।। মাহমুদ জামান শোভন ।। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসেব নিকেশ গুণতে গুণতে কেটে গেল একটি বছর। আশা নিরাশার কতটুকুই বা পূরণ হয়েছে বিগত ৩৬৫ দিনে। অনেকেই বছর জুড়ে হারিয়ে খুঁজে ফিরেছেন অনেক কিছু, কিন্তু শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা গেল না। ২০১৫ সালটা হয়তো অনেকের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল যা কখনো ভুলে যাবার নয়। অনেকের হয়তো অনেক কিছু হারানো গিয়েছে আবার হয়েছে অনেক অর্জন। হারানো যা গিয়েছে যাক না তা বিলীন হয়ে, হয়েছে যতটুকু অর্জন তা নিয়েই নতুন করে পথ চলা শুরু করি। শুভ নববর্ষ ২০১৬।
ইংরেজী সাল আমাদের দেশে এলো যেভাবেঃ
গ্রেট ব্রিটেনে এই গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার প্রচলিত হয় ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে। এই ক্যালেন্ডার আমাদের দেশে নিয়ে আসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে।
গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের আগে নাম ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডার। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার মিসর দেশে প্রচলিত ক্যালেন্ডারটি রোমে এনে তার কিছুটা সংস্কার করে তাঁর রোম সাম্রাজ্যে চালু করেন। এই ক্যালেন্ডারে জুলিয়াস সিজারের নামে জুলাই মাসের নামকরণ করা হয়। মিসরীয়রা বর্ষ গণনা করত ৩৬৫ দিনে। মিসরীয়দের ক্যালেন্ডার সংস্কার করে জুলিয়াস সিজার যে ক্যালেন্ডার রোমে প্রবর্তন করলেন তাতে বছর হলো ৩শ’ সাড়ে পঁয়ষট্টি দিনে। এখানে উলেস্নখ্য যে, মিসরীয় ক্যালেন্ডার পরীৰা-নিরীৰা করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছেন এই ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৪২৩৬ অব্দে।
গ্রিকরা মিসর থেকে ক্যালেন্ডারের ব্যবহার রপ্ত করে। রোমানরা গ্রিকদের নিকট থেকে এটা রপ্ত করে সংস্কারের মাধ্যমে। রোমানদের প্রাচীন ক্যালেন্ডারে নাম ছিল দশটি। তারা বর্ষ গণনা করত ৩০৪ দিনে। মধ্য শীতকালের ৬০ দিন তারা গণনায় আনত না। তাদের বছরের প্রথম মাস ছিল মার্চ। ১ মার্চ তারা নববর্ষ উৎসব পালন করত। শীতকালের ৬০ দিন গণনায় না আনার কারণে বর্ষ গণানায় যে দু’টো মাসের কমতি হতো তা পূরণ করতে তাদের অনির্দিষ্ট দিন সমূহের দ্বারস্থ হতে হতো। এই সব দুর্বোধ্যতা ও জটিলতার কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে তখন ক্যালেন্ডার ব্যবহারের প্রবণতা একেবারেই ছিল না।
রোমের উপাখ্যান খ্যাত প্রথম সম্রাট রোমুলাসই ৭৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রোমান ক্যালেন্ডার চালু করবার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। এই রোমুলাসই ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইতালির টাইবার নদীর তীরে রোম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাঁরই নামে রোমের নামকরণ করা হয়।
পরবর্তীকালে রোমান সম্রাট নূমা বছরের মাসগুলোকে সঠিক বিন্যাসের লৰ্যে প্রচলিত ১০ মাসের সঙ্গে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি নামে আরও দুটো মাস যুক্ত করেন। জানুয়ারি মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে এবং ফেব্রুয়ারি মাসকে বছরের শেষ মাস হিসেবে স্থাপন করা হয়। জানুয়ারি মাসকে ধার্য করা হয় ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনে। এ ছাড়াও তিনি মারসিডানাস নামে অতিরিক্ত একটি মাসেরও প্রবর্তন করেন।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চলছিল। কিন্তু ডাইওনিসিয়াম এঙ্গুয়াস নামের এক খ্রিস্টান পাদ্রি যিশুখ্রিস্টের জন্মের বছর থেকে গণনা করে ৫৩২ অব্দ থেকে খ্রিস্টাব্দের সূচনা করেন। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী জ্যোতির্বিজ্ঞানীগণের পরামর্শ নিয়ে ক্যালেন্ডারটির কিছুটা সংস্কার করেন। তাঁর নির্দেশে ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের ৫ তারিখকে ১৫ তারিখ ধরা হয়। তিনি ঘোষণা করেন যে সব শতবর্ষীয় সন ৪০০ দ্বারা বিভক্ত হবে সেই সব শতবর্ষ লিপইয়ার বলে গণ্য হবে।
ইংরেজি সনের জানুয়ারি মাসের নামকরণ করা হয়েছে দ্বাররক্ষী দেবতা জানুসের নামে, রণদেবতা মারস বা মারফের নামে মার্চ মাসের নামকরণ করা হয়েছে, দেবরাজ জুপিটারের পত্নী জুনোর নামে নামকরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া জুলিয়াস সিজারের নামে যেমন জুলাই মাসের নাম হয়েছে তেমনি সম্রাট অগাস্টারের নামে হয়েছে অগাস্ট বা আগস্ট মাস।
পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ আছে যেখানে সেই দেশের অভ্যনত্মরে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ব্যবহার নেই। সেসব দেশে যার যার নিজস্ব ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকা ব্যবহৃত হয়। অবশ্য আনত্মর্জাতিক যোগাযোগ ও কাজকর্মের খাতিরে ইংরেজী তারিখ প্রযোজনের তাকিদে ব্যবহৃত হয়।
সব মিলিয়ে বিদায়ী বছরটি ছিল বৈচিত্র্যময়। অতীত পেছনে ফেলে সামনে নতুন বছর। এখন নতুন বছর ও নতুন সূর্যের অপেক্ষায় সবাই। নতুন বছরে সকলের কাছে আমার প্রত্যাশা, আসুন পুরনো বছরের হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা সব ভুলে গিয়ে নতুন বছরে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলি। পুরনো বছরের পাপগুলো মনে মনে হিসেব করে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আর নতুন বছরটিতে পুরনো পাপগুলো পুণরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করি। মনে রাখি, সংকল্পই আমার মাঝে পরিবর্তন আনবে।
জানুয়ারি থেকে বছর গননা
৪৫১ অব্দে রোমের শাসনকার্য চালাতো ১০ জন ম্যাজিষ্ট্রেটের একটি পরিষদ, যা ‘দিসেসভিরস’ নামে প্রচলিত ছিল। এ পরিষদই প্রথম মার্চের পরিবর্তে জানুয়ারি থেকে বছর গননা শুরু করার নির্দেশ দেন। এ পদ্বতিটি চালু হতে সময় লাগলেও পৃথিবীর সব দেশই পরিবর্তিতে এ পদ্বতি গ্রহন করে।
ইংরেজি ১২ মাস
পন্ডিত পন্ডিফোরাই ৭৫৬ অব্দে ক্যালেন্ডার আবিষ্কার করেন। চাষাবাদের উপর ভিত্তি করে এ ক্যালেন্ডার প্রস্তুত করা হয় বলে এতে মাসের সংখ্যা ছিল ১০। ১০ মাসের ক্যালেন্ডারে দিনের সংখ্যা ছিল ৩০৪ এবং বছর শুরু হতো মার্চ মাস থেকে। রোমান রাজা নুমাপাম পিলিয়াস ৭০০ অব্দে ঐ ক্যালেন্ডারে জানুরায়িয়াস এবং ফেব্রুয়ারিয়াস দুটি মাস সংযুক্ত করেন এবং কিছু কিছু মাসের দিনের সংখ্যাও পরিবর্তন করেন। ফলে মাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ১২।
মাসের নামকরণ
প্রাচীন রোমানদের হাতে ক্যালেন্ডারের জন্ম এবং বিকাশ লাভ করেছে। ফলে বারটি মাসের বেশির ভাগই রোমান দেবতা বা সম্রাটদের নামে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন-
• জানুয়ারিঃ রোমান দেবতা জানো’স এর নামানুসারে। জানোস অর্থ দু’টি মুখ। জুলিয়াস সিজারের সংস্কারের পুর্ব পর্যন্ত জানুয়ারি মাস ছিল ২০ দিন (বর্তমানে ৩১ দিন)।
• ফেব্রুয়ারিঃ ল্যাটিন শব্দ ফেব্রুয়া থেকে নামকরন করা হয়েছে। ফেব্রুয়া অর্থ হলো পবিত্র।
• মার্চঃ রোমান দেবতা মার্স-এর নামানুসারে। মার্স হলো রোমানদের যুদ্বের দেবতা। মার্চ ছিল রোমানদের বর্ষ শুরুর মাস।
• এপ্রিলঃ ল্যাটিন এপ্রিলিস থেকে এর নামকরন করা হয়েছে।
• মেঃ বসন্তের দেবী মায়া’স এর নামানুসারে নামকরন করা হয়েছে।
• জুনঃ বিবাহ এবং নারীদের কল্যানের দেবী জুনোর নামানুসারে।
• জুলাইঃ এটি জুলিয়াস সিজার’স মাস। জুলিয়াস সিজার ৪৬ অব্দে রোমান ক্যালেন্ডার সংস্কার করেন এবং তার নামানুসারে জুলাই মাসের নামকরন করা হয়।
• আগষ্টঃ জুলিয়াস সিজারের পুত্র অগাস্টাস সিজারের নামানুসারে।
• সেপ্টেম্বরঃ ল্যাটিন সংখ্যা সপ্তম থেকে এর নামকরন করা হয়েছে।
• অক্টোবরঃ ল্যাটিন সংখ্যা অষ্টম থেকে এর নামকরন করা হয়েছে।
• নভেম্বরঃ ল্যাটিন সংখ্যা নবম (নভেম্ব্রিস) থেকে এর নামকরন করা হয়েছে।
• ডিসেম্বরঃ ল্যাটিন সংখ্যা দশম থেকে এর নামকরন করা হয়েছে।
লিপিয়ার- এর প্রচলন
‘লিপইয়ার’- এর প্রচলন হয় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের শাসনামল থেকে। জুলিয়াস সিজার আলেকজান্দ্রিয়া থেকে গ্রিক জোতির্বিদ মোসাজিনিসকে নিয়ে আসেন ক্যালেন্ডার সংস্কারের জন্য। মসাজিনিস দেখতে পান পৃথিবী সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিনে সময় নেয় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা। ৩৬৫ দিনে বছর হিসাব করা হলে এবং প্রতি চতুর্থ বছরে ৩৬৬ দিনে বছর হিসাব করলে কোনো গরমিল থাকে না। মোসাজিনিস অতিরিক্ত এক দিন যুক্ত এ বছরটির নামকরন করেন ‘লিপইয়ার’
তথ্য সূত্র: ইন্টারনেট