ঢাকা: শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সুষ্ঠু চাইলে রাজনীতিকে সুষ্ঠু করতে হবে মন্তব্য করে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সুষ্ঠু রাজনীতির জন্য আইনের শাসন থাকতে হবে। প্রশাসনের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি থাকতে হবে। তাহলেই রাজনীতি সুষ্ঠু হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় থাকবে। তিনি শুক্রবার জাতীয় প্রেসকাবে শিক্ষা অধিকার আন্দোলন আয়োজিত ‘শিক্ষাখাতে বাজেট ও আজকের বাস্তবতা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাজনীতির পচন কমাতে হবে। না হলে ছাত্র-ছাত্রীদের ওপরে তাকানো সম্ভব হবে না। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সবকিছু চলতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের এত বছর পরে এমন অবস্থা হবে ভাবতে পারিনি। এ অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে তিনি তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহবান জানান।
শিক্ষক নিয়োগে দলীয়করণকে ভয়ঙ্কর ভ্রান্ত পদেক্ষপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সকল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজসহ সব ক্ষেত্রে দলীয় শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তার কারণে ৩৫ বছর পরিবেশ বিষাক্ত করে দেয়া হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগে এ পদক্ষেপ ভয়ঙ্কর ভ্রান্ত পদক্ষেপ।
মুক্তিযুদ্ধের এক বছর পরেও শহীদদের তালিকা না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আজকের বাংলাদেশ অত সহজে স্বাধীন হয়নি। কিন্তু এত বছর পরেও যারা শহীদ তাদের নামের তালিকা করা সম্ভব হলো না। এখন শুধু কিছু আঞ্চলিক স্কুল এবং নামফলকে কিছু শহীদের নাম পাওয়া যায়। এজন্যই কি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল? অথচ চাকরির সুবিধার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা করা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার উন্নয়নের উদাহরণ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া আজ বিশ্বের ক্রমবর্ধমান দশটি অর্থনীতির মধ্যে একটি। তারা কৃষি বা সংস্কৃতি নয় শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের গ্রাম্য অনেক স্কুলে ছোট্ট খেলার মাঠ পর্যন্ত নেই। এতে তাদের মনটাই উন্নত হবে না, দৈহিক গঠন বাধাগ্রস্থ হবে। বাজেটের মাত্র দুই শতাংশ শিক্ষায় বরাদ্দ দেয়া হয়। অথচ দক্ষিণ কোরিয়ায় ৬ শতাংশের বেশী বরাদ্দ দেয়া হয়।
তিনি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ, সকলের অধিকার নিশ্চিত করার আহবান জানিয়ে বলেন, দেশের সব স্থানে আইনের শাসন থাকার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক অবস্থা বলতে যা বোঝায় তা থাকতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং এন্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুজাহিদুল ইসলাম, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং সম্মিলিত পেশাজীবি পরিষদের আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী। শিক্ষা অধিকার আন্দোলনের আহবায়ক ড. মুহাম্মদ আবু ইউসুফের সভাপতিত্বে সদস্য সচিব ড. মুহাম্মদ আমানউদ্দীন মুজাহিদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, শিক্ষার কোথাও কোনো দলের সিল থাকবে না এমন দিনের প্রত্যাশা করছি। শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া একেকটি গাছ। তাদের অনুমতি ছাড়া গাছের একটি পাতাও নড়ে না। তাদের মধ্যেও একটা লড়াই আছে। আমরা এমন লড়াই চায় যে লড়াই আমাদেরকে পথ দেখাবে। তিনি আরো বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর যারাই ক্ষমতায় এসছেন তারা কেউই শিক্ষার উন্নয়নে তেমন কোনো কাজ করেননি। এখনো সিট বাণিজ্য, দখল বাণিজ্য, চাঁদাবাজি চলছে।
শিক্ষার বাজেট বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষা বিস্তৃত হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার কোনো বালাই নেই। ফলে এ খাতে বরাদ্দ কমছে। যদি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং বৈষম্য দূর করতে হয় তাহলে সেখানে কোনো দলবাজি থাকবে না। এ বিষয়ে তিনি সবাইকে সচেতন হওয়ার আহবান জানান।
মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, এখন সকল শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে দলীয়ভাবে, হচ্ছে দুর্নীতি। ঘুষ ছাড়া কোন কাজ হচ্ছে না। এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে বাজেট বাড়িয়ে কি হবে। শিক্ষার উন্নয়নে জাতীয়ভাবে উদ্যোগ নেয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রুহুল আমিন গাজী বলেন, তথাকথিত সংসদে বাজেট আলোচনা চলছে। ভোটাধিকার হরন করে যে সংসদ গঠন, যেখানে সংসদের আসন ভাগ হয় সেখানে কিসের আলোচনা। ছাত্রলীগ সারাদেশে হল দখল, ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতন করছে। এভাবে দেশে দ্বৈত শাসন চলতে পারে না। তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগে দলীয় লোক হলেই সব খালাস। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফল আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে ছিল কে নির্বাচিত হবে। অনেক লীগের পাশাপাশি নতুন একটি লীগ তৈরি হয়েছে। তা হলো নির্বাচন কমিশন লীগ।