সিসি ডেস্ক: দলীয় ব্যানারে ও প্রতীকে অনুষ্ঠিতব্য স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে প্রবল আগ্রহ-উদ্দীপনা। তবে, এ নিয়ে বিপরীত দৃশ্য দেখা দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের মধ্যে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষা হবে কি না, এই নিয়ে সংশয়ের মধ্যে রয়েছেন সরকারবিরোধী জোটটির নেতারা। তাদের সামনে এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটাই। তাহলো, আদৌ পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সরকার লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড দেবে কি না? একইসঙ্গে ভোটের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে, নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলীয় প্রতীকে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন অনেকটাই অসম্ভব। এ কারণে ছোট রাজনৈতিকগুলোর জন্য বিষয়টিকে অশনি সংকেত হিসেবেই দেখছেন তারা। তবে, সাধারণ মানুষের মতে, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হলে দলীয়প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে উৎসবের আমেজে ভাটা পড়বে না।
৩০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো দলীয় ব্যানারে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। মোট ৩২৩টি পৌরসভার মধ্যে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ ২৩৪ টি পৌরসভার নির্বাচন হবে। গত ২ নভেম্বর স্থানীয় সরকার পৌরসভা নির্বাচনের সংশোধিত আইনের অধ্যাদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। এরপর ৩ নভেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে নির্বাচনি বিধিমালা ও খসড়া চূড়ান্ত করে ৫ নভেম্বর আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় ইসি।
দলীয় ব্যানারে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে এসেছে বিএনপি। যদিও শেষ পর্যন্ত শুক্রবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানায় দলটি। তবে দলটি ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন আরও ১৫ দিন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। বিএনপির এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পরই সারাদেশে এক ধরনের উৎসববার্তা ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে কাজে নেমে পড়েছেন ২০ দলীয় জোটের আগ্রহী-প্রার্থীরা।
এর আগে পৌরসভা নির্বাচনের ঘোষণা পেয়ে প্রস্তুতি শুরু করেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সম্ভাব্য মনোনয়ন-প্রত্যাশীরা।
জানতে চাইলে হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র, উপজেলা আওয়ামী লীগনেতা শাহ মুহাম্মদ মুসলিম বলেন, সবদল অংশগ্রহণ করলে, অবশ্যই নির্বাচন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রার্থী যদি ঠিক-ঠাক দেওয়া হয়, তাহলে অবশ্যই ভোট উৎসবমুখর পরিবেশেই হবে। ভোটাররাও নির্বাচনি চাঞ্চল্য পাবেন। তবে শাহ মুহাম্মদ মুসলিম অভিযোগ করেন, তার এলাকার সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ ও বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী দলছুট আওয়ামী লীগারদের মনোনয়ন দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন। বিগত নির্বাচনেও তাকে জোর করে হারানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার আশঙ্কা, এমন হলে ভোট উৎসবমুখর হবে না।
কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর পৌরসভার মেয়র হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, অবশ্যই ভোট উৎসবমুখর পরিবেশে হবে। এই ভোটের জন্য হাজার-হাজার ভোটার বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করে থাকেন। তবে, এই শহরের বিএনপির কোনও আগ্রহী-প্রার্থীকে পাওয়া যায়নি। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে ৫ জন বিএনপি নেতা কারাগারে আটক রয়েছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে গণগ্রেফতার চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। দলটির মুখপাত্র আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, সরকার এতই আগ্রাসী ও অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে যে, তারা মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে বিরোধী মতাবলম্বী দল থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ঠুনকো অজুহাতে বরখাস্ত করে নিজেদের লোকদের বসাচ্ছে। এ বিষয়েও কমিশনের কোনও দৃশ্যমান ভূমিকা বা পদক্ষেপ নেই। বিষয়টি তিনি হতাশাব্যঞ্জক বলে অভিহিত করে তিনি বলেন, এতে করে জনগণ তাদের পবিত্র আমানত-ভোটাধিকার প্রয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
একই অভিযোগ জামায়াতেরও। দলটির নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অযথা-হয়রানিমূলক মামলা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে নির্বাচন করা কতটা সম্ভব। এরপরও আমরা আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাব গণ-ঐক্য সৃষ্টির জন্য।
একই অভিযোগ মিলেছে তৃণমূল বিএনপি থেকেও। চাপাইনবাবগঞ্জ শহর পৌরসভার বর্তমান মেয়র মাওলানা আবদুল মতিন বলেন, মামলা-হয়রানি তো সব সময় আছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, নিরপেক্ষ হবে কি না, এসব প্রশ্ন তো রয়েছেই। হাইকমান্ড নির্দেশ দিয়েছে, তাই নির্বাচনে যাব। তবে ভোটাধিকার প্রয়োগ না হলে, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু না হলে নির্বাচন উৎসবমুখর হবে না। তিনি যোগ করেন, ইতোমধ্যে সরকারের আচরণ এই ইঙ্গিত দেয় যে, নির্বাচনে তারা ক্ষমতার প্রভাব খাটাবে।
নরসিংদী জেলার বিএনপি নেতা কামাল উদ্দিন চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, লিখে রাখেন। আগের দিন পর্যন্ত সুষ্ঠুভাবে থাকবে, উৎসব থাকবে। এরপর কেন্দ্র দখলের উৎসব হবে। এটাই বিগত দিনের অভিজ্ঞতা। এছাড়া আইনশৃঙখলা বাহিনী তো আছে, সরকারের লোকদের বাঁচানোর জন্য।
এদিকে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের শর্তে ছোট রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনবঞ্চিত হবে বলে মনে করেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, জোটগতভাবে প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে ছোট দলগুলোর অস্তিত্ব থাকবে না। মজুদমদার আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে ভুয়া ভোটারবিহীন নির্বাচন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন। তবে, তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ইসি নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নির্বাচন করতে পারবে কি না।
গ্রেফতার, হয়রানি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, নির্বাচনের সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকে। তারা কৃর্তপক্ষের নির্দেশ পালন করেন। এতে আমাদের কিছু করার নেই।