রইজউদ্দিন রকি: ১৯৭১ সালের স্বাধিকার তথা স্বাধীনতার দাবিতে সভা, শোভাযাত্রা এবং গগনবিদারী শ্লোগানে রাজধানীসহ সারা দেশের আকাশ-বাতাস মুখরিত ছিল। সরকারি-বেসরকারী বাসভবন ও যানবাহনে যথারীতি কালো পতাকা উত্তোলিত ছিল। যেসব অফিস খোলা রাখার কথা বঙ্গবন্ধু নির্দেশ দিয়েছিলেন সেগুলো ছাড়া আর সব সরকারী-আধাসরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় অসহযোগ কর্মসূচি পালিত হয়। এমনি বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ২২ মার্চ সকাল সাড়ে ১১ টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় মিলিত হন বঙ্গবন্ধু। ৭৫ মিনিট আলোচনা শেষে বিষন্ন বঙ্গবন্ধু সাংবাদিকদের বলেন, আমি প্রেসিডেন্টকে সুস্পষ্ট ভাবে জানিয়েছি যে, চারটি শর্ত পূরণ না হলে আমরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করতে পারি না। প্রকৃতপক্ষে ২২ মার্চ আলোচনায় ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার আচরণে স্পষ্ট হয় যে, পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপ ও ভুট্টো আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করে গণহত্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২২ মার্চ পত্রিকায় পাঠানো এক বিশেষ বাণীতে বঙ্গবন্ধু বলেন, চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। বুলেট, বেয়নেট ও বন্দুক দেখিয়ে বাংলার মানুষকে স্তব্ধ করা যাবে না। যে কোন আক্রমণ প্রতিহত করতে বাংলাদেশের প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। ৭১’র ২৬ মার্চ সারা দেশে স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ লড়াই শুরু হলেও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে শুরু হয় এরও তিন দিন আগে। সেদিন স্থানীয় সেনানিবাসের পাকিস্তানি সেনারাসহ তাদেরই দোসর অবাঙালিদের একটি অংশ ঝাঁপিয়ে পড়ে শহরের নিরীহ বাঙালিদের ওপর। শহরের সংখ্যালঘু বাঙালিরা ওই দিন দিশাহারা হয়ে যে যেখানে পারেন পালিয়ে যান। আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে। আর যারা পালাতে পারেনি তাদের অনেকেই সেদিন হত্যা কিংবা বন্দি করা হয়। সৈয়দপুর শহরে আটকাপড়া বাঙালিদের উদ্ধার করতে তৎকালীন আওয়ামীলীগ বোতলাগাড়ী ইউনিয়নের সংগঠনিক সম্পাদক ও থানা শাখার কার্যকারী সদস্য মোঃ শমসের আলী বসুনিয়ার নেতৃত্বে বোতলাগাড়ী থেকে প্রায় দুশত মানুষ শহর মুখে যেতে চাইলে কয়া মিস্ত্রিপাড়ায় বাধার মুখে পড়ে তখন তারা শহর অভিমুখ রাস্তায় অবস্থান নেন। অন্যদিকে ওইদিন চিরিরবন্দর থানার আলোকডিহি ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান মাহতাব বেগ শহরের আটকাপড়া বাঙালিদের উদ্ধারের জন্য এগিয়ে আসেন। প্রবীন রাজনৈতিক নেতা শমসের আলী বসুনিয়ার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ২৩ মার্চ আমরা যখন বসুনিয়া পাড়া সড়কে (বর্তমান বাইপাস সড়ক) কাছে অবস্থান করছিলাম এবং থেমে থেমে গুলিছুরছে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের অবাঙালি দোসররা। রাত ১০ টার দিকে একটি গুলি এসে লাগলো বসুনিয়া সড়কে অবস্থানকারী একজনকে, গুলিতে সেখানেই তিনি শহীদ হন। পরে জানা গেল গুলিবিদ্ধ ঐ ব্যক্তির নাম মোশারফ। এই মোশারফের বাড়ীর ঠিকানা পাওয়া যায়নি এখনো। তিনি বলেন, ২৩ মার্চ ভোর রাতে পাকসেনা ও অবাঙালির গুলিতে উদ্ধারের জন্য আসা মাহতাব বেগ শহীদ হন। সেই থেকে দু’-তিন দিন ধরে চলে গ্রামবাসীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগী অবাঙালিদের লড়াই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। পাকিস্তানি সেনারা ঢুকে পড়ে গ্রামগুলোতে। তারা একটির পর একটি গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। ২৪ মার্চ তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (এমপিএ) ডা. জিকরুল হক, ডা. শামসুল হক, ডা. বদিউজ্জামান, ডা. আমিনুল হক, ডা. ইয়াকুব আলী, তুলশীরাম আগরওয়ালাসহ অনেককে গ্রেফতার করে রাখা হয় স্থানীয় সেনানিবাসে। সেখানে তিন সপ্তাহ ধরে নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর। এবং ১২ এপ্রিল রংপুর সেনানিবাস সংলগ্ন নিসবতগঞ্জ বালারখাল নামক স্থানে তাদের হত্যা করা হয়। হত্যা করা হয় সৈয়দপুরের প্রায় ৩০০ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। এভাবেই শুরু সৈয়দপুরে ২৩ মার্চ স্বাধীনতার লড়াই আর স্বাধীনতা লাভ হয় ১৮ ডিসেম্বর।