।। মাহবুব রেজা ।। মানুষ যখন তার লাজ-লজ্জা সব হারায় তখন তাকে বেলাজ, বেহায়া, বেশরমসহ নানা ধরনের তকমা সহ্য করতে হয়। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি সম্ভবত এসব তকমা অভিধার অনেক ওপরে জায়গা করে নিয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে দেশটি অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে যাচ্ছে যা শুধু দৃষ্টিকটুও নয় সহ্যের বাইরে। পাকিস্তান সব কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে যা বিশ্বের পররাষ্ট্রনীতিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে পররাষ্ট্র নীতিকে থোড়াই কেয়ার করে দেশটি নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলছে। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে তিক্ত করে ফেলছে। এই তিক্ততা কতদূর নিয়ে যাবে পাকিস্তানকে? আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা পাকিস্তানের এই ঔদ্ধত্যের উৎস সম্পর্কে কোনো ইঙ্গিত না করে বলছেন, দেশটি ভুল নির্দেশনায় পা ফেলছে। এই পা ফেলার পরিণাম সামনের দিন পাকিস্তানকে আরও অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানের মধ্যে দেখা দেয় এক প্রতিক্রিয়া। বিচার শুরুর পর থেকেই দেশটি নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। একাত্তরের পরাজয়কে এখনো মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তান, এ কথাই বারবার ইনিয়ে-বিনিয়ে জাতীয় সংগীতের মতো কোরাস করেছে তারা। মুক্তিযুদ্ধের এত বছর পরও পাকিস্তানের এই নীতি বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই ভালো চোখে দেখছে না। পাকিস্তানের এই অদ্ভূতুড়ে নীতিতে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন দেশ-বিদেশের সাবেক কূটনীতিক ও পররাষ্ট্র নীতি বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের অতীত আগলে রাখার মানসিকতা দেশটির নাজুক পরিস্থিতিরই পূর্বাভাস দিচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যদি এ নিয়ে উদারতা প্রকাশ করার মানসিকতা কিংবা দেখানো কৌশল/ভান দেখাত তাহলে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকত। কিন্তু পাকিস্তান তা না করে গোয়ার্তুমি দেখাতে বদ্ধপরিকর। তারা বলছেন পররাষ্ট্রনীতিতে কখনো কখনো ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভান কিংবা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়।
পাকিস্তান এসব কৌশল কিংবা ভান-এর ধার ধারছে না। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে পড়ছে। পাকিস্তানের সীমাহীন ঔদ্ধত্য বাংলাদেশ সহজভাবে নেয়নি। মানবতাবিরোধী বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই বিচারের প্রক্রিয়া এখন বিশ্বের জন্য রোল মডেল। অথচ পাকিস্তান ও তাদের এদেশীয় দোসররা এই বিচারের রায় ও প্রক্রিয়াকে সহজে মেনে নিতে পারছে না। তারা বিচারের নানা অসঙ্গতি (!) তুলে ধরে নিজেদের মূর্খতাকে বড় করে দেখতে চাইছেন একথা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
পাকিস্তানের এই ঔদ্ধত্যের উৎস কোথায়?
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে ২১ নভেম্বর। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত এই দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হলে দেশবাসী আনন্দে, উল্লাসে ফেটে পড়ে। এই ফাঁসির মাধ্যমে দেশ কলঙ্ক থেকে একধাপ অগ্রসর হলো। বাকি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে সেই কলংকের শেষ হবে। সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার পর বিএনপি একরকম রহস্যজনক ভূমিকা পালন করে। তারা এক ধরনের নীরবতা পালনে ব্যস্ত থাকে।
সাকা-মুজাহিদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে ওঠে। মুজাহিদের ব্যাপারে জামায়াত হরতাল আহ্বান করলে বিএনপি তাহলে মৌন সম্মতি দিয়ে তাদের আহূত কর্মসূচি স্থগিত করে। অন্যদিকে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের পক্ষ থেকে সাকার পক্ষে অবস্থান নেয়। বিএনপির মুখপাত্র দলীয় অফিসে সংবাদ সম্মেলন করে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে দেশের সার্বভৌম, গণতন্ত্রের জন্য সাচ্চা সৈনিক হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি রাজনীতিতে একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ। সাকা চৌধুরীর জন্য বিএনপির এই বক্তব্যকে দেশবাসী অবশ্য প্রলাপের মতো করেই দেখেছেন। জ্বর হলে মানুষ যেমন আন্ধা-কুন্দা বা যাচ্ছেতাই ধরনের কথা বলে বিএনপির অবস্থাও হয়েছে তাই।
মানবতাবিরোধীদের জন্য বিএনপি-জামায়াতের বক্তব্য এ কর্মসূচিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে দিয়ে স্বমহিমায় তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তান। সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ায় পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী ‘কালো দিবস’ পালন করে। এছাড়া তেহরিক-ই-ইনসাফের এক নেতা পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদে এ দুজনের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রস্তাব দিয়েছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের মুখপাত্রের মাধ্যমে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিতে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের ফাঁসির রায়ে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানানো হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান বলেন, ১৯৭১ সালে কেউ পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করলে তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া বন্ধ করার এখনই উপযুক্ত সময়।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজ দৈনিক ডন-এর অনলাইন সংস্করণের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর আমির সিরাজুল হক বলেছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ও এর আদর্শের প্রতি ভালোবাসার জন্যই এ দুজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। বান্নুতে এক জনসভায় ভাষণদানকালে জামায়াতের আমির বলেন, এদেশের (পাকিস্তান), আদর্শের সেনাবাহিনীর প্রতি ভালোবাসাই ছিল এ দুজনের (সাকা ও মুজাহিদ) আসল অপরাধ। সিরাজুল হকের বক্তব্য এক পর্যায়ে গিয়ে আক্রমণ করে বসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে দেশের পাকিস্তানপন্থি মানুষকে নির্মূল করছেন। অন্যদিকে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন তেহরিক-ই-ইনসাফ দলের পাঞ্জাব প্রদেশের নেতা মিয়া মেহমুদ রশিদ সেখানকার প্রাদেশিক পরিষদে সাকা-মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। প্রস্তাবে বলা হয়, পাকিস্তানের ভাবাদর্শের সমর্থকদের ধারাবাহিকভাবে ফাঁসি কার্যকর করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস) এ বিষয়টি উত্থাপনের জন্য তিনি সরকারের প্রতি দাবি জানান।
পাকিস্তানের এ বিবৃতির পর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রতিবাদে বাংলাদেশ বলেছে, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে দ-িত দুজনের ফাঁসি নিয়ে ইসলামাবাদের প্রতিক্রিয়া একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে প্রতিবাদপত্র তুলে দেন ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব মিজানুর রহমান। বাংলাদেশের প্রতিবাদপত্রে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সই হওয়া চুক্তি নিয়ে খ-িত ব্যাখ্যা মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী স্থিতি ও সমৃদ্ধির লক্ষে সুপ্রতিবেশী ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হচ্ছে চুক্তির মূলনীতি। এই চুক্তিতে কখনোই মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যায় জড়িত এবং এর পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তি কিংবা বিচার থেকে রেহাই দেওয়ার কথা বলা হয়নি। অথচ চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের যে দায়িত্বটি ছিল, সেটি পালনে পাকিস্তান ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পাকিস্তান তার দায় এড়াতে পারে না। একই সঙ্গে প্রতিবাদপত্রে পাকিস্তান ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল আচরণ ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাক্সিক্ষত মন্তব্য থেকে বিরত থাকবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। পাকিস্তানের প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর যুদ্ধাপরাধী সাকা-মুজাহিদের ব্যাপারে বিবৃতিকে ‘অতি আবেগ’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন। আসমা জাহাঙ্গীর বলেছেন, অন্য দেশের কথা না ভেবে তাদের উচিত নিজ দেশের নাগরিকদের নিয়ে মাথা ঘামানো।
অন্যদিকে সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির রায়ে পাকিস্তানের অবস্থানে বিস্মিত নয় উল্লেখ করে ভারত এই রায়কে সমর্থন করেছে। ফাঁসির রায়ে পশ্চিমা দুনিয়ার কোনো কোনো দেশের সমালোচনা প্রকৃত তথ্যভিত্তিক নয় বলেও ভারত মনে করে। ভারত মনে করছে, বিচার ব্যবস্থায় কোন ফাঁক ছিল না। বরং ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সাহসিকতারই পরিচয় রেখেছেন। পাকিস্তান সরকার, সে দেশের জামায়াতে ইসলামী ও তৈহরিক-ই-ইনসাফের এসব অনাকাক্সিক্ষত বিবৃতি-বক্তব্য দেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব তৈরি করতে পারেনি। তবে সাকা চৌধুরীর পক্ষে সাফাই গেয়ে বিএনপি তার দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যেই এক অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। বিএনপির উদারপন্থিদের নেতারা দলের এই অবস্থানের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তবে দলের মধ্যে জামায়াতঘেঁষা অংশটি বিএনপির অবস্থানকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বিএনপির সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত নেতাদের অনেকেই মনে করছেন, সাকা চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে একথা যেমন সত্য তেমনি করে এটাও সত্য যে, দলের মধ্যে তিনি (সাকা) তার উত্তরসূরি রেখে গেছেন। এই উত্তরসূরিরা সাকার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে প্রস্তুত হয়ে আছেন। সাকা পুত্র হুম্মাম কাদের চৌধুরী পৈতৃকসূত্রে বাবার গুণাগুণ গেয়েছেন। তবে তার বাইরেও অনেক হুম্মাম কাদের চৌধুরী যে রয়ে গেছে সেটা বেশ ভালোই বোঝা যাচ্ছে। পাকিস্তানের এই ঔদ্ধত্য প্রকাশে সেই হুম্মাম চৌধুরীরা তৎপর।