নিউজ ডেস্ক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ধিত ফি ও সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্র হাতে ছাত্রলীগকর্মীদের হামলার পর সন্ধ্যায় সিন্ডিকেটের জরুরি বৈঠক চলছে। এদিকে আপাতত কর্মসূচি স্থগিত করেছে বিক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থীরা।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে রোববার সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক জরুরি বৈঠক শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের প্রশাসক অধ্যাপক ইলিয়াছ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সিন্ডিকেটের বৈঠকে ক্যাম্পাস খোলা রাখা হবে না কি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেয়া হবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
অধ্যাপক ইলিয়াছ হোসেন আরো জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সভাপতিত্বে উপাচার্যের বাসভবনে সিন্ডিকেটের এ সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্যরা অংশ নিয়েছেন।
পুরো ক্যাম্পাসে বর্তমানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। হামলায় আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এদের বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রসহ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আবারো ক্যাম্পাসে লাইব্রেরির সামনে অবস্থান নিয়ে হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া ও আহতদের সুচিকিৎসার দাবি জানিয়েছে।
প্রগতিশীল ছাত্রজোটের আন্দোলন সমন্বয়কারী আসাদুজ্জামান জানান, আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। স্থগিত করা হয়নি। সন্ধ্যায় সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত জানার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
ফের ধর্মঘটের ডাক :
বেলা আড়াইটার দিকে আবারো শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এসে সমাবেশে মিলিত হয়। এসময় পুলিশ কোনো বাধা প্রদান না করায় শিক্ষার্থীরা সেখানে সমাবেশ করে হলে হলে ফিরে যান।
তাদের সঙ্গে গ্রন্থাগারের ভেতরে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীরাও হলে ফিরে যান। সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীরা পূর্বের দাবিসহ হামলাকারীদের বিচার দাবিতে সোমবার থেকে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।
এদিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে রোববার সকাল ৮টা থেকে কর্মসূচি পালন করছিল শিক্ষার্থীরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবনের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান নেয়। এসময় সহকারী প্রক্টর সিরাজুল ইসলাম, হেলালউদ্দিন এবং জুলফিকার আলীর নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী তাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের একটি মিছিল সেখান দিয়ে অতিক্রম করে পাশে অবস্থান নেয়। তারা বিনা উস্কানিতেই আন্দোলনকারীদের ওপর ককটেল এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে।
একই সময় পশ্চিম দিক থেকে পুলিশও শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে দিগবিদিক ছুটাছুটি করতে থাকে। এসময় কমপক্ষে ৭৫ শিক্ষার্থী আহত হয়। শিক্ষার্থীরা পুরাতন ফোকলোর মাঠে অবস্থান নিলে ছাত্রলীগ সেখানেও হামলা চালায় এবং বেধড়ক মারধর করে। এসময় তাদের প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া দিতেও দেখা গেছে।
এদিকে ঘটনার পরপরই ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা আরএমপি পূর্ব জোনের উপ-কমিশনার প্রলয় চিসিমের কাছে পুলিশি হামলার কারণ জানতে চাইলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তার নির্দেশে পুলিশ সাংবাদিকদের ওপর রাবার বুলেট এবং লাঠিচার্জ করে। এতে কমপক্ষে ১০ সাংবাদিক আহত হন।
আহতরা হলেন মাছরাঙ্গা টিভির গোলাম রাব্বানী, বিডিনিউজের নাদিম মাহমুদ, শীর্ষ নিউজের জাকির হোসেন তমাল, নিউএইজের নাজিম মৃধা, দৈনিক মানবকণ্ঠের বুলবুল আহমেদ ফাহিম, জহুরুল ইসলাস মুন, মেহেদীসহ আরো কয়েকজন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সাংবাদিকরা তৎক্ষণাত লাইব্রেরি সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং বিকেল ৫টার মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিন সহকারী প্রক্টরের প্রত্যাহার এবং উপ-কমিশনার প্রলয় চিসিমের অপসারণ দাবি করে।
এদিকে দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর শিক্ষার্থীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় লাইব্রেবির সামনে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর আবার টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও ছিটাগুলি ছোঁড়ে। পরে শিক্ষার্থীরা জুবেরি মাঠে জড়ো হলে সেখানেও পুলিশ তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়।
পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা দুটি মাইক্রোবাস, ভিসির বাসভবন ও কয়েকটি একাডেমিক ভবনে ভাঙচুর করে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রউপদেষ্টা সাদেকুল আরেফিন মাতিন বলেন, এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সময় মতো জানানো হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদ আল হোসেন তুহিন বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করছিলাম। মিছিলটি সমাবেশস্থলে পৌঁছালে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েকজন আমাদের ওপর ককটেল হামলা চালায়। বাধ্য হয়ে আমাদের নেতা-কর্মীরাও আন্দোলনকারীদের ওপরে হামলা চালিয়েছে। তবে ছাত্রলীগ কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীর ওপর হামলা চালায়নি। যাদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে তারা সবাই শিবিরকর্মী।
এ ব্যাপারে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার প্রলয় চিসিম বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকদিন ধরেই তাদের দাবিতে আন্দোলন করছিল। তবে রোববার তাদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ বেধে গেলে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ করেছে।