• বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৪ পূর্বাহ্ন |
শিরোনাম :
সৈয়দপুরে চিপস কারখানার ৫০ হাজার টাকা জরিমানা নীলফামারীতে ছাই ছড়িয়ে পরিবেশ দূষণের দায়ে অটো রাইস মিলের জরিমানা রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিকদের পাচার সৈয়দপুর আর্মি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূঁজি বাজারে বিনিয়োগ বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: ১০ দিন পর স্কুল শিক্ষিকার মরদেহ উদ্ধার জয়পুরহাটে জাতীয়তাবাদী যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত কারাগারে নেওয়ার সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান: পুলিশ আহত মাদকের টাকার জন্য বাবাকে পিটিয়ে হত্যা, ছেলে পলাতক আইজিপির ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিল পুলিশ সদর দপ্তর দাঁড়িপাল্লার ছবি সরানোর উদ্যোগ, থাকছে নৌকা

প্রয়াত স্বপন আদনান’র দুটি লেখা

Sopon Adnanঘাস, শাক এবং সাপ

একাত্তর। প্রায় চার মাস পরের ঘটনা। তখন তা দেশের আনাচে-কানাচে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। পাক সেনারা খবর পেয়ে গ্রামে-শহরে আক্রমণ শানাচ্ছে। তাদের তাণ্ডবলীলায় ছারখার হয়ে যাচ্ছে গ্রামগুলো। সুযোগ বুঝে মুক্তিযোদ্ধারাও হামলা করছে পাকসেনাদের ঘাঁটিতে। এ ধরণের আক্রমণের সময় দুরুম্ দুরুম্, ঢিচ্, ঠা-ঠা-ঠা আওয়াজ ইথারে ভেসে আসে আমাদের কানে। গোলাগুলির শব্দ প্রথমদিকে শুনে আতংকিত হতাম। পরে ডাল-ভাত হয়ে গেছে। ডন্ট কেয়ার। আমরা যে যা করি প্রতিদিন, তাই করি। রান্নার জন্য খড়ি সংগ্রহ, চিকন লম্বাটে অগভীর নদীতে (বর্তমানে বিসিক শিল্প নগরীর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত) এবং অসংখ্য ডোবাগুলোতে মাছ (পরিবারের তরকারির চাহিদা মেটানোর জন্য) ধরে বেড়াই।
আমতলায় একদিন খেলার সময় একজন পাকসেনা সেখানে হাজির। আমাদের ডাক দেন। আমরা কেউ কেউ ভয় পেলেও সবাই ওনার সামনে গিয়ে দাঁড়াই।
উনি বলেন, লাড়কালোগ কেয়া ক্যারতা এঁহা?
খেলতা হ্যায়। একজন বলে।
কেয়া খেলতা?
দাঁড়িয়াবান্ধা, গুল্লি।
ইয়ে সাব ক্যায়সা খেল হ্যায়?
আমরা দাড়িয়াবান্ধা খেলে দেখাই। দেখে হা-হা করে হাসেন। তারপর একটি সিগ্রেট ধরান। সিগ্রেটের ধোঁয়া উদগীরণ করে বলেন, খেল মাজেকা হ্যায়। আপনা মুলুকমে যাকে আপনা লাড়কেলোগকো হাম শিখায়েঙ্গে। একটু থেমে আবার বললেন, লাড়কালোগ, আভি তুমলোগোকো হামারা সাথ যানা পাড়েগা। হামারা ক্যান্টনমেন্টমে বহোত জাংগাল হুয়া, তুমলোগ সাফ কারেগা। কোই ডার নেহি। চালো সাব লাড়কালোগ। কোই ভাগেগা নেহি।
ডার, ভাগেগা নেহি, শব্দ দুটো শুনে ভেতরে ভেতরে আমি বেশ ভয়ে অস্থির। চতুর্দিকে উনি তাকিয়ে আছেন যেন কেউ পালিয়ে না যায়। আমার ভেতর ভয়টা আরো জোরালো হয়ে ওঠে এজন্য যে, ডার ও ভাগেগা নেহি বলার কারণটা কি? পালিয়ে গেলে কি এ যাত্রা জীবনে বেঁচে যাবো। আমার ভেতরে সন্দেহটা ভীষণ রকমের দানা বেধে উঠতে থাকে, যদিও বিহারীদের হাত থেকে এই পাকসেনারাই শহরের বেঁচে যাওয়া বাঙালিগুলোকে ক্যাম্প করে দিয়ে বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। এই পদপে পাকসেনারা না নিলে কবেই আমরা খরচা খাতা (লিবারেশন পিরিয়ডে বিহারীরা হত্যাকে কটা করে নামকরণ করে খরচা খাতা অর্থাৎ কচুকাটা) হয়ে যেতাম। যদিও সেনারা অন্যান্য স্থানে বাঙালিদের উপর তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে, এখানে তার উল্টো। ওদের উদ্যোগে এখনো আমরা বেঁচে আছি। তবে সারাদেশের অপারেশন আমাদের অজানা নেই। বিবিসি’র মাধ্যমে সব জানা যায়। ভয়টা এখানেই। ভয়টা আরো গাঢ় হয় লিবারেশনের শুরুতেই শহরের নৌকা মার্কার প্রার্থী ডাঃ জিকরুল হক, গোলো চাচাসহ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের অনেককে চোখে কালো পট্টি বেধে অজানা স্থানে নিয়ে যায় খান সেনারা এবং সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এসব আমাদের বাবা, চাচা, বড় ভাই টাইপের মানুষদের মুখ থেকে শোনা। এনারা যখন জটলা বেঁধে ঘটনা ফিসফিস করে চর্চা করে তখনই শুনেছি। চোখে কালো পট্টি, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো, তারপর বিকট শব্দে গুলি। ধড়াম ধড়াম করে ইরি েেত আছড়ে পড়ার শব্দ। সব শেষ। এই দৃশ্যটা আমার চোখে ভেসে উঠতে থাকে কিন্তু কাউকে বলতে পারছি না, আমাদের নিয়ে যদি সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে…।
আবার তিনি তাড়া দিলেন, লাড়কেলোগ সাব চালো। দেরী হো রাহা।
আমি গুনে দেখি উনিশ জন। যেন কেউ আমাদের ইন্দ্রজালে আবদ্ধ করেছে, আমরা আর আমাদের মধ্যে নেই। আমাদের নিজস্ব সতর্ক ইন্দ্রিয় আটকা পড়েছে যাদুকরের সাঁড়াশীতে। অক্টোপাসের কোলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছি আমরা। মন্ত্রমুগ্ধের মত আমরা খান সেনাটির পিছন পিছন হাঁটতে থাকলাম। দারুল উলুম থেকে আর্মি ক্যাম্প খুব দূরে নয়। খুব বেশি একশ দেড়শো গজ হবে। ওখানে থেকেই ক্যাম্পের শুরু। ক্যাম্পের পরিধি হবে দেড় মাইল স্কয়ার। আমরা খান সেনাটির পিছন পিছন (বর্তমানে যেখানে উপজেলা আদালত ও ক্যান্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ) ঘাস গজানো এলাকায় এলাম। সারিবদ্ধভাবে আর্মি কোয়ার্টার। এক কামরা বিশিষ্ট কোয়ার্টার পূর্বদিকে যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকেই শুরু হয়েছে ঘাস। কয়েক মাস পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়নি বলে ঘাসগুলো অর্থাৎ কাশবন, ভেতরে ভেতরে ঘাসও আছে, আর এরই ফাঁকে ফাঁকে লাল শাক। সাদা ও লাল শাকগুলো হাঁটু সমান হবে। শাক দেখে আমাদের সবার জীভে জল আসার মতন অবস্থা। আমরা ক্যাম্পে যে জীবন যাপন করি, প্রতিটি দিন কেমন যাবে, কি খাবো এই চিন্তা প্রতিটি অভিভাবকদের। সেটা ভেবেই যে যেভাবে পারে খড়ি, তরিতরকারি সংগ্রহে মাথা ঘামিয়ে থাকি।
খান সেনাটি সৈন্যের ড্রেস পরে আছে। কোমরে বেল্ট। উচ্চতায় অন্যান্য খান সেনাদের চেয়ে খাটো। চেহারায় তামাটে রং। গোঁফ নেই। মুখমণ্ডলটা প্রায় বাঙালিদের মত। মাথায় হেলমেট নেই। যে হেলমেটগুলো ঘাস রঙের এবং তাতে নেট জড়ানো আছে।
খান সেনাটি বললেন, হোসিয়ারিসে ঘাস উঠাও। এঁহা সাপ হ্যায়।
সাপের কথা শুনে আমরা ইতঃস্তত বোধ করি। তবুও ঘাস উপড়ানোর কাজ সবাই শুরু করে দেয়। খাটো ঘাসের গোড়া খুব নরম, টান দিলেই সহজেই মাটিসহ উপরে উঠে আসে। কিন্তু কাশবনের গোড়া খুব শক্ত। কষে টান দিলেও ওঠে না। মাঝখান থেকে বা গোড়ার একটু উপর থেকে ছিড়ে যাচ্ছে কিন্তু গোড়া উপড়ে আসছে না। এর গোড়া এত শক্ত। কাশবনগুলোতে আবার ব্লেডের মত ধার, হাতের তালু ফসকালেই কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা। তবুও সবাই লাইন হয়ে সামনের দিকে পরিস্কার করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর শাক যে যেভাবে পারছে গুছিয়ে গুছিয়ে রাখছে আলাদাভাবে। পরিস্কার করার সময় সবাই ‘হুস হুস’, ‘যা-যা’ শব্দ করছে। সাপ আসলেই যদি থাকে তাহলে শব্দ পেয়ে যেন সরে পড়ে। জঙ্গল পরিস্কার করার সময় একজন পাশের আরেকজনকে ফিস ফিস করে বলে, এই আমার শাক নিবিনা। নিলে ভাল হবে না বলে দিচ্ছি।
খান সেনাটি ঘাস পরিস্কার করা জরিপ করেন সিগ্রেট ধরিয়ে এবং থেকে থেকে একেকজনের নাম জানতে চাইছেন। লালের পর আমার নাম জানতে চাইলেন। বললাম।
উনি বললেন, মিন্টু তুম সূরা জানতা হ্যায়?
জরুর জানতা।
জন্ম থেকেই বিহারীদের সাথে থেকে ভাষাটা ভালই জানা। তবে বিহারীদের ভাষাতো উর্দূ নয়। ইণ্ডিয়ার প্রাদেশিক ভাষা। প্রায় হিন্দি এবং এখানে আসার পর তাদের ভাষা বদলেছে। তাদের ভাষার সাথে উর্দূর সংমিশ্রণে আরেকটি ভাষার জন্ম নিয়েছে। বিহারীদের ভাষার সাথে খান সেনাদের ভাষার আবার কোন মিল নেই (যেমন রংপুরের সাথে অন্যান্য জেলার ভাষার মিল নেই। বিশেষ করে চিটাগাং, সিলেট ও নোয়াখালীর তো একদম মেলে না) তবুও বোঝা যায়। আমিও খান সেনাটির কথা বুঝতে পারছি। উনিও পারছেন।
বললেন, এক সুরা বোলো তুম?
আমি শুরু করলাম, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আলহামদু লিল্লাহে রাব্বিল আলামিন।
আর রাহমানির রাহিম মালিকে ইয়ামুদ্দিন।
বহোত খুব। খান সেনাটি বললেন, কিতনা সূরা মালুম হ্যায়?
সাত।
নামায পাড়তা হ্যায়?
নেহি।
কিঁউ?
আচ্ছা নেহি লাগতা।
কিঁউ।
খেলনেমে আচ্ছা লাগতা।
উনি আবার অট্টহাসি দিলেন। সিগ্রেট ধরালেন আর একটি। বেশ ঘন ঘন সিগ্রেট খান উনি। ওনার সাথে কথা বলার সময় আমার কাজ ছিল বন্ধ। কাজের সাথে ওনার প্রশ্নের মিল না থাকায় আমি সতর্ক। আমার চেহারাটা একটু উপজাতীয় মার্কা। হিন্দু হিন্দু টাইপের। ন্যাড়া মাথা করে দিলে খাঁটি হিন্দু। আমার মনে স্থির ধারণা জন্মে, উনি বোধহয় সন্দেহ করেছিলেন আমি হিন্দু। না হলে সূরা জানি কি-না তা পরখ করে দেখলেন কেন?
এমন সময় আমাদের কেউ কেউ চেঁচিয়ে ওঠে, সাপ-সাপ।
খান সেনাটি আমাদের চেয়েও আকাশ-পাতাল ফাটিয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন, জামশে-দ, ইধার আও ইয়ার, জালদি। সাপ নিকলা। মারনা হোগা।
ওনার চীৎকারে কয়েকজন সৈন্য বুটের ধুপধাপ শব্দ তুলে হাজির। একজনের হাতে বিশাল এক অস্ত্র। যে অস্ত্রটি দেশের জরুরী অবস্থা বা কার্ফুর সময় মিলিটারীদের ট্রাকের মাথায় দুটি ঠ্যাংয়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। আর অস্ত্রের (অস্ত্রটির নাম জানা নেই) মুখটি সামনে তাক করা থাকে। সে ধরণের একটি অস্ত্র একজন সৈন্য মাটির উপর তাক করে সাপ মারার জন্য।
জামশেদ নামের সেনাটি আমাদের সামনের জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যেতে বললেন। ওনারা পেছনে পেছনে থাকলেন। যাতে সাপ কামড়ালে আমাদেরই কাউকে যেন কামড়ায়। তখন ওনারা সাপের অস্তিত্ব ল্য করে একনাগাড়ে গুলি চালাবেন। ঘাস, শাক অনেক হাতড়ানোর পরেও সাপের আর হদিশ মেলে না। আমি তখন ফিস ফিস করে লালকে জিজ্ঞেস করি, এ্যাই সাপ কে দেখেছিলোরে? কে চিৎকার দিয়েছিল?
মুরাদ।
সত্যিই সাপ দেখেছিলি নাকি? আমি মুরাদকে জিজ্ঞেস করি, সাপটার গায়ের রং কেমন রে? না হাকাউ চিল্লিয়েছিস রে?
সত্যিই দেখেছি। বাইন মাছের মত। মুরাদ বলে, আমাকে দেখেই এঁকেবেঁকে চলে গেল।
ভুল দেখেছিস। চোখের ভ্রম হতে পারে। এরকম ভুল অনেকেরই হয়।
সত্যি দেখেছি বলছি।
ফের গুল মারছিস।
মুরাদ আর কিছু বলে না। আমি ল্য করে দেখি, আমরা প্রায় ষাট শতকের মত এলাকা পরিস্কার করে ফেলেছি ইতিমধ্যে। সামনে শাক, ঘাস টাইপের আরো জঙ্গল আছে। কিন্তু খান সেনাটি বললেন, তুমলোগোকা কামসে হাম খুশ হুয়া। তুমলোগ রোটি খায়েগা।
আমরাতো বাঙালি ক্যাম্পবাসী। ভূখা-নাংগা প্রায়। যা খাই দিনে তা কোনরকমে দিন গুজরানো টাইপের। মুখে যেতে না চাইলেও গিলতে হয়। খাওয়ার কথা শুনে আমাদের জীভে চট করে নোনতা জল চলে আসে। মাথা নেড়ে খাবো বলে সবাই সায় দিলাম।
একেবারে কর্ণারের রুমটিই খান সেনাটির। ওই রুমের মধ্যে আমাদেরকে নিয়ে গেলেন। টিউবওয়েলে সবাইকে হাত ধুতে বললেন। বলেই উনি চলে গেলেন রুটি আনতে যেখানে সেনাদের জন্য রান্নাবান্না হয়। আমি ভেবেছিলাম খান সেনাটির ফ্যামিলি হবে বাসায়। দেখি ঘর ফাঁকা। একটি খাটিয়া (বিহারীদের রশি দিয়ে গাথুনীর যে খাটিয়া এবং ছারপোকা ভরা থাকে, এটি সেরকম না)। সেনাটির খাটিয়া অন্য টাইপের।
ইজিচেয়ার একটি, অন্যান্য কোন আসবাবপত্র নেই। শুধু কিছু পোশাক ঝুলে আছে একটি ঝুলন্ত তারের উপর।
দুটি বড় ডিশে করে খান সেনাটি রুটি নিয়ে এলেন। একটিতে রুটি, অপরটিতে ছোলার ডাল। ডালটা সুস্বাদু। সেনাদের খাদ্য খাঁটি তেল-মসলা দিয়ে রান্না বলেই আমাদের এত মজা লাগলো যে, গোগ্রাসে গিলতে থাকি। রুটি শেষ হতেই আরো রুটি এনে দিলেন উনি। খাওয়া শেষ হতেই উনি বললেন, তুমলোগ আব যাও।
আকাশে সূর্যের অবস্থান দেখে আমি বুঝে ফেলি, এখন বেলা তিনটা ছাড়িয়ে গেছে। ক্যাম্পে নিশ্চয় এতণ খোঁজাখুজি শুরু হয়ে গেছে আমাদের। আমাদের গার্জিয়ানরা ভয়ে শহরের দিকে খুঁজতে যাবে না, গেলেও ডোবাগুলোর দিকে যাবে। ওদিকে খোঁজ নেয়া দশ মিনিটের কাজ। আর নেওয়াও নিশ্চয় শেষ। এতণে পরিবারগুলোতে কান্নাকাটির কমপিটিশন গড়ে গেছে হয়তো। তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার। পরিবারের লোকজন রাগ করবে ঠিকই কিন্তু শাক দেখে সবার রাগ নিশ্চয় পানি হয়ে যাবে।
যাওয়ার সময় আমরা শাক জড়ো করে আঁটি বাধতে শুরু করি। আমার আঁটিটি অন্যদের চেয়ে বেশ ছোট। মনটা খারাপ হয়ে যায়। খান সেনাটির সাথে কথা বলার সময় আমার শাক সংগ্রহ কমে যায়। শাকের আঁটি বাধা দেখে খান সেনাটি অবাক হয়ে বললেন, ইয়ে ঘাস তুমলোগ কেয়া কারেগা?
ইয়ে ঘাস নেহি, শাক হ্যায়। আমি বললাম, শাক হামলোগ খাতা হায়?
ইয়েতো ঘাস হায়। তুমলোগ খাতা হায়?
ঘাস নেহি, শাক হ্যায়। পুনরায় বলালাম আমি।
উনি কিছু বললেন না। সিগ্রেট ধরালেন একটা। আমরা শাকের আঁটি নিয়ে হাঁটা ধরি। পেছন থেকে খান সেনাটির আওয়াজ কানে আসে। খান সেনাটি বললেন, ইয়ার জামশেদ, ব্যানচোত ইয়ে বাংগাল হ্যায় জাঙ্গাল, দেখো ঘাস লে যারাহা, খায়েগা। খোদাকা কারিশমা দেখো, ইয়ে ইনশান লোগোকে লিয়ে ঘাস পায়দা কিয়া। লাগতা হ্যায় ইস মুলুককা আদমী বহোত গারীব হ্যায়।

দুটি পাখী দুটি ডিম

একাত্তর। নভেম্বর হবে সময়টা। আমরা তখন দারুল উলুম বাঙালা ক্যাম্পে থাকি। সৈয়দপুর শহরে বাঙালী হত্যাকান্ডের পর যে সব বাঙালী বেঁচে যায়, তাদের জন্যই খান যেনারা এই ক্যাম্প করে দেয়। আমরা আছি এই ক্যাম্পে। বিহারীরা এই ক্যাম্পে এসে মেরে সাবে, সেই সাহস ওদের হয়নি। সম্ভবত সেনাদের জন্যই। দেরে চারিদিকে মুক্তিযুদ্ধ চলছে। গোলাগুলির শব্দ আমাদের কানে দূর দুরান্ত থেকে এসে প্রবেশ করে। ওসব শুনতে শুনতে ডাল ভাত হয়ে গেছে। গায়ে লাগে না। আমরা সকাল সকাল উঠেই প্রতিদিন যুদ্ধে নামি। পেটের যুদ্ধ। একে ঠিক রাখতে হবে। বাবার গাচ্ছিত টাকা দিয়ে কামারপুকুর থেকে চাল কিনে আনি। আর খড়ি, মাছ আমি প্রত্যহ যোগাড় করি। দারুল উলুম ছাড়িয়ে গেলেই প্রথমে একটি ইটের ভাটা পড়ে। ভাটার মালিক পালিয়েছে। ভাটার পর থেকেই অসংখ্য ডোবা। ডোবাগুলো কচুরীপানায় আবৃত। ডোবার গা ঘেষে একটি চিকন (বর্তমানে বিসিক শিল্প নগরীর মাঝ দিয়ে প্রবাহিত) নদী। এতে কোথও হাটু পানি, কোথাও কোমর পানি। প্রতিদিন এতে মাছ ধরি আমি। হাত দুটো দিয়ে কাদার উপর আলতো করে বুলতে গিয়ে দেখা যায়, কোন কোন মাছ (শিংগি) ঘুমোচ্ছে। হাতের ছোয়া পেলেও তাদের ঘুম ভাঙে না। এদের দুই হাতের তালুতে বন্ধি করি। আরেকটি কৌশল আছে, কাদার ভেতর হাত প্রবেশ করিয়ে কাদা হাতড়ালে মাছের অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। অনেক মাছ (গঁচি, পাকাল) কাদার ভেতর বাসা বানিয়ে বসবাস করে। এ ধরনের মাছগুলোকে কাদাসহ উপরে এনে তুলি। কাদা ফেলে দিয়ে মাছটিকে লুংগির কোচরে রাখি। ডোকাগুলোতেও মাছ ধরি। পানি উপরে পানি শূন্য করে ডোবাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের মাছ পাওয়া যায়। আমরা যেন নেশায় পেয়ে বসেছে মাছ ধরা। শীতের সকালে পানি ঠান্ডা হয়ে সকালেও আমি তা গ্রাহ্য করি না। শীতলের স্পর্শে গায়ের লোম ঝাড়–র কাঠির মত খাড়া হয়ে ওঠে। নাকে সর্দি হয়েছ তবুও মাছ ধরায় অ্যাবসেষ করি না। প্রতিদিন আমাদের পরিবারের তরকারীর চাহিদা মেটাই।
চিকন নদীটিতে মাছ ধরার সময় চিকট বোমার শব্দের চমকে উঠি। এতো জোরে বোমার শব্দ এর আগে কখনই শুনিনি। আমি একটু আতংকিত হয়ে উঠি। একা আমি। আর কেউ নেই মাছ ধরার। এত বড় এলাকাটাতে আমি একাই মাছের নেশায় মত্ত থাকি। একটি গরুও নেই। আমি মাছ ধরা বাদ দিয়ে চিকন নদীটির পাড়ে এসে উঠি। তখনই দেখতে পাই আকাশে পার্বতীপুরের দিকে থেকে ডানা মেলে দুটি বোমারু বিমান (পাখী) উড়ে আসছে। ক্যান্টনমেন্টের পূর্ব দিকে দিয়ে। বেশ দুরত্ব বজায় রেখে। ক্যান্টনমেন্ট থেকে অসংখ্য গুলি বর্ষনের শব্দ আসে। পাখী দুটি কবুতরের মত ঘুরপাক দিতে দিতে সোজা চলে যায় পিডিবির দিকে। পাখী দুটির গায়ে সূর্যের আলো পড়ে চিতল মাছের মত চমকাতে থাকে। আমার মাথার উপর দিয়ে চলে যাওয়ার পর পাখী দুটির বিকট গইন শুনতে পাই। পেছন দিয়ে গলগল করে দুজনই বোমা ছাড়ে। আমার মনে হতে থাকে, পাখী দুটি পেছন থেকেই বোম ও ধোয়া একসথে নির্গত করে। পাখী দুটি দুরে চলে গেলে পিচি দুটি খুরপাক দেয় কয়েকবার। একবার সোজা খাড়া উপর দিকে উঠে যায়। কিছুক্ষণ পরই বোমা  ফাটার শব্দ। পাখি দুটি বোম্বিং করেছে পিডিবি’র টেলিট্যাংকে। কালো কালো ধোয়া উঠতে শুরু করে। ধোয়ার পরিধি এত বিশাল যে, বাতাসে হেলেদুলে ধোয়া এমন অস্তিত্ব তৈরী করে তা হিমালয় পাহাড়ের মত মনে হয়। পাখিটিকে আস্তে দেখা যায় না। ঢলে গেছে ওরা বাসায়। আমি ভয় পেয়ে ক্যাম্পে চলে আসি।
বিকেলের দিকে পাখী দুটি আবার আসে। শহরের উপর কয়েক বার চক্কর দেয়। কিন্তু ডিম (বোল্বিং) কোথাও পাড়ে না। একটা জিনিস লক্ষ্য করি, পাখি দুটি ভুল করেও কখনও ক্যান্টনমেন্ট এর উপর দিয়ে যাচ্ছে না। দুজনই ক্যান্টনমেন্টের পূর্ব দিকে তৈরী করে চলাচল করে। খান সেনাদের ছুড়ে দেয়া গুলি যেন তাদের গায়ে না লাগে। পরদিন সকাল ৯টা হবে। পাখিদুটি আবার আসে। সোজা চলে যায় পার্বতীপুরের দিকে। আধঘন্টা পর আবার ফিরে আসে। শহরে কয়েকবার চক্কর দেয়। তারপর আবার চলে যায়। আমরা ক্যাম্পবারীরা পাখী দুটির ঘন ঘন হাজিরা দেয়ায় আতংকিত হয়ে উঠি। ক্যাম্পে বেশ কয়েকটি বাংকার খোড়া হয়। যখনই পাখি দুটি আসে আমরা কানে তুলা দিয়ে বাংকারে হাটু ভাজ করে বসে থাকি। পাশে পাখিদুটি ডিম (বোম্বিং) পাড়লেও বেঁচে যাওয়ার একটা আশা থাকে। সপ্তাহ দুয়েক ধরে দেখি, পাখি দুটি রুটিন মাফিক সকালে ও বিকেল বেলা এসে ঘুরে চলে যায়। কিন্তু ডিম আর পাড়ে না। জরিপ করে খান সেনাদের। একদিন পাখি দুটি রাগ করে একটি ডিম পাড়ে (ন্যাপা বোমা) নতুন বাবুপাড়ায়। দেশের সব স্থানেই শান্তি কমিটি, রাজাকার আলবদর তৈরী হয়েছে। শহরের অনেক বিহারী যুবকের (ঝুড়ি ভাজা, বাদাম, স্ক্রীম, সানপাপড়ী-এক ধরনের মিষ্টি, জীবে দিলেই গলে যায়, বিক্রেতা, রিক্সাওয়ালা) এসব দলে ভর্তি হয়। পোষাক, হেলমেট, গায়ের ভারী বুট জুতো পোরে এসব যুবকেরা মনে মনে পালোয়ান ভাবে নিজেকে। এরা পাকা সড়কের উপর জুতোর গুতো (চাপ) এতো জোরে ফ্যালে, তাতে খট খট শব্দটা বেশী করে বাজে। এই শব্দটা শুনে মহল্লার প্রায় ঘরের জানালা খুলে মেয়েরা মেয়ের মায়েরা আগ্রহ সহকারে তাকিয়ে দ্যাখে। আড়চোখে আলবদর রাজাকার যুবকেরা এসব দৃশ্য দ্যাখে এবং আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে বুট জুতোর খট খট শব্দটা আরো বেশী করে বাজায়। শব্দটা বাজিয়ে তাদের বুকের ছাতি একহাত ফুলে ওঠে এবং যুবতি মেয়েদের ভাবতে বাধ্য করে, এখন হকার নয়, ক্ষমতাধর একজন সে। কোন সময়, যে কারো প্রাণ যে কেড়ে নিতে পারে। এতসব বিশেষ দৃষ্টিতে তাকে দেখা হয়। এমন ভাব নিয়েই এ ধরনের যুবকেরা মহল্লার রাস্তায় সারাটা দিন চক্কর দিতে থাকে। দেয়ার সময় আকাশে আকষ্মিকভাবে পাখীদুটিকে দেখতে পেয়ে একজন রাজাকার যুবক রাইফেল তুলে আনিড়ীভাকে গুলি করে। পাখি দুটি ভিষন রাগ করে। ফিরে এসে নতুন বাবুপাড়ায়  ডিম ফ্যালে এতে প্রায় পঞ্চাশটি ঘর পুড়ে যায়। ঘর ঝেড়ে আগেই পরিবারের লোকজন পালিয়ে যায় অন্য মহল্লায়।
আমার সব সময় মনে হতে থাকে, পাখীদুটির বাসা নিশ্চয় শিলিগুড়ি অথবা বোলিপাতায় হবে। প্রতিদিন সকালে বেলা পাইলট সাহেবরা নাস্তা সেরে পাখী দুটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। ওনাদেরও নেশা হয়ে যায়। প্রতিদিন আসা যাওয়া যেন টিওশনির মধ্যে দাড়ায়। মনে হয় সকালে অংক পড়ে, বিকেলে ভূগোল। ওরা যত আসে, দেশের খান সেনাদের অবস্থা ততই দুর্বল হতে থাকে।
একদিন বিকেলে চিকন নদীতে মাছ ধরার সময় আবার দেখি পাখিদুটিকে। মাছ ধরা বাদ দিয়ে ওদের খেলা দেখতে থাকি। কবুতরের মতন দুজনই সারা শহরে ডিগবাজী দেয়। কখনো উপরে যায়, আবার কখনো এত নীচে আসে, মনে হয় শহরের সবচেয়ে বড় বৃক্ষটির একহাতে উপর দিয়ে চলে যায়। যেন পাখীদুটির লুকোচুরি খেলা। হঠাৎ দেখি, পাখিদুটি এয়ারপোর্টের উপর সোজা আকাশের দিকে উঠে যায় প্রথমে। তারপর আবার নীচে নেমে আসে। ্িদ্বতীয়বার আবার আকাশের দিকে উঠে যাওয়ার সময় পাখিদুটির পেছন দিয়ে যমজ ভাইয়ের মত পাশাপাশি এয়ারপোর্টের উপর দুটি ডিম পাড়ে। তারপর বিকট দুটি শব্দ। তখন পাখিদুটি হাসতে হাসতে অনেক দূর যায়। আর দেখা যায় না।
খান সেনারা এ ঘটনায় ভীষন বিরক্ত। কয়েকদিন পরে আমার বন্ধু লালকে বলি, ডিম দুটো দেখে আসি। গিয়ে দেখি, একটি ডিম এয়ারপোর্টের মাঝখানে, অপরটি কোয়ার্টার মাইল দুরে নীচু কলোনীতে রেল কোয়ার্টারের পার্শ্বে এসে পড়েছে দুটি জায়গাতেই দুটি ডোবা তৈরী হয়েছে। এই ডোবাটাই খান সেনাদের পতনের সংকেত বহন করে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ