ঢাকা: বিএনপি আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে পেতে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ ইস্যুতে ভারতের ওপর আন্তর্জাতিকভাবে চাপ প্রয়োগ করার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন তারা।
রোববার বিকেলে রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে বিএনপি আয়োজিত ‘তিস্তা নদীর পানি বন্টন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘অনেকে বলে থাকেন এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন নেই। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আদালতে যাচ্ছে না কেন?’
আসিফ নজরুল বলেন, ‘আইন আছে। তবে অভিন্ন নদীর পানি প্রাপ্তিতে আমাদের আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে পারি আমরা। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে বিষয়টি উপস্থাপন করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সামনে আনতে হবে প্রথাগত আইন, জীববৈচিত্র্য আইন, পরিবেশ আইন ও জলবায়ু আইনগুলো। জিয়াউর রহমানের আমলে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এভাবে চাপ তৈরি করা হয়েছিল। আবারো এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
আসিফ নজরুল জানান, ১৯০৯ সালের আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অভিন্ন নদীর পানির ক্ষেত্রে কোনো দেশই এককভাবে এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যেখানে অন্য দেশের ক্ষতি হয়। সুতরাই বাংলাদেশ, ভারত বা চীনের অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে একতরফা কেউই বাঁধ তৈরি করতে পারে না।
ড. নজরুল বলেন, ‘সরকার নিজেই যখন নতজানু হয়ে ভারতকে পানি দিতে চায় তখন অন্য দেশকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যদি বাংলাদেশে কোনো দায়িত্বশীল এবং অভিজ্ঞ সরকার আসে সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে ভারতের কাছ থেকে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ আরিফ বলেন, ‘কংগ্রেসের পরিবর্তে বিজেপি ক্ষমতায় এলেই বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তির বিষয়ে ভারত নজর দেবে এমন ভাবার অবকাশ নেই। কারণ তাদের মূল দৃষ্টি থাকবে পাকিস্তান ও চীনের দিকে। তাই পানি পাওয়ার জন্য আগে জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন।’
বিএনপির লংমার্চের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তিস্তার পানি পাওয়ার জন্য লংমার্চ এখনই বড় ধরনের প্রভাব না ফেললেও ভবিষ্যতে ভারতের জন্য এটি চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
জাতীয় ঐক্য না থাকলে শুধু কূটনীতির ওপর নির্ভর করে পানি প্রাপ্তির আন্দোলন কতটা সফল হবে, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
তিস্তা নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট এলাকায় যে ধরনের পরিবেশগত সংকট এবং উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্ষতি হচ্ছে সেসব বিষয় তুলে ধরেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ড. মাহফুজ উল্লাহ।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। যদিও এখনো তথ্যে পরিপূর্ণ হয়নি। তবুও মোটামুটি সার্বিক বিষয় উঠে এসেছে তাতে।
ড. মাহফুজ উল্লাহ জানান, তিস্তার কারণে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভবিষ্যতে এ পরিসংখ্যান আরো বাড়বে। প্রতিবেদনে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব, ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষতিসহ সব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তিস্তা ইস্যু সফল করতে জনসম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বিএনপি সেটা কতটুকু পারবে তা দেখার বিষয়।
তিস্তার পানি বন্টন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এক্সপার্ট সেল গঠন করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানান আন্তর্জাতিক পানি বিশেষজ্ঞ ড. এস আই খান।
তিনি বলেন, বিভিন্ন ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে ৬ মাসের মধ্যে এটি করা যেতে পারে। এই প্রতিবেদন ভারত, চীন, জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট সব মহলে উপস্থাপন করলে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে।
সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, নদী প্রবাহ বন্ধ হলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। এজন্য এখনই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গোলটেবিল বৈঠক। এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আকতার হোসেন।
অনুষ্ঠানে বুয়েটের পানিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো সাব্বির মোস্তফা খানের গবেষনায় তৈরি ‘তিস্তা নদীর পানি বন্টন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশের’ শীর্ষক একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়।