• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০৭ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

সৈয়দপুর: ১৩ জুন ও মুক্তিযুদ্ধে একটি পরিবারের কাহিনী

rickyঅমিত কুমার আগারওয়ালা: অজোর রক্তের ধারা মিলে গিয়ে একটি সাগরে মিলেছিলো। পতাকার মাঝে যে গোল বৃত্ত, মনে হয় ওই বৃত্তে মিশে আছে মহান মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গনে শহীদের লাল রক্ত।
ইতিহাসে কিছু জঘণ্য উপাত্ত থাকে যা হয়তো ঘটেছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধের সৈয়দপুর প্রেক্ষাপটে দেখা মেলে কলঙ্কময় অধ্যায়। সব যুদ্ধেই যুদ্ধরীতি অনুসৃত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হানাদারের সেই রীতির ধারে কাছেও ছিলো না। প্রতিনিয়ত জেনেভা কনভেনশন লংঘন করে নিরীহ মানুষের উপর চলেছে বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধ সৈয়দপুরের ৪ হাজার নিরীহ বাঙালিকে অকাতরে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে হয়েছে। বলা যায় যুদ্ধের বলি তারা। সেই মহান শহীদদের আত্মত্যাগই তো এনে দিয়েছিলো বাংলার স্বাধীনতা।
৭১’র ১৩ জুন একটি কলঙ্কময় দিন বিশ্বের ইতিহাসে। কিন্তু সেই ইতিহাস নিভৃতেই রয়ে গেছে; কেবলমাত্র প্রচার ও প্রচারণার অভাবে। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইতিহাস বিকৃতির যে পালাক্রম শুরু হয়, তাতেই ঢাকা পড়ে ১৩ জুনের ঘটনা।
সৈয়দপুর শহরে মাড়োয়ারী সম্প্রদায়ের অসংখ্য মানুষের বসবাস ছিলো। আমাদের পূর্ব পুরুষদের অনেকেই ছিলেন বাঙালি কৃস্টির ধারক। আমাদের পরিবার এদেশের সংস্কৃতিকে ধারণ করছেন বলেই তাদের অগ্রজ প্রতীম বাবু তুলশিরাম আগারওয়ালা সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তিনি ঐতিহবাহী শিল্প সাহিত্য সংসদের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছিলেন। বাঙালির সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে বেগবান করতে তিনি ছিলেন আগুয়ান।

বাবু তুলশিরাম আগারওয়ালা সৈয়দপুর তথা এ জনপদের পশ্চাৎপদ নারীদের শিক্ষা বিস্তারে অনন্য ভূমিকা রাখেন। তারই বদান্যতায় ১৯১১ মার্চে গড়ে ওঠে তুলশীরাম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নারী শিক্ষায় উত্তরাঞ্চলে আলোকবর্তিকা হিসেবে এখন প্রোজ্জলতর হয়ে আছে।
আমার বাবা একশ রাজনীতি সচেতন ব্যক্তি ছিলেন। সৈয়দপুরে সুশীল কুমার আগরওয়ালাকে চেনেন না এমন ব্যক্তি বিরল। তাঁর বাবা অর্থাৎ আমার দাদু রামেশ্বর লাল আগরওয়ালা ছিলেন একজন দানশীল মানুষ। আর দাদুর কাকা ছিলেন বাবু তুলশীরাম আগরওয়ালা। দানশীলতায় তুলশী বাবুর নাম অনন্য উজ্জ্বল। আর তার গোটা পরিবারই ছিলেন মূলত বাঙালির সংস্কৃতির চর্চায় অন্যতম পৃষ্ঠপোষক। যা সৈয়দপুরের একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র ভালোভাবে নেয়নি। ওই গোষ্ঠীর লোকেরা বর্বর পাকিস্তানী বাহিনীর সঙ্গে যোগসাজস করে আমাদের পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে।
আমার দাদুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার ইসাহাক আলী মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অনেক স্মৃতির কথা বলছেন। তাঁর কাছে শুনেছি, আমার দাদু রামেশ্বর লাল আগারওয়ালা ও তাঁর কাকা তুলশীরাম আগারওয়ালাকে ২৩ মার্চ রাতেই গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানী বাহিনী। সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টের কোয়ার্টার গার্ডে তাঁদের ওপর চালানো হয় বর্বর নির্যাতন। মাঝে মাঝে দাদু ইসাহাক সাহেবকে চিঠি লিখতেন। এসবে লেখা থাকতো বর্বরতার সব কাহিনী। অনেক ভয়াবহ মর্মবেদনার সেই ইতিহাস। দাদুকে পাকিস্তানী বাহিনী রংপুরের নিসবেতগঞ্জ বধ্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। ১২ এপ্রিলের ওই হত্যাযজ্ঞে সৈয়দপুরের তৎকালিন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) ডা. জিকরুল হক, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. শামসুল হক, ডা. বদিউজ্জামান, ন্যাপ নেতা ডা. এসএম ইয়াকুব, রেলওয়ে কর্মকর্তা মো. আয়েজ উদ্দিনসহ দেড়শ মুক্তিপাগল মানুষ শহীদ হন।
সৈয়দপুরের হিন্দু মাড়োয়ারীদের নিরাপদ ভূমি ভারতে পৌছে দেওয়ার কথা বলে পাকিস্তানী বাহিনী। এমন প্রতারণার কথা অতীতে কেউ কখনও শোনেনি। বেশ কদিন ধরে মাইকে প্রচার চালিয়ে তারা। এতে বলা হয় যেহেতু পাকিস্তানে গন্ডগোল চলছে তাই মাড়োয়ারীদের নিরাপদ স্থানে পৌছে দেওয়া হয়। ১৩ জুন সকালে সৈয়দপুর রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ায় একটি বিশেষ ট্রেন। ওই ট্রেনে তোলা হয় হিন্দু-মাড়োয়ারীদের। কথা ছিলো তাদের পৌছে দেওয়া হবে চিলাহাটি সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে। কিন্তু নির্মম পরিহাস। টেনটি গন্তবে রওনা দেয়। কিন্তু আকস্মিকভাবে তা গোলাহাটে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার উত্তর সীমানায় দার্জিলিং গেইটের কাছে থেমে যায়। এরপর ট্রেন লোক নামিয়ে নির্বিচারে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মাড়োয়ারী শিশু, নারী ও সর্বস্তরে ৪৪৭ জন মানুষকে। ওই হত্যাকান্ডের নাম দেওয়া হয় অপারেশন খরচাখাতা।
গোলাহাট ট্রেন ট্র্যাজেডিতে আমার পরিবারের ১৭ জন সদস্য শহীদ হন। আমরা চাই এই জঘন্য হত্যাযজ্ঞের বিচার। বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছে। এতেই ইতিহাসের কলঙ্কমুক্তি হবে না। যদি সকল যুদ্ধাপরাধীর বিচার না হয়। গোলাহাট ট্র্যাজেডিতে জড়িত সকল খুনি কসাইদের বিচারের আওতায় আনা গেলেই আমরা কলঙ্কমুক্ত হবো। সেই অপেক্ষায় প্রহর গুণছি আমরা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ