালাউদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রাণ ভিক্ষার ব্যাপারে জানতে চান। পরে সালাউদ্দিন রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন।

প্রাণভিক্ষার সেই আবেদন প্রথম যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতামত দেয়ার পর নথি যায় আইনমন্ত্রীর কাছে। আইনমন্ত্রীও মতামত দেয়ার পর প্রাণভিক্ষার ফাইল নিয়ে যাওয়া হয় রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের। রাত ৯টার দিকে আইনসচিব বেরিয়ে আসেন রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে। রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করার পরই শুরু হয় দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া।

ডাকা হয় তার পরিবারের সদস্যরা। রাত রাড়ে ৯টার দিকে মূল ফটক দিয়ে তাদের কারাগারে প্রবেশ করানো হয়। শেষ দেখার পর রাত ১০টা ৫০ মিনিটে তারা কারাগার থেকে বের হয়ে যান। এ সময় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, ‘এ সরকার যেহেতু বাবাকে নির্বাচনে হারাতে পারেনি তাই একটু পরে হয়তো তার জানটা কেড়ে নেবে।’

তিনি বলেন, ‘প্রাণভিক্ষার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাবা (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) আমাদের বলেছেন- এই বাজে কথা (প্রাণভিক্ষা) তোমাদেরকে কে বলেছে?’

উল্লেখ্য, ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার পর ২০১৩ সালের ২৯ অক্টোবর রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন সাকার আইনজীবীরা। আপিল আবেদনে মোট ১ হাজার ৩২৩ পৃষ্ঠার নথিপত্রে বিভিন্ন ডকুমেন্টসহ ২৭টি গ্রাউন্ড ছিল।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

বিএনপির এই নেতার বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ২৩টি অভিযোগের মধ্যে চারটিতে (অভিযোগ নং- ৩, ৫, ৬ ও ৮) তাকে ওই শাস্তি দেয়া হয়। এছাড়া তিনটি (অভিযোগ নং- ২, ৪ ও ৭) অভিযোগে তাকে ২০ বছরের ও দুটি (অভিযোগ নং- ১৭ ও ১৮) অভিযোগে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই বছরের ১৮ নভেম্বর ওই অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ২৩টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ