খেলাধুলা ডেস্ক: বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলছে! এমিলি, জিয়া, মামুনুলরা মেসি, রোনালদোকে টেক্কা দিচ্ছেন! হাজার হাজার বাঙালি দেশে বসে গলা ফাটাচ্ছেন। এই ‘দিবাস্বপ্ন’ কী কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে? দেখানোর কথা বলে আশা দিয়েছিলেন একজন-কাজী সালাহউদ্দিন। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি। কথা দিয়েছিলেন ২০২২ সালে বিশ্বকাপে খেলবে বাংলাদেশ!
সালাহউদ্দিনের এই কথা আজ বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। বাংলাদেশ আদৌ কোনোদিন বিশ্বকাপে খেলতে পারবে কি না, তাও হয়ত কারো কারো ভাবতে ইচ্ছা করে না। বুক ভারী হয়ে উঠে। কারণটাও স্পষ্ট। এক একটি বিশ্বকাপ এবং বাফুফের নির্বাচন আসে আর ফুটবল কর্তাদের মুখে আশার ফুলঝুরি ছোটে। যেন চাঁদের হাট সাজিয়ে বসেন। কিন্তু নদীর বয়ে যাওয়া পানির মতো তাদের কথাও বয়ে যায়, কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব আছে বললে ভুল বলা হবে। পাইওনিয়ার লীগের শীর্ষ দলগুলোর খেলা দেখলে আপনি এই কথা বলতে পারবেন না। ছোট ছোট ছেলেদের আনাড়ি পায়ের ঝলক দেখে বুঝতেই পারবেন না যে, এরা কিশোর। লম্বা সময় ধরে এদের দেখাশোনা করার কোনো ব্যবস্থা নেই।
আজকের মেসি কিন্তু একদিনে তৈরি হয়নি। বার্সা সেই ছোটবেলা থেকে তিলে তিলে মেসিকে তৈরি করেছে। শুধু মেসি নয়, তার মতো আরো অনেক প্রতিভার পরিচর্যা করে বার্সা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেনের মতো ফুটবল খেলুড়ে দেশ এবং ক্লাব। তারা সেই প্রতিভার ফল ভোগ করে একটা নির্দিষ্ট সময় পর। আর বাংলাদেশ? এখানে শুধু কথার বেলায় সব আছে। শত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের খাতা অলস পড়ে থাকে!
বর্তমান সরকারের ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক। তার কাছেও বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলাটা দিবাস্বপ্নই মনে হয়। কিন্তু তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের মাত্র একটা ফুটবল স্টেডিয়াম। তাও আবার সবসময় পাওয়া যায় না। এই একটা মাত্র স্টেডিয়াম নিয়ে বিশ্বকাপের মতো আসরে সুযোগ পাওয়ার ইচ্ছাটা আসলেই দিবাস্বপ্ন। কিন্তু আমি স্বপ্ন দেখি একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে।’
সেই লক্ষ্যে তিনি কাজও শুরু করেছেন বলে জানালেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে এসেই মাঠের সমস্যা সমাধান করার জন্য পল্টন মাঠ ফুটবলের জন্য রাখার ব্যবস্থা করেছি। এই মাঠে খেলেই আমি, আমিনুল, সালাহউদ্দিন ভাইসহ প্রায় সবাই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে ঢুকেছি। এছাড়া কমলাপুর মাঠটা ২০ বছরের জন্য ফুটবলকে দিয়েছি। সিলেট বিকেএসপি ওপেন করেছি। এছাড়া ফুটবল ফেডারেশনকে রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত করে বছরে ৩৫ কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। এগুলো করা সম্ভব হলে আশা করি ফুটবলে একটা জাগরণ সৃষ্টি হবে।’
বাংলাদেশ যেখানে এখনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গণ্ডি পেরোতে পারেনি, সেখানে বিশ্বকাপে খেলতে হলে কী কী করতে হবে- জানতে চাইলে জাতীয় দলের সাবেক গোলরক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আগে ভিশন দাঁড় করাতে হবে। ঠিক করতে হবে আগামী ২০ বছরে আপনি বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান। দেশে অনেক কোম্পানি আছে যারা ফুটবলে বিনিয়োগ করতে চায়। তাদের সঠিক রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে হবে। এশিয়ার ভেতর যেখানে বাংলাদেশ ফুটবলে দাঁড়াতে পারে না, সেখানে বিশ্ব আসরে যাওয়ার চিন্তা করা আসলেই দুঃসাহস। কিন্তু ভিশন ঠিক রেখে কাজ করতে থাকলে একটা ভালো অবস্থায় দেশকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।’
বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বাদ দিতে বলে সাবেক এই ফুটবলার আরো বলেন, ‘এখনই বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন মাথায় না এনে আগামী ৩০ বছরে যেন বাংলাদেশ এশিয়ান পর্যায়ে ভালো একটা ফর্মে যেতে পারে সেদিকে নজর দেয়া উচিত।’
বিশ্বকাপে খেলতে হলে কী করতে হবে তা কমবেশি সবাই জানেন। যারা দেশের ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন তারা বলেন তৃণমূল পর্যায়ে নজর দেওয়ার কথা। বিনিয়োগ বাড়ানোর কথা। কিন্তু এসবের মাঝে বারবার কাঁটা হয়ে আবির্ভূত হয় স্থানীয় ফুটবল পলিটিক্স। যার অপর নাম দলবাজি। এই দলবাজির নোংরা খেলায় এদেশের ফুটবল কলুষিত হয় অহরহ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপমন্ত্রী জয় বলেন, ‘আমি দায়িত্বে আসার পর চেষ্টা করছি সব বিষয়ে সমন্বয় করতে। এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ডিএফএ এবং ডিএসএ’র মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ছিল তা নিরসনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল নিয়ে কাজ করার কথা সব সময়ই বলে থাকেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন। তার সদিচ্ছার অভাব নেই একথা ফুটবল পাড়ার কমবেশি সবারই জানা। কিন্তু তারও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আর সে সব কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘ফুটবল সেক্টরে আমি ৪০ বছর ধরে আছি। সবাই বলেন এ নিয়ে কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কেউ বলেন না পদ্ধতিটা কী। ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতি জড়িত। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে ১০০ কোটি টাকারও সহযোগিতা পাইনি। তাহলে এই সেক্টর চলবে কীভাবে? তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা কোচের বেতন দিতে হয়। স্টাফদের বেতন দিতে হয় ১৫ কোটি টাকার মতো। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এগুলো আমার ভিক্ষা করে আনতে হয়।’
বাংলাদেশের ফুটবলকে লম্বা একটা সময় ধরে দেখছেন শেখ জামালের কোচ জোসেফ আফুসি। তার কাছে জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশের ফুটবল বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনার কথা। বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রতিভার অভাব নেই। যদি তরুণ খেলোয়াড়দের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে অবশ্যই একদিন বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলতে পারবে। আমি বিশ্বাস করি এটা সম্ভব।’
শেখ জামালের হাইতিয়ান খেলোয়াড় ওয়েডসন। জিয়াদের সঙ্গে বেশকিছু দিন ধরে খেলছেন তিনি। এই বিদেশিও মনে করেন বাংলাদেশ একদিন বিশ্বকাপে খেলতে পারবে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ভালো ভালো অনেক খেলোয়াড় আছে। ১৯৭৪ সালে আমার দেশ জার্মানিতে বিশ্বকাপ খেলতে যায়। একদিন বাংলাদেশও বিশ্বকাপে খেলতে যাবে।’ মোহামেডানের হেনরি ওবুক। এসেছেন নাইজেরিয়া থেকে। বাংলাদেশকে নিয়ে এই বিদেশির চিন্তাটা একটু অন্যরকম। তিনি বলেন, ‘কবে বাংলাদেশ বিশ্ব আসরে খেলবে তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তাছাড়া এটা বেশ কঠিন একটি কাজ। তবে ফেডারেশন যদি চায় এবং সেই চাওয়ার মতো যদি তারা কাজ করে তবে তা সম্ভব।’
সবাই বলেন সম্ভব। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কেননা ১৫ থেকে ২০ বছর পর যে ছেলেকে দিয়ে আপনি বিশ্বকাপে খেলাবেন, তার বয়স এখন কত, সে দেশের কাছ থেকে কী পাচ্ছে? ফুটবল আবহাওয়ার ভেতর দিয়ে কতটুকু বেড়ে উঠছে? বাংলাদেশে বসে চোখ বুজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেওয়া যায়। এ জন্য পেলে কিংবা ম্যারাডোনো হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। দেশে ফুটবল নিয়ে কাজ তেমন একটা নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে, তাও না থাকার মতো। শেষ হওয়া পাইওনিয়ার লীগের দিকে তাকালেই এ দুরবস্থা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। এবার পাইওনিয়ার লীগের বাছাই পর্বের একাংশের খেলা হয়েছে ঢাকার মোহাম্মদপুরের ঈদগাহ মাঠে। সেখানে দেখা যায় ছেলেদের জন্য মাঠে ডাক্তারের কোনো ব্যবস্থা নেই। বাফুফের রেফারিদের কাছে ব্যথা নিবারণের জন্য দেওয়া হয়েছে একটি স্প্রে আর এক টুকরো বরফ! ফুটবল খেলতে গেলে আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে সবসময়। এই পরিস্থিতিতে কিশোরদের মাঠে আসতে দিতে চান না অভিভাবকরা। তাছাড়া যতই দিন যাচ্ছে, ততই সাধারণ মানুষের ক্রিকেটের প্রতি টান বাড়ছে। এর বড় একটা কারণ, সাকিব-তামিমদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়া। এত ফুটবল-বৈরী পরিবেশের মধ্যে কীভাবে ফুটবলের জাগরণ ঘটানো সম্ভব, তা সত্যি ভাবনার বিষয়। কিন্তু এতসব ভেবে এখন আর কাজ কী! শত ভাবনার মাঝেও সুন্দর জিনিসকে অগ্রাহ্য করতে নেই। আপনি কেন করবেন? নিঃশ্বাস দূরত্বে সুন্দরের ডালা সাজিয়ে ইশারা করছে ব্রাজিল বিশ্বকাপ। ছুটে যান। হারিয়ে যান সেই সুন্দরের মাঝে আর আশা রাখুন জীবনের যত অসম্ভবেÑহয়ত বাংলাদেশও একদিন…। উৎসঃ
ঢাকাটাইমস