নুরুজ্জামান জোয়ারদার: স্মৃতির খাতা যখন ৪৩ বছরের ধূলোয় ধূসরিত তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ছোট-খাটো অনেক ঘটনা মনে পড়ে না। গত ৪ জুন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে গিয়ে কিশোর বয়সী সহযোগী রাম কিশোরকে দেখে চিনতেও পারিনি। অন্যএকজন সহযোদ্ধা তাকে পরিচয় করিয়ে দিলে আবেগ উত্তেজনায় রাম আমাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদে ফেলে। যাহোক, এই মুহুর্তে মুক্তিযোদ্ধে সৈয়দপুরে গোলাহাট বধ্যভূমির কাহিনী লেখার কথা।
স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে এমন কোনো জনপদ নেই যেখানে বর্বর পাকিস্তানী বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারদের বর্বরতার কাহিনী নেই। সব কাহিনী লেখা হয়নি। সংরক্ষিত হয়নি বর্বরতার স্মৃতিচিহ্ন। সোজা সাপটা বলা হয়েছে ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ ধর্ষিতা বীরাঙ্গনা। বীরাঙ্গনা আর শহীদের তালিকা সংরক্ষিত হয়নি। এমনকি মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকা এখানে বিতর্কিত। রাজাকারদের তালিকা ও নেই। তথ্য মন্ত্রণালয় অথবা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। রক্তের দাগ আর গুলির চিহ্ন কবেই মুছে গেছে। কয়েকজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা জাতীয় ‘শো-পিচ’ হিসেবে জাতীয় দিবসে হুইল চেয়ারে বসে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আসেন। শহীদ পরিবারের সন্তানেরা এখনও ধর্না দিয়ে বেড়ান শহীদদের নাম সরকারী তালিকা ভুক্তির জন্যে। কিন্তু হয় না।
৭ জুন রাজশাহী থেকে এলেন শহীদ জাহান আলী বিশ্বাস জুনিয়র চার্জম্যান, সৈয়দপুর রেলকারখানার এজনের নাতি ফয়সাল তার দাদার একটি সনদপত্র নিতে। আবেদন পেশ করলেন ডিএসকে। শহীদ স্মৃতি পার্কের নামের তালিকায় এই নামটি খোদাইকৃত আছে। ২০০৭ সালের ২৫ মার্চ তদানিস্তন ডিএস জনাব আব্দুল মতিন চৌধুরী এটির উদ্বোধন করেন। অথচ শহীদদের কোনো তালিকা রেল কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করে নাই। অনেক খোঁজাখুজির পর ফাইনাল সেটেলমেন্টের একটি রেজিষ্টার থেকে পাওয়া গেল জাহান আলীর নাম। তার দেনা পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে একটি কাগজে জুনিয়র পার্সোনেল অফিসার সই করে দিলেন। তাই নিয়ে ফিরে গেছে নাতি ফয়সাল। শহিদ হওয়ার সনদের পরিবর্তে দেনাপাওনা বুঝে দেওয়ার সনদ। রেল প্রশাসন বল্লেন, এই সনদ দেওয়ার দায়িত্ব মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের, আমাদের নয়। ঠিকই তো। ঐ মন্ত্রণালয় ভূয়া হাজার তিনেক মুক্তিযোদ্ধার সনদ দিয়ে আবার স্থগিত করেছে। বিদেশী মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করতে তাদের পদকের সোনা চুরি করেছে। বাড়িয়ে চলেছে যুদ্ধ না করা মুক্তিযোদ্ধার তালিকা। গোলাহাট বধ্যভূমির কথা লিখতে গিয়ে এসব কথা অপ্রাসাঙ্গিক হয়ে যেতেও পারে। বার্ধক্যের কারণে বেশী কথা বলা অনেকটা অভ্যাসে পরিণত হয়। ৪৩ বছর আগের সেই মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে গেরিলা’র মতো একটি ডকুমেন্টারী বা তথ্যচিত্র নির্মান করা যেতো। লেখা যেতো বিষদ সিন্ধুর মতো যুগান্তকারী রচনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য! সবকিছু বানিষ্ঠীকি করণের কারণে নৈতিকতার জাতীয় অধঃপতন ঘটেছে। এর সাথে উদ্দেশ্যমূলক নানা মিথ্যাচার ঘটিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়েও বির্তক তোলা হয়েছে। সত্যের দলিল ও সাক্ষীর চেয়ে মিথ্যার প্রচারণা প্রবল হয়ে উঠেছে। গোয়েবলস্ ও হার মেনেছে। আমার লেখা সত্য হবে তার তথ্য প্রমান কি? গোলাহাট বধ্যভূমি থেকে পালিয়ে বাঁচা তপন কুমার দাসের কথা লিখে রেখেছিলাম। তাই পাঠকদের সামনে তুলে ধরি ঃ সে সময় ডিগ্রীপাশ করলাম। মাহাতাব বেগ শহীদ হওয়ার পর আমরা সবাই আটকা পড়লাম সৈয়দপুর শহরে। ঘোষণা হলো এয়ারপোর্ট তৈরী হবে এবং আমাদেরকে সেখানে কাজ করতে হবে। সেখানে কাজে নেওয়া হলো। সারাদিন ইটের সোলিং করার পর বাড়ী ফিরে এল আমাদেরকে বন্দী করে নিয়ে যায়। আমাদের সহায় সম্পদ সব লুট করে নিয়ে যায় হাশমী ও কাইয়ুমেরা। ওরা বাসে তুলে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে সাতদিন বন্দী রাখে এবং সেখানেই চেক সই করিয়ে নেয় অনেকের। ৭ দিন পর আমাদেরকে ভারতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সকাল ৬ টায় রেলস্টেশনে এনে ৪টি বগিতে ঠাসাঠাসি করে তোলা হয়। আমরা তখন অনুমান করলাম কি হতে যাচ্ছে। ট্রেনখানা এসে গোলাহাট মাঠের মধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে থেমে পড়লো। ওরা কিলঘুষি মেরে বল্লো নামো সবাই। আমরা তখন বল্লাম, আমাদেরকে গুলি করে মারো। তখন তারা বল্লো, গুলির অনেক দাম। তখন তারা একে একে নামিয়ে তলোয়ার দিয়ে কাটতে শুরু করলো। আমরা মেয়েদেরকে বল্লাম, তোমরা গায়ে আগুন লাগাও। আমি জানালার সাটার ভেঙ্গে লাফিয়ে পড়লাম ট্রেনের পূর্বপার্শ্বের অনেক নিচু যায়গায়। হত্যা চলছিল পশ্চিম পাশ্বে। প্রায় ১০/১৫ ফিট নিচে পড়ে দেখি, অনেকেই আমার মতো লাফিয়ে পড়তে গিয়ে গুলি খেয়েছে। আমরা বৃষ্টির মধ্যে দৌড় দিয়ে পালিয়ে ২১ জন বেঁচে যাই।
তপন কুমার দাসের এই সাক্ষাৎকারে জানা যায় ৪১৩ জন মাড়োয়ারী নারী-পুরুষকে গোলাহাট বধ্যভূমিতে আনা হয়েছিল। ‘অপারেশন খরচা খাতা’ শিরো নামে ২৫ জুন ২০১০ সনে ‘প্রথম আলো’ পত্রিকায় এমআর আলম একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাতে উল্লোখ আছে ৪৩৭ জন নিরীহ হিন্দু মাড়োয়ারীকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। সংখ্যার বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারতো বেঁচে যাওয়া সেই ঘটনার মানুষগুলি। কিন্তু তাদের কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই। ১৯৭১ এর ১৩ জুনের ঘটনা যে ভাবেই যে বলুক আর লেখুক চারশতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। সেই বধ্যভূমি নিয়ে ৪৩ বছরে অনেক স্বাধীনতার চেতনার কথা বলা হয়েছে, লেখা হয়েছে কিন্তু কিছুই করা হয়নি। যথারীতি চাষাবাদ হচ্ছে সেখানে। স্থানটাকে অন্ততঃ চিহ্নিত করার দায়িত্ব ছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।
১৩ই জুন গোলাহাট বধ্যভূমিতে হত্যাকান্ড ঘটনার আগে ও পরে সৈয়দপুর শহরে কয়েকটি উল্লেখ যোগ্য ঘটনা ঘটেছিল।
২ই মার্চ সৈয়দপুর থানায় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে শহরের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে একটি অধিবেশন বসে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রংপুরের জেলা প্রশাসক, আব্দুর রউফ এমপি, মতিয়ার রহমান, মতিন হাশমী এবং আরো অনেকে। ২৩ মার্চ বাঙালীরা শহর ঘেরাও করে। ২৪ মার্চ শহরের পূর্বদিকে গুলাগুলি হওয়ার পর সকাল ১১ টার দিকে হাজার দুই মানুষ নিয়ে শহীদ এসএম মাহতাব বেগ শহরে অবরুদ্ধ বাঙালীদের মুক্ত করতে তার পয়েন্ট টু-টু রাইফেল, একটি বন্দুক ও একটি পিস্তল, বল্লম, লাঠি ইত্যাদি অস্ত্রসহ পশ্চিম দিকে আক্রমন করেন। শত্রুর গুলিতে তিনি শহীদ হন। ঐ রাতে সাহেবপাড়ার বাসা থেকে পেইন্টশপের ইনচার্জ মনিরুজ্জামানকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ২৫ মার্চ থেকে শুরু হয় গণহত্যা, ধর্ষণ ও …. ২৮ মার্চ থানার ওসি আবুল ফজলকে বরখাস্ত করে এসআই জামালুদ্দীনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ৩১ মার্চ সারা রাত ধরে ক্যান্টনমেন্টে ইপিআরদের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলাগুলির আওয়াজ শোনা যায়। সেই থেকে বাঙালীদের নিধন যজ্ঞ। থাকে বাড়ীতে, পথে ঘাটে, কারখানাতে সর্বত্র।
১৫ এবং ১৬ এপ্রিল শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয় কারখানার ভিতরে বাহিরে। ১৭ এপ্রিল সৈয়দপুর হাইস্কুল এবং দারুল উলুম মাদ্রায় প্রায় হাজার খানেক বাঙালীকে আটক রাখা হয়। পরে এয়োরপোর্ট নির্মানের হিসাবে ব্যবহার করে পিঠে চাবুক মেরে কাজ করানো হত। তাদের অনেকে এখনও জীবিত আছেন। তাদের রক্তঘামের স্মৃতিতে নির্মিত এয়ারপোর্টের নাম হতে পারতো ‘সৈয়দপুর মুক্তিযুদ্ধ এয়ারপোর্ট’। কিন্তু হয়নি।
বাঙালী জাতি তার ৭১ এর চেতনা ধারণ ও লালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। যখন নানা রকম বিভ্রান্তি ও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষক, জাতীয়তা ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি নিয়ে। বদলে গেছে ৭২ এর রক্তে ধোয়া গন্তবিধান বাঙালীর সংস্কৃতি, স্বাধীনতার গর্ব, জাতীয় ঐক্য প্রতিনিয়ত আক্রান্ত তাই বধ্যভূমির স্মৃতি ও শহিদদের তালিকা ৪৩ বছরেও সংরক্ষিত হয়নি যথাযথ ভাবে। কালের প্রবাহে মিলে মিশে বাঙালীরা একাকার হয়ে যাচ্ছে। যেমন শৃঙখলিত নিগ্রো আফ্রিকান এখন সাদা প্রস্তুত্বকারী বংশধরদের সাথে মিশে নাগরীক সম-অধিকার ভোগ করছে যুক্তরাষ্ট্রে। এমনকি ….. হতে পেরেছেন সেদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতি। ইতিহাস একথাই বলে, “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই”।