
।।
পীর হাবিবুর রহমান ।।এত আওয়ামী লীগ কোথায় ছিল? টিভি টকশো, গোল টেবিল, রাজনৈতিক সমাবেশ, সেমিনার, অফিস আদালত যেখানেই যাই সরব আওয়ামী লীগার দেখি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এত আওয়ামী লীগ কোথায় ছিলেন প্রশ্ন নাইবা তুললাম। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে তাদের চেহারা কোথায় ছিল সেই প্রশ্ন নাইবা আনলাম। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। তখনো এরা বয়সে নাবালক ছিলেন না। পেশায় পরিচয়ে ছিলেন না নাম গোত্রহীন। তখনো এদের টকশোর গোল টেবিল কিংবা সভা সমাবেশে দেখিনি সরব আওয়ামী লীগ হতে।
সেদিনও সারাদেশে গ্রেনেড, বোমা হামলা মামলায় নির্যাতিত মুজিব ভক্তদের শোকার্ত মিছিল, বোবাকান্না, আহাজারি নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সুধা সদনের বাড়ি কিংবা ধানমন্ডির কার্যালয়মুখী হতে দেখেছি। এদের মামলা চিকিৎসার খরচ তাকেই বহন করতে হয়েছে। তবু আজকের সরব এত এত সক্রিয় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কোথাও দেখিনি। এখন যারা হাত ছুঁড়ে পা ছুঁড়ে টিভির টকশো থেকে গোল টেবিল সেমিনার হয়ে অফিস আদালতই নয়, গণভবনের শীতের পিঠা পুলির উৎসব থেকে অফিস আদালত কিংবা রাজনৈতিক সমাবেশে সরব হয়ে উঠেছেন। তবে কি এরাই নাটোর আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট সাজ্জাদুর রহমানের বাসায় হাইব্রিড আওয়ামী লীগার? নাকি ইতিহাস নির্ধারিত সেই সব সুবিধাভোগী যারা যখন যে ক্ষমতায় তাদের পদলেহনে সুখ ঘুম যান, বিপদ এলে কেটে পড়েন, সুবিধামতো সুযোগ সন্ধানী হয়ে ওঠেন, রাতের অন্ধকারে নব্য ক্ষমতাবানদের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দন করেন, তারা হাসলে হাসেন, তারা কাঁদলে কাঁদেন।
ওয়ান ইলেভেনের দুঃসময়ে কেউ বা ভয়ে কেউবা নতুন স্বপ্নের আশায় পরিবর্তনের শ্লোগানে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের আশায় সেনা সমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দিয়েছিলেন। কিন্তু এইসব মতলববাজ সুযোগসন্ধানী সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভের আশায় সেদিনও টকশোতে, সভা সেমিনারে কিংবা নিজেদের প্রতিষ্ঠানে সেই সরকারের বন্দনাই করেননি রাজনীতিবিদদের গোষ্ঠি উদ্ধার করেছেন। নানা তদবির কিংবা সুযোগ সুবিধা আদায় থেকে সামাজিক প্রতিপত্তি বাড়াতে সেই সরকারের ছোটবড় ক্ষমতার চেয়ারের সামনে বসে থেকেছেন। গোপনে প্রকাশ্যে তাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে ধন্য ধন্য করেছেন।
সেই সরকারকে পরাস্ত করে জেল জুলুম সয়ে মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই নির্লজ্জ্ব বেহায়ার মতো খোলস পাল্টে রাতারাতি আওয়ামী লীগ বন্দনায় সরকারের গুণকীর্তনে দারাই নিজেদের সামনে নিয়ে আসেন। আমলা পাড়া থেকে কুটনৈতিক পল্লী, লেখক সাংবাদিক বুদ্ধিজীবি সমাজের মতলববাজ সব এক কাতারে এমনভাবে কোরাস গাইছেন তাদের দেখলে মনেই হয় না ওয়ান ইলেভেনের কেউ সমর্থক ছিলেন! কিংবা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দুঃসময়ে পাশে থাকুন আর নাই থাকুন সুসময়ের বন্ধু হতে ভুল করেননি। দেশ জুড়ে তাই অগণন সাধারণ মানুষ শেখ হাসিনার উন্নয়নের সুবিধা ভোগ করলেও আদর্শবান কর্মীরা নীরবে নিভৃতে পথ চললেও এরা বড় বেশি বড় আওয়ামী লাগার হয়ে উঠেছেন। আড্ডায় জলসায় মন্ত্রী পাড়ায় এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্টাফদের দুয়ারে দুয়ারে তারা ঘুরেন। যুক্তি তর্কে পরামর্শে এতটাই বড় আওয়ামী লীগার করে নিজেদের তুলে ধরেন বিপদে বন্ধুরা দেখে লজ্জায় চুপ হয়ে যান। বোবা দর্শক সেজে এদের কীর্তিকলাপ কৌতুকভরে উপভোগ করেন।
স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে গোটা দেশ ছিল আওয়ামী লীগ। একদলীয় বাকশাল গঠন হলে সেখানে নাম লেখাতে দীর্ঘ লাইন পড়েছে। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবার পরিজনসহ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের পথে একদল বিশ্বাস ঘাতক হত্যা করলে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িটিতে লাশ ফেলে রেখে খুনীচক্রের সঙ্গে অনেকেই হাত মিলিয়েছেন।
রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারা অন্তরীন ও দেশান্তরি করার প্রক্রিয়ার ভিতরেই তারা অনেকেই ছুটে গেছেন সেনা শাসক জিয়াউর রহমানের খালকাটা বিপ্লবে। যার দল থেকে বিএনপি সারা দেশ হয়ে গেছে কাতারবন্দী। অন্যদিকে আত্মসমালোচনা আত্মসংযম, আত্মবিশ্লেষনের পথে আত্মশুদ্ধির ধ্যান ধারণা নিয়ে ঝঞ্জা-বিক্ষুব্ধ সময়ের উজানে নৌকা ভাসিয়েছে আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর আদর্শবান তরুণরাই ছিল দলের প্রাণশক্তি। সেই শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হেঁটে বঙ্গবন্ধুর পর দ্বিতীয়বার আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত বিকশিত ও জনপ্রিয়ই করেননি গণরায় নিয়ে ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেন।
ক্ষমতার পালাবদলে আওয়ামী লীগে বসন্তের কোকিলেরা গান গাইতে থাকে। তার আগে সেনা শাসক জিয়াউর রহমানের হত্যাকন্ডের মধ্য দিয়ে অথর্ব বিএনপির সাত্তার সরকারকে উৎখাত করে সেনা শাসক এইচ এম এরশাদ ক্ষমতা দখল করলে জিয়ার আদর্শেও সহচররা আশ্রয় নিতে থাকেন তার হেরেমে। ঢল নামে সেখানে তথাকথিত জাতীয়তাবাদী শক্তির। অকাল বৈধব্য নিয়ে বিএনপির হালধরা খালেদা জিয়ার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে ছাত্রদলের সাহসী তরুণেরা। সেই শক্তির উপর ভর করে ক্ষমতায় এসেছিলেন খালেদা জিয়া। ২০০১ সালে ফের ক্ষমতায় আসার পর হাওয়া ভবন, ক্ষমতার উন্নাসিকতা, লুটেরা সিন্ডিকেট আর সুবিধাভোগীর ভীড়, মতলববাজদের তৎপরতা নেতৃত্বকে দিকভ্রান্ত করেছিল। সেদিনও কি ব্যবসায়ী কি সুশীল, কি আমলা পাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচন কমিশন সব হয়ে পড়েছিল বিএনপি।
দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষমতায় থাকার পরিকল্পনা ভেস্তেই যায়নি, বিএনপির নেতৃত্ব ও দলের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ বিপর্যয় নেমে আসে। সেই বিপর্যয়ে পতিত বিএনপি কবে ঘুরে দাঁড়াবে তা কেউ জানে না।
বসন্তকালে প্রকৃতির রং বদলে যায়। বাগানের ফুল যায় ঝরে। সবুজ বৃক্ষের পাতা উড়ে যায় ঝরো হাওয়ায়। মধ্য দুপুরে কোকিলের মন উদাস করা ডাক দেহমন নিস্তেজ অবশ করে দেয়। কিন্ত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী বসন্তের কোকিলেরা কোরাস গাইছে ক্লান্তিহীনভাবে।
আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন জয়ী হয় তখন একা জয়ী হয়, যখন পরাজিত হয় তখন গোটা জাতি পরাজিত হয়।’ আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড চোখে পড়ার মতো। নজিরবিহীন উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নয়নের ইতিহাসে গণঅভ্যুত্থানে বিদায় নেয়া পাকিস্তানের ফৌজি শাসক আইয়ুব খানেরও সুনাম ছিল। মতলববাজ, সুবিধাভোগী শ্রেণী তাকেও ঘিরে ধরেছিলেন। পতনের পর আইয়ুব খান একা হয়ে পড়েছিলেন। সেনাশাসক এরশাদের উন্নয়নও প্রশংসিত হয়েছে। ক্ষমতায় থাকতে সুবিধাবাদীরা বঙ্গভবনে কবিতার জলসায় বনে রাজ কবি হয়েও ধন্য হয়েছেন। কিন্তু আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন কর্মী ও সংগ্রাম তাকে স্বস্তি দেয়নি। ক্ষমতা থেকে বিদায় দিয়েছে। ক্ষমতাচ্যুতির পর রাজকবিরাও নিরাপদে কেটে পড়েছেন।
২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্বাবধায়ক সরকার শপথ নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল এনেছিলেন। পরদিন আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতারা সদ্য গাড়ি থেকে নামা পতাকা রেখে যখন জাতীয় প্রেসক্লাবে গেলেন সংবাদ সম্মেলন করতে তখন তাদের সঙ্গে মোসাহেবদের কেউ ছিল না। ভোটযুদ্ধে ক্ষমতাচ্যুতির পর বিএনপি সরকারের দমন নির্যাতনে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীরা যখন ঘরছাড়া তখন সারাদেশের কর্মীদের লাশ টানতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। ঢাকায় প্রথম মিছিলটি বের করেছিলেন সাবেক মেয়র মরহুম মোহাম্মদ হানিফ। সঙ্গে ছিলেন গোটা পঞ্চাশেক কর্মী। অথচ ক্ষমতায় থাকতে একজন মন্ত্রীর মন্ত্রণালয় কিংবা এমপিদের পিছনে শত শত মানুষ দিনভর হেঁটেছে।
বরাবর দুঃসময়ে শেখ হাসিনা ও তার দলের আদর্শবান ত্যগী নেতাকর্মীদেরই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে, রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা রাজপথে থাকলে যে তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেন ক্ষমতায় গেলে চতুর্দিকে শীতের অতিথি পাখির মতো উড়ে এসে জুড়ে বসা সুবিধাবাদীদের ভিড় মোসাহেবী আর তেলবাজিতে সেই চিরচেনা কঠিন সময়ের দিনগুলো ভুলে যেতে থাকেন। এই কারণে রাজনীতিতে রাজনৈতিক শক্তিকে ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হয়। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষাই হচ্ছে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেন না।
সুবিধাভোগী মতলববাজ লুটেরা সিন্ডিকেট দুঃসময়ে এতটাই কেটে পড়ে খুঁজেও তার টিকিটি পাওয়া যায় না। নতুন হাওয়ায় পোষাক বদলে নব্য ক্ষমতাবানদের শিবিরে আশ্রয় নেয়। রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আদর্শ নির্ভর নেতাকর্মী সমৃদ্ধ শক্তিশালী সংগঠন ও জনগণের আস্থা অর্জনেই নিতে হয়। সুবিধাবাদীরা রাতের টকশো থেকে দিনের গোল টেবিল সভা সেমিনার থেকে যতই লাফ ঝাপ করুক এদের চেয়ে জনসমর্থন বড় শক্তি হয়ে পাশে থাকে। নির্লোভ নেতৃত্ব আর জনগণ মাঠে একাত্ম হয়ে হাঁটে। সেদিনও যাদের দেখতাম কট্টর আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী আজ তাদের মুখে যখন ক্ষমতার অনুকম্পায় শুনি শুধুই বন্দনা তখন ঘুরে ফিরে প্রশ্ন জাগে, এত আওয়ামী লীগ কোথায় ছিল?