নিউজ ডেস্ক: দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের জনগণের কাছে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিয়ে অল্প দিনেই জনপ্রিয়তা অর্জনকারী ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। বিকাশের মাধ্যমে লেনদেন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ গ্রাহক এবং এজেন্টরা। এদিকে, এজেন্টের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে অর্থ লুটসহ নানাবিধ হয়রানি-প্রতারণার অভিযোগ বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, বিকাশ, গ্রামীণফোন এমনকি পুলিশ প্রশাসনকে করা হলেও কোন সমাধান পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা। এর সাথে বড় কোন চক্র জড়িত আছে বলে ধারনা করছে সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারিতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিকাশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে গ্রাহক হয়রানি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, সিম রিপ্লেসমেন্ট করে অর্থ লুটসহ লিখিত ও অলিখিত বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে।
রাজধানীর মিরপুরের বিকাশ এজেন্ট মাকসুদা বেগম বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, গ্রামীণ ফোন, বিকাশ এবং কাফরুল থানায় সম্প্রতি বিকাশের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দিয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, “আমার (এজেন্ট) নামে ০১৭৮৮৫০৫৩৩৪, ০১৭৮৮৫০৫৩৩৫ ও ০১৭৮৮৫০৫৩৩৬ সিম নম্বর তিনটি রেজিস্ট্রেশন করা। আমি এ সিমগুলো থেকে বিকাশ করি। নম্বর তিনটিতে ৯২ হাজার টাকা ছিল। গত ১৬ জানুয়ারি আমি বিকাশ এজেন্ট ক্যাশ আউট করতে গিয়ে দেখি আমার সিমগুলো কিছুক্ষণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর মিনিট ১০ পর সিম চালু হলে দেখি আমার ৯২ হাজার টাকা নেই। হ্যাকিং করে সব লুট করে নিয়ে গেছে”।
ভুক্তভোগী এ ব্যবসায়ী বলেন, “বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে বিকাশকে জানিয়েছি। পরবর্তীতে লিখিতভাবে বলেছি কিন্তু এখনো পর্যন্ত কোন সুরাহা পাইনি। থানায় জিডি, গ্রামীণ ফোন, বিটিআরসি সবাইকে লিখিতভাবে জানানোর প্রায় একমাস অতিবাহিত হলেও কোন আশা দেখতে পেলাম না।”
তিনি বলেন, “বিকাশের এ সেবা আগে অনেক ভাল ছিল। আমরাও গ্রাহকদের ভাল সেবা দিতে পেরেছি। অনেক ব্যবসায়ী এ সেবা দিয়ে তাদের জীবিকা অর্জন করছে। কিন্তু এটা এখন অভিশাপ। আমার মত অসংখ্য ক্ষুদ্র এজেন্ট প্রতিনিয়ত এমন আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়ছে, কিন্তু বিকাশ কর্তৃপক্ষসহ কেউ কোন সমাধান দিতে পারছে না।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকে করা লিখিত অভিযোগে রুহুল আমিন নামে এক এজেন্ট জানিয়েছেন, গত ২১ জানুয়ারি তার নিজ নামে রেজিস্ট্রিকৃত গ্রামীণ ফোনের ০১৭৭৭৬৭৩৯৪৫, ০১৭৭৭৬৭৩৯৪৬ ও ০১৭৭৭৬৭৩৯৪৭ নম্বর তিনটি তার অনুপস্থিতিতে রিপ্লেস করা হয়। এ নম্বর তিনটি দিয়ে তিনি বিকাশ করের। এতে ১৭ হাজার ৫৯৬ টাকা ছিল। রিপ্লেস করার পর আর টাকা নেই।
রাজধানীর রজনীগন্ধা সুপার মার্কেটের সোহেল টেলিকমের স্বত্বাধিকারী মো: সোহেল জানান, চলতিমাসের ১১ তারিখে তার ০১৭৮৭৭১৫৮১০, ০১৭৮৭৭১১৯২৭, ০১৭৮৭৭১৫৮৪২, ০১৭৮৭৭১৫৮৪৯, ০১৭৮৭৭১৫৮৬৫, ০১৭৮৭৭১৫৮৫৯ ও ০১৭৯০০৬২২২৬ নম্বরগুলোতে এক লাখ টাকা ছিল। তার অবর্তমানে কেরানীগঞ্জের জিহাদ টেলিকম থেকে কে বা কারা এটা রিপ্লেস করে টাকাগুলো তুলে নিয়েছে। বিকাশ এখনো এর কোন সমাধান দিতে পারিনি।
এজেন্টের মতো প্রতিনিয়ত হয়রানি ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে বিকাশের লাখ লাখ গ্রাহক। বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি চিঠির মাধ্যমে বিকাশকে সতর্ক করলেও কোন মাথা ব্যথা নেই তাদের। তাছাড়া, নেটওয়ার্ক ত্রুটির কারণে হঠাৎ করে সেবা বন্ধ করা দেওয়ায় বিপাকে পড়তে হচ্ছে গ্রাহক এবং এজেন্টকে। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪ দিন মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বন্ধ করে দেয় বিকাশ। এতে লাখ লাখ গ্রাহক এবং এজেন্টের দুভোর্গের অন্ত ছিলো না।
এ প্রসঙ্গে বিকাশের মিডিয়া রিলেশন ম্যানেজার জায়েদুল ইসলাম লিখিত ব্যাখ্যায়বলেন, আমাদের কোন প্রকার দুর্বলতা বা ত্রুটি নেই। এজেন্টের অসচেতনতার কারণে এমন ঘটনা ঘটছে।
তিনি বলেন, বিকাশ-এর অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের পিন নম্বর গ্রাহকের বাইরে অন্য কারও জানা সম্ভব নয়। এমনকি বিকাশ-এর কোন কর্মকর্তার পক্ষেও জানা সম্ভব নয়। বিকাশ সব সময় তার গ্রাহকদের পিন নম্বর গোপন রাখতে সতর্কতামূলক প্রচারণা চালিয়ে থাকে।
এজেন্টরা কেন এটাকে অভিশাপ হিসেবে নিচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সারাদেশে আমাদের প্রায় ৮০ হাজারের বেশী এজেন্ট রয়েছে। যদি গ্রাহকের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে প্রতারক চক্র কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটায় তা একেবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা ০.০০০০১% এরও কম। বিকাশ মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং সেবা বহির্ভূত বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নে বিশাল ভূমিকা রেখে চলছে।
এজেন্টের আর্থিক ক্ষতির দায় কে নিবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যদি কোন গ্রাহকের সিম রিপ্লেস হয় তবে উক্ত পরিবর্তন সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের মোবাইল অপারেটর ছাড়া অন্য কারও জানা সম্ভব নয়। সিম আর পিন-এর যৌথ প্রয়োগ ছাড়া বিকাশ সিস্টেমে কোন লেনদেন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। কিন্তু এজেন্টরা যদি ব্যক্তিগত সিম থেকে ব্যবসায়িক লেনদেন করে কোন অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হন তাহলে দায়ভার সম্পূর্ণ তার।
তিনি আরো বলেন, আমাদের কছে এই ধরণের অভিযোগ এলে আমরা তা তদন্ত করে দেখি। তবে বেশিরভাগ তদন্তেই দেখা গেছে এজেন্টরা তাদের ব্যক্তিগত সিম ব্যবহার করে লেনদেন করে এই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। প্রতারক চক্র সুকৌশলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের পিন নম্বর জেনে গেছে। এজেন্টদের মাঝে সচেতনতাই পারে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধ করতে।
উল্লেখ্য, ২৮টি ব্যাংককে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালুর অনুমতি দেয়া হলেও ১৯টি ব্যাংক চালু করতে পেরেছে। এ সেবায় সবচেয়ে বেশি গ্রাহক ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশের। দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় ১ কোটি ৩২ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১ কোটি ৭ লাখই বিকাশের। সেবা দিতে প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে এজেন্ট নিয়োগ করেছে। গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও এয়ারটেলের গ্রাহক রেজিস্ট্রেশন করে সেবাটি নিচ্ছেন। –