রফিকুল ইসলাম, রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) : দেশমাতৃকার টানে জীবন বাজি রেখে পরিবারের অগোচরে নববিবাহিত বধূকে ফেলে ভারতের মুজিব ক্যাম্পে ২৮দিন ট্রেনিং নিয়ে কুড়িগ্রামের রৌমারীর ৬ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার খাদেমুল বাশারের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের অংশ নিয়েছিলেন রাজারহাট উপজেলাধীন সদর ইউপির নাটুয়া মহল এলাকার বাসিন্দা বীরমুক্তিযোদ্ধা কালীপদ রায় (৬৫)। যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে তার সুখের সংসারে মা-বাবা, ভাই-বোন সহায়-সম্পদ সব রেখে গিয়েছিলেন চাকিরপশার ইউপির ঠাঁটমারী এলাকায়। কিন্তু ভাগ্যের করুণ পরিণতি। যুদ্ধ শেষ করে বাড়ি ফিরে শুধুমাত্র স্ত্রীকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পাননি তিনি। পরে তার ঠিকানা হয় সদর ইউপির নাটুয়া মহল রাস মন্দির সংলগ্ন এলাকায় অন্যের জায়গায় একটি ঝঁপড়ি ঘর তুলে দুই স্ত্রী, ৪ কন্যা সন্তানকে নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করতে থাকেন। ইতিমধ্যে ধার-দেনা এবং অন্যের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে ৪ কন্যাকে তিনি পাত্রস্থ করেছেন। এখন তিনি দু’স্ত্রী, শ্বাশুড়িসহ ৪ জনের পরিবারের একমাত্র অবলম্বন মুক্তিযোদ্ধার সরকারি ভাতার ৮ হাজার টাকা। মুক্তিযোদ্ধা কালীপদ রায়ের শরীরে বর্তমান নানা ধরণের রোগ-ব্যাধি দেখা দিয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকমত খাবার খেতে না পেয়ে দেহ কংকাল সার হয়ে গেছে। যুদ্ধের স্মৃতি চারণ করতে এক পর্যায়ে তিনি কেঁদে ফেলে বলেন, রৌমারীর কোদালকাটি চরে তারিখটা সঠিক মনে নেই তাঁর, তবে ডিসেম্বরের ৩/৪ তারিখ হবে। হঠাৎ দুপুর বেলা পাকবাহিনী ৬ নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। ঠিক ওই সময় আমরা ওই ক্যাম্পে প্রায় ৩ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন গ্র“পে ভাগ হয়ে জীবন বাজি রেখে দুই দিন ব্রহ্মপুত্র নদের জল পান করে সম্মুখ লড়াই চালিয়ে পাক বাহিনীকে পরাস্ত করতে সক্ষম হই। অবশেষে তারা পিছু হটে চিলমারীর দিকে চলে যায়। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থান থেকে খবর আসতে থাকে, পাক বাহিনীরা পিছু হটতে শুরু করেছে। এরপর বুক ভরা আশা জাগে এবং বুকে নতুন করে স্বপ্ন কতক্ষণে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। যুদ্ধ চলাকালীন কখনো ভাবিনি, নতুন স্ত্রী, মা-বাবা, ভাই-বোনকে রেখে এসেছি। একটাই শুধু লক্ষ্য ছিল কখন দেশ স্বাধীন হবে। তবে বাবুরে, জীবনের শেষ সময় এসে দেখলাম, স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী রাজাকারদের এক এক করে বিচারের আওতায় এনে বিচারে কারো কারো ফাঁসি দেয়া হচ্ছে, এটা আমার কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গৌরবের বিষয়। এখন মরে গেলেও আত্মায় শান্তি পামু। পাশাপাশি সরকারের কাছে একটাই দাবি প্রকৃত যুদ্ধাপরাধিদের বিচার শেষ করিয়া বাঙালি জাতিকে কলংকমুক্ত করতে। এদের ওই সময়কার অন্যায়-অবিচার যারা দেখেননি, তারা বুঝবে না, ওরা বাঙালি জাতির উপর কি ধরণের অত্যাচার-নির্যাতন করেছে। ওই নির্যাতনের কথা মনে হলে এখনও গা-শিউরে উঠে, চোখে পানি এসে যায়।