সিসি ডেস্ক: কে জানত বেগুনবাড়ির ১৪ বছর বয়সী নাহিদকে এভাবে অকালে বিদায় নিতে হবে! ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, মায়ের বুক খালি করে তাকে বিদায় নিতে হলো পৃথিবী থেকে। মঙ্গলবার বিকাল পৌনে ৩টায় নাহিদ তার মামার সঙ্গে এসেছিল জাতীয় সংসদ ভবনের পাশের চন্দ্রিমা উদ্যানে। উদ্যানের কোলঘেঁষেই রয়েছে চমৎকার পানির লেক। শখের বসে নাহিদ গোসল করতে নেমেছিল সেখানে। কিন্তু পানিতে নেমেই সে আর থই পায়নি। চোখ-মুখ বন্ধ করে শত কষ্টে শ্বাস নেয়ার চেষ্টা করেছে। হাত-পা ছুড়ে প্রাণান্তকর চেষ্টা ছিল তার পানি থেকে উঠে আসার। কিন্তু অথৈ পানিতে সে ডুবে যেতে থাকে। একসময় দিগ্বিদিক হারিয়ে সে কান্নায় চিৎকার করতে থাকে। এ কান্নার রোল শেষ ফাল্গুনের বাতাসে ভেসে ভেসে আশপাশের মানুষের কানে পৌঁছে। আহাজারি শোনামাত্রই লেকের দিকে ছুটে আসেন অনেকে। হণ্যে হয়ে নাহিদকে বাঁচাতে যখন সবার প্রাণপণ চেষ্টা, ঠিক তখনই বাধ সাধে পুলিশ। কারণ এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা কমিশন থেকে একনেক বৈঠক করে গণভবনে ফিরবেন। প্রধানমন্ত্রী ফেরার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লেকে ছুটে যাওয়া সবাইকে উঠতে বাধ্য করে পুলিশ। তখন আর কারও কোনো উপায় ছিল না নাহিদকে বাঁচানোর।
ঘড়ির কাঁটা যখন সাড়ে ৩টার ঘরে, ঠিক তখনই হুইশেল বাজিয়ে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহর ছুটে চলে গণভবনের দিকে। কিন্তু তখনও প্রধানমন্ত্রী জানেন না, তার নিরাপত্তা নিয়ে পুলিশের বাড়াবাড়ির কারণে নাহিদুল ইসলাম নামের এক কিশোর লেকের মধ্যে বাঁচার জন্য দাপাদাপি করছে। যদি প্রধানমন্ত্রী জানতেন তার এ নিরাপত্তার কারণে একটি কিশোরের জীবন নিভে যেতে বসেছে, তাহলে হয়তো প্রধানমন্ত্রী নিজেই দ্রুতগতিতে উদ্ধারের ব্যবস্থা নিতেন। হয়তো তার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে নিভে যেতে বসা সেই কিশোরের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিতেন। কিন্তু হায়! প্রধানমন্ত্রী গণভবনে যাওয়ার পথে কিছুই জানতে পারলেন না। পরে নিশ্চয়ই এ খবর জেনে প্রধানমন্ত্রী মর্মাহত হবেন। তিনি যে হৃদয়ের মানুষ, তাতে মর্মাহত না হয়ে পারবেন না। হয়তো প্রটোকল কর্তাদেরও তিনি কিছু বলবেন। কিন্তু নাহিদ তো আর ফিরে আসবে না। ফিরবে না মায়ের বুকে।
প্রধানমন্ত্রী নিরাপদে চলে যাওয়ার পর সদরঘাট ফায়ার স্টেশন থেকে ডুবুরি হুমায়ুন কবীর এলেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে নাহিদুল ইসলামের শরীর হয়ে গেল একেবারে নিথর। প্রাণচঞ্চল ছেলের মৃতদেহ নিয়ে তার মায়ের আহাজারি যেন পুরো চন্দ্রিমা উদ্যানকে প্রকম্পিত করছিল। বুকফাটা কান্নায় চন্দ্রিমা লেকে আসা মানুষ কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যায়। লেকের ঝকঝকে পানিও যেন শোকে নির্বাক-নিসব্ধ হয়ে অনেক দূর গড়িয়ে গেছে।
মালিবাগে ডে-লাইট স্টুডিওতে কর্মরত নাহিদের বাবা এখন নির্বাক। কত আশা করে ছেলেকে তেজগাঁওয়ের কমিউনিটি স্কুলে পাঠিয়েছিলেন। সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র দিনে দিনে এগিয়ে যাবে; একদিন সে পড়াশোনা শেষ করে মানুষের মতো মানুষ হবে- এমন প্রত্যাশা ছিল অনেক দিন থেকেই। কিন্তু আজ পুরো পরিবারের প্রাণ নাহিদ ঘরে ফিরল প্রাণহীন হয়ে। bdtoday