রইজউদ্দিন রকি:
আমাদের দেশের মানুষ একটু সুখ-শান্তি দু’মুঠো খাবার জন্য, অন্যায় অবিচার থেকে রেহাই ও জাতীয় মুক্তির জন্য যুগযুগ ধরে লড়াই সংগ্রাম ও সশস্ত্র যুদ্ধ করেছে। এই লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তিনবার দেশ বদল করেছে। ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান, পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। সরকার বদল করেছে অসংখ্য বার। বারবার দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও এদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। কথাটা বলা মনে হয় ঠিক হলো না । কারণ এদেশের ধনিক শ্রেনীর ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে উর্ধ্বমুখী এবং কৃষক, ক্ষেতমজুর, শ্রমিক, মুটে মজুর, রিক্সাওয়ালা, ঠেলাগাড়ীওয়ালা, কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি এদের পরিবর্তন হয়েছে নিম্নমুখী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ধনি লোকটির দশ লাখ টাকা ছিল, সে এখন দশ কোটি টাকার মালিক। যে ছিল এক কোটি টাকার মালিক যে এখন বুনে গেছে একশত কোটি টাকার মালিক। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে এদেশের মানুষ বাইশ পরিবারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। এখন আমাদের দেশের সরকার সমুহের আর্শিবাদ ও অনুক’ল্যে বাইশ হাজার ধনিক পরিবারের সৃষ্টি হয়েছে। এদের হাতে যে টাকা আছে তা দিয়ে হয়তো আমাদের দেশের মত এমন পাঁচটি দেশকে কিনতে পারবে। এমনি অবস্থায় রাষ্ট্রের ভূমিকা হয়ে পরে গৌণ। রাষ্ট্র হয়ে পরে ব্যক্তিনির্ভর, সমষ্টিনির্ভর নয়। যখন ব্যক্তি বিশেষের দিকনির্দেশনায় দেশ পরিচালিত হয় তখনই দেশটি হয়ে যায় ধনিক শ্রেণীর। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় ধনিক শ্রেণীর স্বার্থে। অন্যদিকে কৃষক, ক্ষেতমজুর, শ্রমিক, মুটে-মজুর, কামার-কুমার, জেলে-তাঁতি হয় নিষ্পেষিত। এটাই হয়েছে আমাদের দেশের মানুষের দুর্ভাগ্য ও নিয়তি। অপরদিকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে কৃষক ছিল দশ বিঘা জমির মালিক, তার হাতে জমি এখন তিন বিঘা। যার হাতে ছিল তিন বিঘা সে আজ ভূমিহীন এবং যে লোকটি ছিলেন ভূমিহীন ক্ষেতমজুর বর্তমানে সে ভিক্ষুক। একাত্তরের ক্ষেতমজুর তার একমাত্র শ্রম শক্তি হারিছে ভিক্ষুকে পরিণত হয়েছে। একাত্তরের শ্রমিক, যে তার শ্রমশক্তি দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। সেও এখন বেকার। আর বেকারত্বের অভিশাপে সে এখন ভিক্ষারী। এমনটি কেন হলো? এর পেছনে কারন কি? সচেতন মহল একটু চিন্তা করলেই উত্তরটি সামনে চলে আসবে। তাই এ বিষয়ের ব্যাখায় না গিয়ে অন্য বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। তা হলো আমাদের দেশের হত দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনাচার নিয়ে। কিভাবে চলছে তারা। এরই একটি ছোট্ট দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে চাই। আমি তখন প্রাইমারী স্কুলের ছাত্র আমাদের গ্রামের বাড়ি পোড়াহাটের দুর সর্ম্পকের চাচা নাম তছলিম। চাচার অনেক জমিজমা ছিল। আর্ধিক অবস্থা খুবই ভালো। সময়ের পরিবর্তনে বিলীন হয়ে যায় তার অর্থ জমাজমি। আমাদের শহরের বাসা থেকে বেশ দুরেই চাচার জামাইর বাড়ি। চাচা মারা যাবার পর জামাইয়ের তত্ত্বাবধানে থাকে তছলিম চাচার স্ত্রী। জামাই একজন দিন মজুর। কষ্টেশিষ্টে দিন যায় তার। চাচির দুর্ভাগ্য এখনও বেঁচে আছেন। মাঝেমধ্যে দেখা হলে খোঁজ-খবর নেওয়া এ পর্যন্তই শেষ। তবে সে যে কষ্টে আছেন অনুভব করতাম। কিছু দিতে পারতাম না। কারণ আমার অর্থক অবস্থা তেমন না। যে চাচিকে কিছু দিয়ে সাহায্য করি। হঠৎ একদিন সকালে আমার বাসায় এসে হাজির চাচি। গল্পে গল্পে আমার স্ত্রীর নিকট আক্ষেপ করে চাচি বলছেন, সে যে কবে ইলিশ মাছ খেয়েছিলেন তা তার মনে পরে না। আর খাবেই বা কেমন করে! ইলিশ মাছ তো খাওয়া হতদরিদ্র লোকজনের কাছে চাট্টিখানি কথা নয়। যার মূল্য চারশত থেকে ছয়শত টাকা কেজি। মাগুর মাছ, শিং মাছ ও কই মাছের তো কোনো কথাই নেই। এক পোয়া মাছের দাম এক থেকে দেড়শত টাকা। এই মাছ খওয়া তাদের কাছে শুধুই স্বপ্ন। এসব গল্প শুনে আমি বিস্মিত না হয়ে পারলাম না। আমাদের দেশের বড় বড় নেতারা সহসাই বলে থাকেন, মাছে-ভাতে আমরা বাঙ্গালি। সেই মাছ এখন গরিবের কাছে দুঃস্বপ্ন। আমি কিছুদিন পূর্বে আমার নানা বাড়ি গোলহাট গিয়েছিলাম। রাতে একজন দিন-মজুর এর বাড়ি গেলাম। সে আমার খুবই পরিচিত। নাম উমালু। তার বাড়ি গিয়ে দেখি পরিবারের সবাই খেতে বসেছে। ছেলে-মেয়ে ওরা স্বামী-স্ত্রী মিলে পরিবারের সংখ্যা পাঁচজন। সেদিন উমালু খুব কষ্ট করে আধা কেজি গরুর মাংস এনেছে। ছেলে মেয়েরাও সবাই খুশি। রাতে খাবার পালা। ছোট ছেলে বকুলকে কয় টুকরা মাংষ দিয়েছেন আমি যানি না কিন্তু ছেলেটি মাংস খেয়ে মায়ের কাছে আরও মাংস চাইছে। মা তাকে শান্তনা দিচ্ছেন, আর যে মাংস নেই! ছেলেটি মা’র কাছে বার বার মাংস চাইছে। মা অপারগ। এক পর্যায়ে ছেলেটি মাংস না পেয়ে রাগ করে ভাতের থালা ফেলে দিল। ওমনি ছেলেটিকে মা কিল ঘুষি এমন কি লাথিও মেরে দিল তার পিঠে। এই অবস্থা দেখে মনে পরে গেল কিশোর কবি সুকান্তের বিখ্যাত কবিতার সেই পঙক্তিটি ‘ ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’। তাই নিরন্ন মানুষের কাছে সুকান্তের কবিতাটি যেন এখনও প্রাসঙ্গিক। আমার আর একটি অভ্যাস আছে। রিক্সায় উঠলেই রিক্সাওয়ালার সাথে কথোপকথন করা। যেমন- কত টাকা সে দিন আয় করে, কত জন পরিবারে খানেওয়ালা? যা কামাই করে তা দিয়ে তার সংসার চলে কি না? ছেলে-মেয়ে কত জন? মাছ-মাংস কিনতে পার কি না ইত্যাদি ইত্যাদি। একদিন এক রিক্সাওয়ালা বললেন, মাংস কিনবো কি করে? যা কামাই চাল আনতে ডাল নেই। ডাল আনলে লবণ শেষ। তেল কেনার সাধ্য জুটেনা। তবে মাংস বছরে একবার খাই সে কোরবানী ঈদে। তাছাড়া আর কিনে খাওয়া সম্ভব হয় না। সে আরও বললেন, এবার রোজার মাসে একদিন মাত্র ছোট মাছ কেনা সম্ভব হয়েছিল। আর বাদ বাকি দিন হয় আলু ভর্তা আথবা লবণ মরিচ দিয়ে ভাত খাওয়া হয়েছে। কারণ বড়রা বুঝলেও তো ছোটরা বুঝেনা। তাদের ঈদে নতুন কাপড় কেনা লাগে তাই ভর্তা ভাত খেয়ে চলতে হচ্ছে। তখন আমি বললাম, তাহলে এবার ঈদ মোটামুটি ভালই কাটবে? সে দির্ঘ শ্বাষ ছেরে বললো, আরে রাখেন তো ঈদ, রমজান আর ঈদতো হলো আমাদের গরিব মানুষের জন্য অভিশাপ । রমজান আর ঈদ আসা মানেই জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া। ঐ যে রমজান আর ঈদে জিনিসের দাম বাড়ে, তা আর কমার নাম থাকে না। কাজেই রমজান ও ঈদ আসলেই ভয় হয়। রিক্সাওয়ালার ওই সব কথা শুনে মনে হয়- কি দেখলাম, কি করলাম আর কি হলো। তাদের জীবনটা এরূপ দুর্বিসহ। তাদের জীবন মানেই হাহাকার। আর দেশ স্বাধীনের পর ঐ বাইশ হাজার ধনিদের জীবন আকাশ ও মাটি পার্থক্য। বড় দুঃখ্যা ভরা মনে বলতে হয়- দেশটার জন্ম দিল জনগণ, আর ভোগ করছে বাইশ হাজার জন। এটাই হতদরিদ্র জনগণের নিয়তি?