সিসিনিউজ: একযুগেরও বেশি সময়ে রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে বিএনপির পাশে থেকেছে জামাত। বিশ্বস্ত সঙ্গীর মতো বিএনপির ডাকা আন্দোলন-সংগ্রামে সমর্থন দিয়ে দিনের পর দিন নিজেদের উপস্থিতিও জানিয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় পারস্পরিক অবিশ্বাস আর আস্থার সংকটে সেই সম্পর্কে ফাটল দেখা দিয়েছে। সরকারের সঙ্গে জামাতের সমঝোতা হচ্ছে এমন খবরে জোটের শরিকদের মধ্যে বেড়েছে সন্দেহ।অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামাত আতাত করছে বলেও কথা উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এ সন্দেহকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে সাম্প্রতি জামাতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর রায় অপেক্ষমাণ রাখায়। জোটের পরিধিতে জামাতের নেতৃত্বকেও পড়তে হয়েছে প্রশ্নের মুখে। সরকারবিরোধী আন্দোলনে যে দলটি ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে বিএনপিকে। নির্বাচনের আগে যেসব আন্দোলন হয়েছে, সেখানে বিএনপির নামমাত্র অংশগ্রহণ ছিল, তাতে জামাতের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। অথচ সাম্প্রতিক বিএনপি-জামাত সম্পর্কের টানাপড়েনের বিষয়টি রাজনীতিক অঙ্গনে আলোচিত হচ্ছে জোরেসোরে।
জোট সূত্র জানায়, বিএনপি-জামাত জোটবদ্ধ হওয়ার পরে এই প্রথম সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। শুধু তাই নয়, জোটের বৈঠকে জামাতের নেতৃত্বকে এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয়েছে। গত ৪ জুন ১৯ দলের বৈঠকে জামাতের কর্মপরিষদের নেতা আবদুল হালিমকে জোটের একাধিক নেতা সরকারের সঙ্গে জামাতের সম্পর্ক নিয়ে ওঠা গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চান। তখন হালিম বলেন, জোটে জামাতের অবস্থান আগের মতোই আছে। এ গুঞ্জন জোটের মধ্যে ফাটল ধরানোর জন্য চক্রান্ত। জামাত ১৮ দলীয় জোটে আছে, থাকবে।
জোট সূত্র আরো জানায়, এর আগেও একাধিকবার জোটের বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জামাতের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোটে জামাত থাকছে, নাকি সরকারের সঙ্গে আঁতাত করছে, দলটিকে তা পরিষ্কার করতে বলেন তিনি। খালেদা জিয়া উপস্থিত জামাত নেতা আবদুল হালিমকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগকে বিশ্বাস করলে আপনারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তারা আপনাদের ব্যবহার করে ষড়যন্ত্র করবে। শুধু তাই নয়, জামাতের প্রতিনিধির কাছে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেন, জামাত কোন জোটে থাকবেÑ আওয়ামী লীগ না বিএনপির। বিএনপি বিভিন্ন সূত্র জানায়, জামাত ত্যাগ
করলে আওয়ামী লীগ জামাতকে কাছে টেনে নেবে এই ভয় বেশ ভালোভাবেই দানা বেঁধেছে বিএনপিতে। বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে এই সন্দেহ উঠে এসেছে। এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপির বড় একটি অংশ জামাতকে জোট থেকে বের করে দেয়ার পক্ষে। এ জন্য তারা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বার বার পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু এই মুহূর্তেই জামাতকে ছাড়তে চাচ্ছেন না খালেদা জিয়া। বিএনপি জামাতকে ছেড়ে দিলেই আওয়ামী লীগ জামাতকে বিএনপির বিরুদ্ধে মাঠে নামাবে- এমন আশঙ্কা করছেন খালেদা নিজেই। দলের শীর্ষ নেতা এবং ঘনিষ্ঠদের এমন শঙ্কার কথা জানিয়েছেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
তবে বিএনপি নেতারা ধারণা করছেন, জামাতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক অনেক দিনের। বিএনপিকে ঘাঁয়েল করার জন্যই জামাত ইস্যুকে ব্যবহার করছে সরকার। সংলাপে বসার ক্ষেত্রে সরকার বারবার জামাত ছাড়ার শর্ত দিচ্ছে। জামাতও তাদের জোটে থেকেই আওযামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তাদের দল যাতে নিষিদ্ধ না হয়, সেজন্য আওয়ামী লীগের কাছে ধরনা দিচ্ছে। এ জন্যই সাম্প্রতিক জামাত এবং আওয়ামী লীগ একই টেবিলে বসা শুরু করছে। এমনকি কোলাকুলি এবং ভুরিভোজ করার ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদ বলেন, জামাতের অতীতের কিছু ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ হয়। ৯৬তে বিএনপি সরকারে থাকাকালীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামাত যুগপৎ আন্দোলন করেছে। প্রয়োজনে আবার সেই দলের সঙ্গে ফিরে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে ভবিষ্যতে কি হবে সেটা ভবিষ্যতেই দেখা যাবে।
ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, জামাতের কর্মকা-কে জোটে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। তবে জামাতের সঙ্গে বিএনপি বা ১৯ দলীয় জোটের যে ধরনের সম্পর্ক আছে আগামীতে তাই থাকবে। দূরত্ব-অবিশ্বাসের কথা দূর থেকেই শোনা যায়। তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্ক জামাতের কোনো ব্যক্তির সঙ্গে নয়, দলের সঙ্গে। আমরা ছেড়ে দিলে জামাতকে সঙ্গে নিতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুত আছে। রাষ্ট্রদূত হোক আর অন্য কারও বাসায় হোক আওয়ামী লীগ নেতারা যদি জামাত নেতাদের সঙ্গে বসতে পারেন তাহলে অন্যদের নিয়ে নাক সিটকানোর কোনো সুযোগ নেই।
আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, জামাতে ইসলামী যেহেতু একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল, সেহেতু মুক্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে তাদের। তারা যেখানে সুবিধা মনে করবে সেখানে চলে যাবে। বিএনপি এসব বিষয় নিয়ে এখনই ভাবছে না। সময় এবং বাস্তবতা এলে তখন বিএনপি পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি বলেন, জামাতের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক জোট। তারা আজীবনের জন্য দলটির মিত্র নয়। তাছাড়া দল হিসেবে বিএনপির একটি আদর্শিক জায়গা ও চিন্তা ধারা এবং নিজস্ব কর্মপরিকল্পনা আছে। একক দল হিসেবে বিএনপি অনেক প্রভাবশালীও। তাই জোট থেকে কোনো দল বের হয়ে গেলে তাতে দলে কোনো প্রভাব পড়বে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, সরকার জামাতের সঙ্গে গোপনে আঁতাত করে রাজনৈতিক ফায়দা লুফে নিতে চাইতে পারে। জামাতের যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত বিচার নিয়ে সাম্প্রতিক সরকারের আচরণ বিএনপি-জামাতের মাঝে ফাটল ধরানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এর আগেও জামাতের সহিংস আচরণের কারণে দলটির সঙ্গ ছাড়তে বিএনপিকে তাগিদ দিলেও বিভিন্ন স্থানে জামাত নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।
তবে সরকারের সঙ্গে আঁতাতের কথা অস্বীকার করেছে জামাতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ১৯ দলীয় জোটের মধ্যে ফাটল ধরাতে চাচ্ছে আওয়ামী লীগ। এখন আমরা আন্দোলন কর্মসূচি নিয়েই আছি। ঈদের পরে সরকার পতনে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি পালন করবে বিএনপি-জামাত জোট। এখানে সরকারের সঙ্গে কোনো আপসে যাবে না জামাত।