এম.এন ইসলাম: মানুষ মানুষের জন্য- এ উপলব্ধি গভীরতা মানুষের মাঝেই পরিলক্ষিত হয়। বিধাতার সৃষ্টি মানুষের সেবাই তারা পরম ধর্ম। ধর্ম পালনের লক্ষ্যেই মানুষ সমাজ সেবামূলক সংগঠন গড়ে তুলেন একান্তভাবে নিজের উদ্যোগে। আসলে সমাজ সেবা একটি কঠিন কাজ। শুধু অর্থ বিত্ত থাকলেই সমাজ সেবক হওয়া যায়না। আবার অর্থ বিত্ত না থাকলেও সমাজ সেবকের পরিচিতি লাভ করা যায় না। এটা নির্ভর করে মন ও মানসিকতার উপর। তার কাজের ধরনের উপর। এমন লোক এ শহরে আছে যাদের মাঝে ‘মানুষ মানুষের জন্য-জীবন জীবনের জন্য’ এ উপলব্ধির ছাপ। সাধ্য না থাকলেও মানব সেবার তাগিদ রয়েছে তাদের ভেতরে। এই তাগিদবোধ থেকেই জড়িয়ে যান তারা সমাজ সেবার কাজে। আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্বেও অনেক মানুষ মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে আগ্রহী হয় না। তাই কথায় আছে ভোগেই নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ- এ কথার মর্ম অনুধাবন করে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত না থেকে দেশ, জাতি ও সমাজও উন্নয়ন নিয়ে ভাবেন ও কোন আদর্শ বুকে ধারন করে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি সাংবাদিক নিরঞ্জন কুমার আগরওয়ালা ওরফে নিজু দা। নামটি একবাক্যে সৈয়দপুর শহরের আবালবৃদ্ধবনিতা থেকে শুরু করে সকল শ্রেনীর পেশার মানুষের কাছে চেনা প্রিয় মুখ, চেনা নাম। শহরের শহীদ ডাঃ জিকরুল রোডে জনাকীর্ণ এক কুঁড়েঘরে ১৯৬১ খ্রীঃ তার জন্ম। বাবা স্বর্গীয় শহীদ রামেশ্বর আগরওয়ালা, মাতা শান্তি দেবী আগরওয়ালা। ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তার বাবা, দুই ভাইসহ পরিবারের ৯ জন সদস্য শহীদ হন। সেই সূত্রে নিজু দা শহীদ পরিবারের সন্তান।
আশি থেকে নব্বই দশকের মাঝামাঝি সৈয়দপুর শহরের হাতে গোনা কয়েকজন সংবাদ কর্মীর মধ্যে নিজু দা একজন। তৎকালীন সময়ে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক মুক্তির বাণী ও পাক্ষিক তিলোত্তমা পত্রিকায় লেখোনির মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশায় তার হাতেখড়ি। পরবর্তীতে এরশাদ সরকারের আমলে দেশের সবচেয়ে বহুল প্রচারিত দৈনিক জনতা পত্রিকার সৈয়দপুর প্রতিনিধি হিসেবে লেখার মাধ্যমে ব্যপক পরিচিতি লাভসহ সুনাম অর্জন করেছেন তিনি। সেই ধারাহিকতায় এখনো সৈয়দপুর শহরে নিজু দা’কে সাংবাদিক হিসেবে চিনে সকলেই। বর্তমানেও দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় তার লেখনি সৈয়দপুর শহরের নানান খবরাখবর প্রকাশিত হচ্ছে।
পাশাপাশি আশির দশকের শুরুর দিকে মানবসেবায় পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত হন তিনি। সেই সময় সৈয়দপুর শহরে হাতে গোনা ৫/৭টি মাইক্রোবাস, তার মধ্যে নিজু দা’রই ৩টি। প্রশাসন থেকে শুরু করে নামমাত্র খরচে গরীব রোগি ও প্রসূতি মা ও অসহায় মানুষদের পরিবহন সেবায় তার অবদান অনন্য।
সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত থাকায় সৈয়দপুর প্রেস ক্লাবের সক্রিয় সদস্য ও কার্যনির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ এবং হিন্দু ধর্মালম্বী স্থানীয় হিন্দু কল্যান পরিষদের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক, মন্দির শ্মশান সংস্করণের সাধারণ সম্পাদক, নীলফামারী জেলা সাইক্রো পিক-আপ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সহ হিন্দু ধর্মালম্বীদের ধর্মীয় সকল আচার অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দানে দেখা যায় নিজু দা’কে।
সংসার জীবনে সহধর্মিনী রেখা দেবী ও একমাত্র সন্তান অমিতকে নিয়ে সুখ স্বাচ্ছন্দেই মানব সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস পরিণতি ঠেকায় কে? ২০১০ সালে নিজু দা’র ভাগ্যাকাশে নেমে এলো এক কালো মেঘের অধ্যায়, অজ্ঞাত এক যম রোগে সহধর্মিনীকে সুস্থ্য করে তোলার জন্য শুধু সৈয়দপুর শহরেই নয়, দেশের রাজধানী ঢাকায় এমনকি দেশের বাহিরেও নিয়ে যান তিনি। কিন্তুু তার সকল চেষ্টায় ব্যর্থ করে ২০১১ সালের ০২ ফেব্রুয়ারী না ফেরার দেশে চলে যান তার প্রাণপ্রিয় সহধর্মিনী রেখা দেবী। সেদিন দেবীর চিতার আগুন যেন তার বুকে দাউ দাউ করে জ্বলছিল। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত নিজু দা একমাত্র সন্তানকে বুকে আঁকড়ে ধরে সব দুঃখ বেদনাকে কাটিয়ে যেন নতুন করে বাঁচার শফত ও একমাত্র ছেলের ভবিষৎ এর কথা চিন্তা করে নিজের সুখ আরাম আয়েশকে বলি দিলেন সেই দিন। সে কারণেই আর দ্বিতীয়ত বিয়ে না করে মানুষের মাঝে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নিলেন তিনি।
তিনি জানালেন, মানব সেবাই পরম ধর্ম, মানব সেবায় পরম শান্তি। ঈশ্বরের সেই মহান বাক্যই তার জীবনে আদর্শ হয়ে আছে থাকবে আজীবন। জীবন সংগ্রামে চলার পথে তার কাজে কর্মে আজও সেই প্রমাণই মেলে। আমার ক্ষুদ্রজ্ঞানমতে মধ্য বয়সেই সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন একজন কাছের মানুষকে অর্থ্যাৎ সহধর্মিনীকে। সেটাই যেন নিজু দা’র জীবনে অভিশাপ হয়ে দাঁড়ালো। সংসার জীবনে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে নিজু দা’কে, না ফেরার দেশে চলে যাওয়া সহধর্মিনীর নির্মল ভালবাসা আজো দু’ চোখের অশ্রু ঝরায়, নির্বাক চিত্তে চেয়ে থাকেন আকাশ পানে। বেদনা বিধুর সেই মানুষটি জীবন যুদ্ধে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় লেজ গুটিয়ে থাকেননি বরঞ্চ মানব সেবায় তার দায়িত্ব যেন দেড়গুন বাড়িয়ে দিয়েছেন। সৈয়দপুর শহরেই শুধু সিমাবদ্ধতা নয় গোটা উপজেলায় বাল্য বিবাহ রোধ, অসহায় গরীব মানুষের উপর নির্যাতন থেকে রেহাই, বিচার শালিশ এমন কোন ঘটনা নাই যেখানে নিজু দা’র উপস্থিতি নাই। ২০০৮ সালে কুন্দল এলাকায় শীব মন্দিরটি তারই হাতে সংস্করণ করা। মনে হয় প্রয়াত বাবা, ভাই, সহধর্মিনী যেন তাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন এসব অসহায় মানুষদের পাশে থাকার জন্য।
সবচেয়ে অবাক লাগার বিষয় শহরের যে প্রান্তই হোক না কেন গুরুত্বপূর্ণ কোন অনুষ্ঠান চলাকালে যদি বিদ্যুতের লোডশেডিং বা অন্য কোন কারণে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে যায় তা হলে বিদ্যুৎ কন্ট্রোলরুমে সর্বপ্রথম যে টেলিফোনটি বাজে সেটা নিজু দা’রই। এমনকি বিদ্যুতের কোন র্দূঘটনায়ও যে খবরটি পাওয়া যায় সেটি তারই দেয়া। সর্বোপুরি স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর গোলাহাট বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের যে জোর প্রচেষ্টা ও পূজাপান্ডবে নিজু দাকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে শহীদদের আত্মার শান্তির কামনায়।
একটি মানুষ সমাজের সকল লোকের ভালো হতে পারে না। আমার চোখে দেখা যাহা-তাহাই তুলে ধরেছি মাত্র।