সিসি ডেস্ক: অবশেষে দেখা হলো। কথা হলো ফুটবল কিংবদন্তী দিয়াগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার সাথে। তার সাথে দেখা হওয়ার প্রত্যাশা ছিল না। কারণ ম্যারাডোনা এমন একজন মানুষ যিনি চলেন মুডের উপর। মন-মর্জি কখন কেমন তা বলা যায় না। অনেক দিন লেগে থেকে খবর নিয়ে জানলাম ১২ জুনের আগে থেকে ব্রাজিলের রিও ডি জেনে রিওর রেডিসন হোটেলে অবস্থান করছিলেন এবং প্রতিদিন ভেনেজুয়েলার টেলিভিশন টেলিস্যুর চ্যানেলের ফুটবল নিয়ে টকশোতে হাজির হন। ব্রাজিলের সময় রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত চলে এই শো। ফুটবল বিশেষজ্ঞ মতামত দিতেই ম্যারাডোনা চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। মারাকানা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রফতানি প্রদর্শনী সেন্টারে ফিফার আন্তর্জাতিক ব্রডকাষ্টিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। ১৭টি দেশের টেলিভিশন কেন্দ্রের অস্থায়ী ষ্টেশন। সেখানে আর্জেন্টাইন টিভি কেন্দ্রের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে ভেনিজুয়েলার টেলিস্যুর টিভি ম্যারাডোনাকে নিয়ে প্রতিদিন ফুটবল অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে সরাসরি। আর্জেন্টিনা জার্মানির মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে ৪০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে রাত ৯টায় পৌঁছে গেলাম আইবিসিতে (আন্তর্জাতিক ব্রডকাষ্টিং সেন্টার)। ফুটবল কিংবদন্তী তখনও আসেননি। ম্যারাডোনাকে যিনি মেকাআপ করান সেই ভদ্র মহিলার সাথে ভাঙ্গা ইংরেজি আর আকার-ইঙ্গিতে কথা বলছিলাম। এই মহিলা ম্যারাডোনাকে মেকআপ করানোর সময় তার সাথে মোবাইলে তোলা ছবি দেখাচ্ছিলেন। কথা বলতে বলতেই হঠাত্ দেখি ফুটবল মাঠের স্বপ্ন পুরুষটি এসে গেছেন। একেবারে আমার সামনে। তিনচার জন ঘিরে রেখেছেন। এসেই আমার পাশের সেই মহিলাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। হাত মেলালেন। তার পরই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ম্যারাডোনা।
হাসি মুখে হাত মিলিয়ে ষ্টুডিওর ভেতরে ঢুকে পড়লেন। পেছন পেছন আমিও ঢুকলাম। কালো সুটেড-বুটেড, সাদা শার্ট। দুই হাতে দুটি ঘড়ি। দুই হাতের আঙ্গুলে হীরার আংটি। ব্যাক ব্রাশ চুল। ডান কানে ১টা বাম কানে দুটো কানের দুল। ষ্টুডিওতে ঢুকেই সেই মহিলার হাতে মেকআপ নিতে শুরু করলেন। আর ভক্তদের আনা আর্জেন্টিনার জার্সিতে অটোগ্রাফ দিতে লাগলেন। লাইভ অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলো। ম্যারাডোানার সামনে টেবিলে ছোট ফ্রেমে বাঁধা ছবি। ম্যারাডোনা তার শিশু পুত্রকে নিয়ে তুলেছিলেন। সেটাও লাইভ অনুষ্ঠানে জায়গা দেয়া হয়েছে। দেড়ঘন্টার অনুষ্ঠান। বাইরে পায়চারি করে সময় কাটাতে কাটাতে অনুষ্ঠান শেষ। বেরিয়ে আসার সাথে সাথে টিভি ষ্টেশনের লোকজন আবার ঘিরে ধরলো। যার সাথে আগেই কথা বলে নিয়েছিলাম। তার কথায় সামনে গেলাম। ম্যারাডোনাকে পরিচয় দিলাম। বাংলাদেশ থেকে এসেছি। বিশ্বকাপ কাভার করতে এসেছি। আমার পত্রিকার নাম দৈনিক ইত্তেফাক। দিয়াগো আপনি কি বাংলাদেশের নাম শুনেছেন ? জবাব দেয়ার আগেই আরেক লোক এসে মুখে কথা কেড়ে নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো। সুযোগ মতো আমি আবার তাকে বললাম আপনি কি বাংলাদেশের নাম শুনেছেন? বাংলাদেশে আপনার কোটি কোটি ভক্ত আছে। ম্যারাডোনা বললেন, ও, বাআআআংলাদেশ! হুম হুম হুম। ভক্তদের অটোগ্রাফ দিতে দিতে বললেন, বাংলাদেশ চিনি। নাম শুনেছি।’ আমি বললাম, বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে ভালোবাসে। ৯৪-এর বিশ্বকাপ ফুটবলের মাঝ পথে খেলতে না পারায় বাংলাদেশের অনেক মানুষ কেঁদেছিল। ম্যারাডোনা অবাক হয়েছেন এ কথা শুনে। কোটি কোটি মানুষ আপনাকে ভালোবাসে। তারা আপনাকে দেখলে খুশি হয়। স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলেন ম্যারাডোনা। তবে বলে রাখা ভালো, ইংরেজি কিছু কিছু বোঝেন এবং বলতেও পারেন বলেই মনে হলো। যাকে দোভাষী হিসাবে প্রস্তুত রেখেছিলাম। তাকে খুব একটা প্রয়োজন হলো না। তারপরও সহযোগিতা নিয়ে কথা বললাম হাঁটার পথে।
নিরাপত্তা কর্মীরা কথা বলতে দেয় না। সরিয়ে নিতে চায়। নাছোড় বান্দা আমি। বললাম দিয়াগো (সবাই ম্যারাডেনাকে দিয়েগো নামে ডাকে) ইত্তেফাক আপনাকে একটা উপহার পাঠিয়েছে—একটা কফি মগ। মগের গায়ে বাংলাদেশের পতাকা এবং পতাকার বুকে বাংলাদেশের মানচিত্র। কফি মগটা হাতে নিয়ে ম্যারাডোনা ইংরেজিতে বললেন, ফর মি ? আমি বললাম, ইয়েস দিয়েগো। এটা আপনার জন্য গিফট। স্প্যানিশ ভাষায় কি বললেন বুঝলাম না। তবে মনে হলো ধন্যবাদ গোছের কিছু একটা বললেন। কথা শেষ না হতেই আরেক ভদ্রলোক কোথা থেকে এসে হাতের মুঠোয় রাখা যায় মাদার তেরেসার এমন একটা ছোট্ট ভাস্কর্য তুলে দিলেন। ম্যারাডোনা সেটি তার নিরাপত্তা কর্মীর হাতে দিলেন। আমি ধরে নিলাম। মগটিও দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ম্যারাডোনা অন্য সব কিছু নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে দিলেও তিনি বাঁ হাতে ইত্তেফাকের দেয়া উপহার কফি মগটি ধরে রাখলেন। ধাক্কাধাক্কির মধ্যেও পাশাপাশি হাঁটলাম কথা বললাম ফুটবল মাঠের স্বপ্ন পুরুষের সঙ্গে। যাকে দেখে আদর্শ মেনে খেলোয়াড় হতে চায় ফুটবল দুনিয়া। সেই মানুষটিকে টিভির পর্দায় যেমনটা দেখেছি। চোখের সামনে ভিন্ন রকম। টেলিভিশনের পর্দায় দেখলে বোঝাই যায় না, শারীরিক উচ্চতা একেবারেই কম। এই উচ্চতা নিয়ে ফুটবল দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছেন! বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন! বিশ্বাস হতে চায় না। এতো কম উচ্চতার শরীর নিয়ে লাফিয়ে উঠে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে গোল করে বলেছেন এটা ঈশ্বরের হাত। সুযোগ পেয়ে বলেই ফেললাম দিয়েগো, বাংলাদেশের মানুষ আপনাকে দেখতে চায়। বললেন, ‘সময় কম। খুব ব্যস্ত থাকি। তবে সুযোগ পেলে যাবো বাংলাদেশে।’ বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের কোচ স্কোলারি বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ফাইনাল খেলবে। আপনি কী বলেন, বিশ্বকাপে আগাম কথা বলে কোনো লাভ হয় না।’ ফাইনাল নিয়ে কিছু একটা বলুন। তিনি বললেন, ‘আর্জেন্টিনা-জার্মানি দুই দলই ভালো খেলেছে। একটা গোলই আর্জেন্টিনাকে শেষ করে দিয়েছে।’ ম্যারাডোনার ম্যানেজারের কাছ থেকে জানা গেল, ফাইনাল শেষে মেসিরা হোটেল ফেরার পর সাথে কথা বলে সান্ত্বনা দিয়েছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ঈশ্বর।
এরপর দ্রুত হাঁটতে লাগলেন ম্যারাডোনা। সামনে পিছনে নিরাপত্তাকর্মীতে ঘেরা। কফি মগটা নিরাপত্তা কর্মীরা হাত বাড়িয়ে চাইলো। দিলেন না ম্যারাডোনা। তাকিয়ে দেখি ইত্তেফাকের দেয়া মগটি নিয়ে তিনি ছুটে চলেছেন গাড়ির দিকে। বাইরে ফটো সাংবাদিকরা ছবির জন্য অনেক অনুরোধ করলেন। ছবি দিলেন না। স্যুট পরা ম্যারাডোনা হঠাত্ দৌড়াতে লাগলেন। দূরে কাকে যেন দেখে টিপ্পনী কেটে চিত্কার করে স্প্যানিশ ভাষায় বলছিলেন টেলুস্যুর, টেলিস্যুর, হা হা হা হা।’ আমিও তার পেছনে দৌড়াচ্ছি। সোজা দৌড়ে গিয়ে অপেক্ষায় থাকা বড় মাইক্রোবাসের একেবারে পেছনের সিটে গিয়ে বসলেন আর হাঁপাতে লাগলেন। তখনও হাতের মুঠোয় উপহার দেয়া মগটি। নিরাপত্তা কর্মীদের নিয়ে ম্যারাডোনাকে বহনকারী মাইক্রোবাস ছুটলো। তার পেছনে আরেকটি মার্সিডিজ অনুসরণ করলো।